- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

পিটিআই বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের নির্দেশ

স্টাফ রিপোর্টার
মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্থান পিটিআই বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার নির্দেশ দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখা-২। গত ৩ মার্চ মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মো. গোলাম সারওয়ার খান পাঠান স্বাক্ষরিত এক স্মারকে এই নির্দেশনা দেয়া হয়। এতে উল্লেখ করা হয়- সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ১৬০৪ খতিয়ানের ১৪৯৮ দাগে নির্মিত পিটিআই সুপারের বাসভবন সংলগ্ন পূর্ব দিকের ৯২ ফুট সীমানা প্রাচীরটি ৮ ফুট পশ্চিম দিকে প্রতিস্থাপনপূর্বক বধ্যভূমির স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ ক্রমে অনুরোধ করা হলো।
জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ ক্যাপ্টেন মাহবুব এর নেতৃত্বে পাক হানাদার বাহিনীর ১১ জন সৈন্য সুনামগঞ্জে এসে আতংক তৈরি করে। তারা সুনামগঞ্জ সদর থানা দখল করে রাতে সার্কিট হাউজে সশস্ত্র অবস্থান নেয়। ২৮ মার্চ সকাল ১০টায় সার্কিট হাউজে অবস্থানরত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর উপর আক্রমণ চালান মুক্তিযোদ্ধা জনতা। সারা দিন ও রাত উভয়পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় হয়। রাতভর বৃষ্টির কারণে শেষ রাতে দুইজন জীবিত ও একজন আহত পাকিস্তানী সেনাকে রেখে অন্যরা পলায়ন করে। এর পরেই সুনামগঞ্জ প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে (পিটিআই) মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প স্থাপিত হয়। এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে ১০ মে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী স্থানীয় দোসরদের সহায়তায় বিপুল শক্তি সঞ্চয় করে উন্নত অস্ত্র নিয়ে আবারো শহরে প্রবেশ করে। পরে পিটিআই ক্যাম্পাসে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প দখল করে টর্চারসেল প্রতিষ্ঠা করে পাকিস্তানি খান সেনারা।
এই সময়ে স্থানীয় দালাল, রাজাকার, আল বদরদের সহায়তায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজনকে ধরে এনে পিটিআই হোস্টেলের নীচতলার পূর্ব দিকের একটি কক্ষে রেখে চরম নির্যাতন করতো। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন স্থান থেকে হিন্দু, মুসলিমসহ মুক্তিকামী বাঙালি-নারী পুরুষদের ধরে এনে পিটিআই-এ রেখে নির্যাতন করে হত্যা করা হতো। নারীদের উপর সংঘবদ্ধ পাশবিক নির্যাতন চালাতো। দূর থেকে এই টর্চারশেলের নারকীয় উল্লাস ও নির্যাতিতদের আর্তচিৎকার শুনতে পেতেন সাধারণ মানুষ। নির্যাতনে যারা মারা যেতেন জল্লাদরা ক্যাম্পের পশ্চিম দিকে অবস্থিত পিটিআই হোস্টেলের পুকুরের পশ্চিমের খালি জায়গায় তাদের লাশ মাটি চাপা দিয়ে রাখতো। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে ত্রিমুখি আক্রমণ করে হটিয়ে দেন মুক্তিযোদ্ধারা। পিটিআই ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যায় তারা। এরপর পিটিআই স্কুলে পুনরায় ক্যাম্প স্থাপন করেন মুক্তিযোদ্ধারা।
তখন স্থানীয় প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধারা ওই বধ্যভূমির মাটি খুঁড়ে প্রায় ৫০-৬০টি মাথার খুলিসহ শহীদদের হাড়গোড় উদ্ধার করেন। এই হাড়ের স্তুপের মধ্যে মহিলাদের চুল, ব্লাউজ, পেটিকোট, অন্তর্বাসসহ নানা বস্তুও উদ্ধার হয়। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী টর্চার সেলে নিয়মিত নারী ধর্ষণ করে তাদের হত্যা করে লাশ মাটিতে পুঁতে ফেলত বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপরই এই বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের দাবি জানান মুক্তিযোদ্ধারা।
কিন্তু ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর পিটিআই বধ্যভূমিটি সংস্কারের বদলে এর স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করে স্বাধীনতা বিরোধীরা। ১৯৯২ সালে স্থানীয় স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত মহল বধ্যভূমির উপর পিটিআই’র সুপারিনটেন্ডেন্টের এর পাকা বাসভবন নির্মাণ করে আলামত মুছে ফেলার উদ্যোগ নেয়। বর্তমান অধ্যক্ষের বাসভবনটি বধ্যভূমির উপরে অবস্থিত। এদিকে পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধারা এর প্রতিবাদ করলে সংশ্লিষ্টরা কৌশলে মূল বধ্যভূমির পূর্ব দিকে আরেকটি জায়গাকে বধ্যভূমি দেখিয়ে সংরক্ষণ করে।
২০১৮ সালে সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মালেক হোসেন পীর সদর ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার আতিকুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে পিটিআই বধ্যভূমিতে সাবেক জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলামের মাধ্যমে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনসহ বধ্যভূমির প্রকৃত অবস্থানের একটি স্ক্যাচম্যাপ তৈরি করান। যা ১৪৪ নং জে.এল. এর তেঘরিয়া মৌজার ১৬০৪ নম্বর খতিয়ানের ১৪৮৯ দাগের ০.২৫ একর ভূমিতে অবস্থিত ।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সুনামগঞ্জে বধ্যভূমির উপর প্রাইমারী ট্রেনিং ইনিস্টিটিউট (পি.টি.আই) এর সুপারিন্টেন্ডেন্টের বাসভবন এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের টিনসেড পরিদর্শন বাংলো অপসারণ করে বধ্যভূমি, স্মৃতিসৌধ, উন্মুক্ত মঞ্চ ও মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার নির্মাণের জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর অনুরোধ করেছিলেন সুনামগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক আব্দুল আহাদ। এছাড়াও গত ২০১৯ সালের ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিকও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বধ্যভূমি সংরক্ষণ এবং একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

  • [১]