সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে বরেণ্য প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মুখ থেকে যে কথাটি ঐকতান তুলেছিল সেই কথাটি হলÑ জেলার শিক্ষার মান ক্রমাগত নি¤œগামী হচ্ছে, জাতীয় পর্যায়ে ৬৪ জেলার মধ্যে শিক্ষার ক্ষেত্রে সুনামগঞ্জের অবস্থান ৬২ বা ৬৩ তম। তাঁরা এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সকলের সমন্বয়ে একটি শিক্ষা আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। আমাদের সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আক্ষেপ করে বলেছেন, সুনামগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে সত্য কিন্তু ওখানে সুনামগঞ্জের ছেলে-মেয়েরা ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে না। তাঁর খেদোক্তি আরও স্পষ্ট হয় যখন তিনি বলেন, আমাদের ছেলেরা বিশ্ববিদ্যালয় হলে বড়জোর ওখানে ভাতের দোকান দিতে পারবে। কী নিদারুণ আত্মগ্লানি থেকে এমন কথা উচ্চারণ করা যায়, এই কথা বলতে গিয়ে কতটা বুক ফেটে চৌচির হয়ে যায় তা বুঝতে কারও অসুবিধা হয় না। সংসদ সদস্য বলছিলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোর সংকট খুব বড় বিষয় নয়, এই্ সংকট কাটছে। শিক্ষকদের মান ও শিক্ষাদানে তাঁদের আগ্রহ বাড়ানোটাই আসল চ্যালেঞ্জ। আরেক কীর্তিমান প্রাক্তন শিক্ষার্থী হাইকোর্টের বিচারক বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী রুমির কণ্ঠেও আক্ষেপ ঝরেছে। তিনি বলছিলেন, আগে মৌলভীবাজার-সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ কলেজে অধ্যয়ন করতে শিক্ষার্থীদের ভিড় থাকত। এখন সুনামগঞ্জের অভিভাবকরা সন্তানদের পড়াশোনা করতে দলে দলে সিলেট-ঢাকা পারি জমাচ্ছেন। তিনি অনেকটা কষ্ট নিয়ে বলেছেন, সরকারিকরণের পর এখানে সাবজেক্ট কমে গেছে। বেসরকারি পর্যায়ে যে পরিসংখ্যান বিভাগ চালু ছিল সরকারি হওয়ার পর সেটি বাদ পড়েছে। তিনিও জেলার শিক্ষার মান ও পরিমাণ বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দিতে সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এ কথা একেবারেই চন্দ্র-সূর্যের মত সত্য যে, জেলার শিক্ষার মান সমানে কমছে। যে শিক্ষা প্রািতষ্ঠানগুলো সরকারি হচ্ছে- মাধ্যমিক স্কুল বা কলেজ নির্বিশেষে; সেগুলো বেসরকারি সময়ের মান ধরে রাখতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। এরকম অবস্থায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠার সরকারিকরণের ফলে জেলার শিক্ষাচিত্রের কোন্ উন্নয়ন হচ্ছে সেটি এখন সকলের প্রশ্ন। শুধু শিক্ষকদের চাকুরিগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করণার্থেই কি প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ? এমন হলে জাতীয়করণের কোনো দরকার নেই। বরং বেসরকারি অবস্থায় ম্যানেজিং কমিটি, এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও শিক্ষকদের মধ্যে যে আন্তরিকতা থাকে তাই শিক্ষার অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য। সরকারিকরণ হলে যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বেসরকারি সময়ের চাইতে কমে যায় তাহলে আমাদের দরকার নেই এমন জাতীয়করণ। পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে দেখুন যেসব প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে মাধ্যমিক স্কুল সরকারি হয়েছে সেগুলোতে সরকারিকরণের আগে অনেক বেশি শিক্ষক কর্মরত ছিলেন।
পুনর্মিলনী উৎসবকে ঘিরে জেলার শিক্ষার মান উন্নয়নের যে আকুতি সকলের মনে জেগে উঠেছে, সেটিকে কার্যকর প্রমাণ করতে অনেকগুলো উদ্যোগ নিতে হবে। আর এই উদ্যোগগুলো, বলাবাহুল্য জেলার নেতৃত্ব পর্যায় থেকেই আসতে হবে। প্রথম ও প্রধান কথা হচ্ছে, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপযুক্তসংখ্যক মানসম্পন্ন ও আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ শিক্ষকম-লীর সমাবেশ ঘটাতে হবে। শিক্ষার বাণিজ্যিক মনোবৃত্তিকে সর্বাংশে বিলুপ্ত করতে হবে। অভিভাবকদের মধ্যে সন্তানদের সুশিক্ষার সদিচ্ছার জাগরণ ঘটাতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে শিক্ষা গ্রহণের উপযুক্ত মানসিকতা তৈরি করতে হবে। এগুলো অর্জন করা সহজ কাজ নয়। যখন সংকল্প দৃঢ় হবে, সকলেই যখন মনপ্রাণ খোলে চাইবেন; তখনই এটি কার্যকর হতে শুরু করবে।
দেশের মেধাগত অবস্থানগুলোতে এখন জেলার প্রতিনিধিত্ব লজ্জাজনক। জাতীয় প্রতিযোগিতায় আমাদের ছেলে-মেয়েরা ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এ আমাদের জেলাবাসীর লজ্জা। এ লজ্জা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদেরই উদ্যোগ নিতে হবে।