অর্ধেন্দু ঘোষ চৌধুরী (সঞ্জু)
দেশবরেণ্য সাংবাদিক ও কলামিস্ট, সুনামগঞ্জের অহংকার পীর হাবিবুর রহমান আজ আমাদের মাঝে নেই। তাঁর ক্ষুরধার লেখনী আমাকে বেশ আকর্ষণ করত। সর্বশেষ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের আন্দোলন সম্পর্কে তার একটি লেখা পড়েছি। বিশ্বের যেকোন প্রান্তের ন্যায্য আন্দোলন সমর্থিত লেখা প্রয়াত পীর হাবিবের ধর্ম ছিল। যার ফলে তার শত্রুও ছিল প্রচুর। ভয়ের ব্যাপারটা তার মধ্যে ছিল না। হঠাৎ একদিন পত্রিকায় দেখলাম তার ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি। কোন দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে সেটা গোপন রাখা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিই বলা চলে। কিন্তু তাতে ব্যতিক্রম তিনি। নিজেই পত্রিকার মাধ্যমে সবাইকে জানিয়ে দিলেন তিনি ক্যান্সার আক্রান্ত। প্রচ- মনের জোর ছিল তার। তাই মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দেশ ভারতে গেলেন চিকিৎসার জন্য। মনের প্রচ- জোর আর সুচিকিৎসায় ক্যান্সার জয় করে ফিরে আসলেন।
আমি বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার নিয়মিত পাঠক বলতে গেলে পীর হাবিবের জন্যই। পত্রিকা নিয়ে আগে চার নম্বর পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখি তার কোন লেখা আছে কিনা। পীর হাবিবুর রহমানের লেখা আজ চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। মুক্তিযুদ্ধ এবং অসাম্প্রদায়িক শক্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়া তার চরিত্রের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি আপাদমস্তক একজন অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থানই মহান করেছে এই কলম যোদ্ধাকে। আমি তার একটা লেখা পড়েছিলাম হেফাজত ইসলামের মামুনুল হক গ্রেপ্তারের ৩-৪ দিন আগে। আমি লেখাটা পড়ার পর স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লেগেছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে সাবেক সংসদ সদস্য নজির ভাই, জাল্লাবাজের আশ্রাফ ভাইসহ অনেককে লেখাটি সম্পর্কে জানিয়েছি। সেদিন আমার কথা অনেকেই বিশ্বাস করেননি। কিন্তু পীর হাবিবুর রহমানের সেই লেখাটির মধ্যে একটি ইঙ্গিত পেয়েছিলাম যে, আর হেফাজত ইসলামকে ছাড় দেওয়া যাবে না। পরবর্তীতে সত্যিই তার লেখা পড়ে আমার অনুমানই ঠিক হল।
আমার নিজ উপজেলা জামালগঞ্জের একটা বড় সমস্যা নিয়ে তাঁর সাথে দেখা করার দরকারবশতঃ প্রস্তুতি নিয়েছিলাম দেখা করব বলে। কিন্তু হঠাৎ শুনি তিনি সুনামগঞ্জ চলে গেছেন। খবরটা পেলাম জামালগঞ্জের সাচনা বাজারের তাঁর এক সহপাঠী সমরেন্দ্র আচার্য শম্ভুর কাছ থেকে। ভাবলাম সুনামগঞ্জ থেকে ঢাকা ফেরার পর আমার এক ভাতিজী তুলিকা ঘোষ চৌধুরীকে নিয়ে পীর হাবিবের সাথে সাক্ষাত করব। যাকে পীর হাবিব নিজের আপন বোনের মতো ¯েœহ করতেন। কিন্তু ঢাকা ফেরার কয়েকদিনের মধ্যে তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন। এরপর বিধির যা লেখা তাই ঘটল।
বাংলাদেশের পারিপার্শ্বিক অবস্থায়ও এই সাহসী কলমযোদ্ধার কলম থেমে থাকেনি। নিজের জীবনের প্রতি খুব কম খেয়াল ছিল তার। তিনি আজীবন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থানসহ পৃথিবীর যেকোন প্রান্তের ন্যায্য আন্দোলনের পক্ষে নিজের অবস্থান জানান দিতেন। আমি যে কাজের জন্য পীর হাবিবকে নিয়ে ডিজি নিবন্ধনের কাছে যেতে চেয়েছিলাম- তা হলো জামালগঞ্জের সাচনা, কামলাবাজ, পলক, তেলিয়া জামালগড়, জামালপুর মৌজার অস্বাভাবিক রেজিষ্ট্রী ফির ব্যাপারে। প্রয়াত পীর হাবিবুর রহমানের কাছে যাওয়ার এই আকাক্সক্ষা যদি তার অনুজ মাননীয় সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ একটু গুরুত্ব দিয়ে দেখেন তাহলে সদ্যপ্রয়াত তাঁর অগ্রজ ভাইয়ের কাছে যাওয়ার বিষয়টি আমাদের স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
প্রয়াত এই সাহসী কলম সৈনিকের প্রতি আমার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাটুকু আমি এভাবেই প্রকাশ করলাম। আমি আর কখনও দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন পড়ব না। জানি না, আমার এই সিদ্ধান্ত কতটুকু যথার্থ হবে। তারপর মনের সুপ্ত ভাবনাটুকু প্রকাশ করলাম কেবল। অবশেষে সদ্যপ্রয়াত পীর হাবিবুর রহমানের আত্মার শান্তি কামনা করে পরপারে মুক্তির প্রার্থনা রইল। পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি রইল সমবেদনা।
লেখক : সভাপতি, শ্রীশ্রী নিগমানন্দ পরমহংস দেবের বিভাগীয় মন্দির নির্মাণ পরিচালনা কমিটি।