ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ
শান্তিগঞ্জে পুলিশের মারপিটে এক ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে দাবি করে কয়েক হাজার মানুষ তিন ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখে। সোমবার দুপুর ২ টা থেকে ৫ টা ৫ মিনিট পর্যন্ত সড়ক অবরোধ ছিল। একারণে সুনামগঞ্জ—সিলেট সড়কে কয়েক’শ যানবাহন আটকা পড়ে। হাজার হাজার মানুষ দুর্ভোগের শিকার হন। অবরোধকারীদের শান্ত করতে দক্ষিণ সুনামগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে তোপের মুখেও পড়েছিলেন। পরে দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ারুজ্জামানকে। তার গাড়ি মরদেহ’এর উপর দিয়ে এসেছে, এমন কথা ঘটনাস্থলে প্রচার হলে অবরোধকারীরা আরও বিক্ষুব্ধ হন। পরে সুনামগঞ্জ জেলা সদর থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের আশ^াস দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। বিকাল ৫ টা ৫ মিনিট থেকে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
উজির মিয়া (৪০) উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের শত্রুমর্দন (বাঘেরকোনা) গ্রামের মৃত কাঁচা মিয়ার ছেলে ও দুই সন্তানের জনক। পেশায় তিনি একজন কৃষক ছিলেন।
নিহতের ভাতিজা উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন তালুকদার জানান, এই মাসের প্রথম দিকে তাদের গ্রাম শত্রুমর্দনে ১০—১২ টি বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটে। এসময় তার চাচা উজির মিয়ার বাড়িতেও চুরি হয়। তিনি থানায় গিয়ে পাশের গ্রাম রসুলপুরের শামীম আহমদসহ কয়েক জনের বিরুদ্ধে থানায় চুরির অভিযোগ করেন। পরে শামীম আহমদ পুলিশকে জানায়, চুরি করা মালামালের ভাগ উজির মিয়াও পান। এরপরই তার চাচাকে ৯ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ধরে এনে বেধরক মারপিট করে। শান্তিগঞ্জ থানার এসআই দেবাশীষ, পার্ডন কুমার সিংহ ও এএসআই আক্তারুজ্জামান গ্রামে গিয়ে তার চাচা (উজির মিয়া (৪৫) কে চোর সন্দেহে আটক করে নিয়ে আসেন। ১০ ফেব্রুয়ারি জামিন লাভ করেন তিনি। থানায় থাকার সময় বেধরক মারপিটে আহত চাচা উজির মিয়াকে ওই দিনই গভীর রাতে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ওখান থেকে বাড়ি আসলেও তিনি সুস্থ্য হন নি, সোমবার তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনা এলাকাবাসী মানতে পারেন নি, তারা প্রতিবাদে নামেন।
উজির মিয়ার বোন শিপা বেগম বললেন, তার ভাইকে চোর কিংবা খারাপ লোক এটি এলাকায় কেউই বলবেন না। কিন্তু তাকে ঘর থেকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। এই ঘটনায় তারা সংবাদ সম্মেলন করতে চেয়েছিলেন। থানার ওসি (তদন্ত) মিজানুর রহমান ও সেকেন্ড অফিসার বাড়িতে এসে দুঃখ প্রকাশও করেছিলেন। তিনি জড়িত পুলিশদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
নিহত ছোট ভাই ডালিম মিয়া বলেন, আমার ভাই নির্দোষ। চুরির কোনো ঘটনা কো দূরে থাক্ সামান্য বিষয় নিয়েও কোনো বিচার আমার ভাইয়ের কেউ করেনি। পুলিশ ধরে নিয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে তাকে টর্চার করে মেরে ফেলা হয়েছে। আমি খুনিদের ফাঁসি চাই।
অপর ছোটভাই ইমন মিয়া বলেন, বিক্ষোভ চলাকালীন সময় রাস্তায় শুয়ে রাখা নিথর দেহের উপর দিয়ে নৃশংসভাবে গাড়ি চালিয়ে যায় ইউএনও। একটা মকনুষকে কয়বার হত্যা করা যায়? মৃত লাশকেও আবার গাড়ি চাপা দেওয়া হয়েছে। কী দোষ করেছে আমার এ হতভাগ্য ভাই? এর বিচার চাই।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ বললেন, চুরির ঘটনায় এলাকায় বিচার—সালিশ হয়েছে, বিচারে উজির মিয়া সোচ্চার ছিলেন। পরে পুলিশ তাকেই গ্রেপ্তার করেছে। তাকে পাশের দরগাপাশা ইউনিয়নের বুরুমপুর গ্রামের গরু চুরির মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এরপর থেকে তিনি শারীরিক কষ্টে ভুগছিলেন। সোমবার তার মৃত্যু হলে কেউ মেনে নিতে পারেন নি। হাজার হাজার মানুষ প্রথমে লাশ নিয়ে পথ অবরোধ করে মানববন্ধন করেন। পরে বিক্ষোভে মানুষ বাড়তে থাকলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় সবকিছু। আমি জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে জানাই। সেখান থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসে সুষ্ঠু বিচারের আশ^াস দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
শান্তিগঞ্জ থানার ওসি কাজী মুক্তাদীর হোসেন বললেন, চোর সন্দেহে উজির মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। গ্রেপ্তারের সময় তিনি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এসময় একটি গাছে লেগে মাথায় আঘাত পান উজির মিয়া। সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে কোর্টে চালান দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ তার উপর কোন নির্যাতন চালায় নি। এরপরও কোন ঘটনা হয়ে থাকলে, তদন্তে বেরিয়ে আসবে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু সাইদ বলেন, আমরা পুরো ঘটনার সঠিক তদন্ত করে দ্রুত দোষীদের আইনের আওতায় আনবো। কেউ দোষ করে থাকলে দোষীরা কোনোভাবেই ছাড় পাবে না। আপনার আমাদের উপর আস্থা রাখেন। দ্রুতই ব্যবস্থা নিচ্ছি।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ারুজ্জামান বললেন, উজির মিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে পথরোধ করেন। তাদের শান্তনা দেবার জন্য ওখানে গিয়েছিলাম আমি। লোকজন আমার উপর চড়াও হলে আমি দ্রুত ওখান থেকে চলে আসি। আমার গাড়ি মরদেহের উপর দিয়ে আসে নি।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আনোয়ার আলিম বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে যেই জড়িত হোক এবং যদি ইচ্ছাকৃত হয়ে থাকে তাহলে তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।