আবু হানিফ চৌধুরী, দিরাই
১৯৭১ সালে পাকহানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী বাঙালি দালাল রাজাকাররা সুনামগঞ্জে যে কয়েকটি বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল দিরাই-শাল্লার মিলনস্থল পেরুয়া শ্যামারচর হত্যাযজ্ঞ।
অর্ধশতাধিক নারীকে গণধর্ষণ, পুরুষ মহিলা ও শিশু সন্তানসহ ৩৫ থেকে ৪০ জনকে হত্যা এবং জ্বালিয়ে দেয়া
হয়েছিলো পেরুয়া, দাউদপুর এলংজুড়ি, শরমা ও শ্যামারচর গ্রামের কয়েক’শ ঘরবাড়ী।
এই গণহত্যা পাশবিক নির্যাতনের নেতৃত্ব দিয়েছিল রাজাকার আব্দুল খালেক, মুকিত মিয়া, ডা. আব্দুছ ছোবহান, মৌলভী আনসার উদ্দিনসহ বিভিন্ন অঞ্চলের রাজাকাররা।
কিন্তু পাক হায়েনাদের দোসরেরা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বর্তমান সরকারি দল আওয়ামী লীগের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যাওয়ায় তাদের প্রভাব পাকিস্তান সময়কালের মতো এখনও রয়েছে। তাদের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পায় না নির্যাতিত পরিবারের জীবিত সদস্যরা। দেশ স্বাধীনের পর ৭২ সালে দালাল আইনে ওই রাজাকারদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল কিন্ত সেই মামলা আজও আলোর মুখ দেখেনি। এই গণহত্যায় বেঁচে যাওয়া অনেকেই এখনো গুলির ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছেন।
এছাড়া পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার বীরঙ্গনা কুলসুমা বিবি, জামিলা খাতুন, মুক্তাবানু, পেয়ারা বেগম ও জাহেরা বেগমসহ ও প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী কয়েকজন এখনো জীবিত রয়েছেন।
জানা যায়, দিরাই থানায় ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও এর সংলগ্ন হাসপাতালে ছিল রাজাকারদের ক্যাম্প। এখান থেকেই রাজাকাররা পাকিস্তানি হানাদারদের নিয়ে নিরীহ বাঙালি ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী পরিবারের উপর অত্যাচার চালাতো।
সেদিন ছিলো ৬ ডিসেম্বর শনিবার। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী বিভিন্ন জায়গা থেকে পালাতে শুরু করেছে এবং দেশ প্রায় স্বাধীন হওয়ার পথে। এ খবর এখানকার দালাল রাজাকারের কাছেও ছিল, তাদের পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পেরেই দালালরা মরণ কামড়ের নেশায় মত্ত হয়ে উঠে। তারা ধ্বংসযজ্ঞের জন্য শ্যামারচরকেই বেছে নেয়। পরাজিত রাজাকাররা সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থান থেকে রাজাকার আব্দুল খালেক মিয়ার বাড়ি দৌলতপুরে গিয়ে আশ্রয় নেয়। তারা রে শ্যামারচর বাজারে সংগঠিত হতে থাকে। এই খবর পেয়ে অসংগঠিত দুটি মুক্তিযোদ্ধার দল ৬ ডিসেম্বর শনিবার ভোররাতে সুরমা নদীর পশ্চিম তীর দিয়ে পেরুয়া গ্রাম থেকে রাজাকারদের উপর হঠাৎ আক্রমণ চালায়। তাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের আরো দুটি দল যোগদানের কথা থাকলেও তারা যোগ দিতে পারেননি। অন্যদিকে রাজাকারদের একটি দল গ্রামের দক্ষিণ পশ্চিম দিক থেকে, আরেকটি কার্তিকপুর থেকে এবং আরেকটি শ্যমারচর বাজার থেকে সরাসরি একযোগে তিন দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ করে। তিনদিক থেকে আক্রমণের মুখে মুক্তিযোদ্ধা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান।
এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হান্নান, আব্দুল কদ্দুছ, আব্দুল হামিদ ও হেমেন্দ্র দাস শহীদ হন। এর মধ্যে সৌভাগ্যক্রমে পেটে গুলিবিদ্ধ হয়েও বেঁচে যান সুধীর দাস, জহরলাল দাস, কনক প্রভা রায়, ব্রজেন্দ্র কুমার দাস। বজেন্দ্র কুমার রায় এখনো সেই দুঃসহ স্মৃতি ও ক্ষত নিয়ে গ্রামেই নিভৃত জীবন যাপন করছেন।
দিরাই-শাল্লার মিলনস্থল শ্যামারচর এলাকায় যুদ্ধকালীন সময়ে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অভয়ারণ্য এবং সে এলাকায়ই ছিল দিরাইয়ের কুখ্যাত রাজাকারের বাড়ী। ঐদিন বিকেলে শাল্লা উপজেলার আটগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সত্তরের প্রাদেশিক পরিষদের পরাজিত প্রার্থী আব্দুল খালেকের নেতৃত্বে শাল্লা উপজেলার উজানগাঁও, দাউদপুর, শরমা ও দিরাই উপজেলার পেরুয়া, এলংজুড়ি, শ্যামারচর গ্রামের সংখ্যালঘু ও স্বাধীনতার স্বপক্ষে অবস্থানকারী বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের নারী-পুরুষকে ধরে এনে শ্যামারচর ব্রজেন্দ্রগঞ্জ আরসি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জড়ো করে সবার সামনে সুরমা নদীর পাড়ে ২৭ জন পুরুষ লোককে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে পিছন দিয়ে হাত বেঁধে পিছন থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এখানেই ক্লান্ত হয়নি তারা পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে চালায় তান্ডব আর পাশবিক নির্যাতন।
সম্প্রতি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সংগঠিত পেরুয়া-শ্যামারচর হত্যাযজ্ঞে জড়িত অপরাধিদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা মো. নূর হোসেনের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের একটি তদন্তদল এ ঘটনার তদন্ত করে যাচ্ছেন।
গত ১৪ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খান পিপিএম ঘটনাস্থল শ্যামারচর পেরুয়া এলাকা পরিদর্শন ভুক্তভোগী স্বজন হারা পরিবার ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মতবিনিময় করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. নূর হোসেন বলেন,‘ দিরাই ও শাল্লা থানা পুলিশের সহযোগিতায় আমরা তদন্ত করেছি, এখানকার দৌলতপুর, পেরুয়া ও উজানগাঁওয়ের শতাধিক প্রত্যক্ষদর্শীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলেছি, তারা প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে সহায়তা করেছেন আমাদের। জিজ্ঞাসাবাদে গণহত্যা, হত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণের স্বাক্ষী প্রমাণ মিলেছে’। তিনি জানান- পাক হায়েনাদের সহায়তাকারী ১০-১২ জনের নাম পরিচয় ঘটনার প্রত্যক্ষ স্বাক্ষীরা বলেছেন, আরো অনেক রাজাকারের নাম আসছে, যাচাই শেষে ট্রাইব্যুনালে রিপোর্ট জমা দেয়া হবে।’ তদন্তের স্বার্থে যুদ্ধাপরাধীদের নাম পরিচয় এখন প্রকাশ করা যাবে না বলে জানান এই কর্মকর্তা।