- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

প্রণোদনার সার বীজ বিতরণ অসময়ে

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
জামালগঞ্জে বোরো আবাদে কৃষক এখন পুরোদস্তুর সাইল ক্ষেত প্রস্তুতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বীজতলায় বেড়ে ওঠা ধান চারার দিকে চেয়ে রোপণের ক্ষণ গুণছেন কৃষকেরা। হাওরের কূলঘেঁষা জালাচারগুলোও সবুজ হাসিতে সে কথাই জানান দিয়ে যাচ্ছে। আর সপ্তাহ দুয়েক পরেই ধানের চারা উৎপাটন ও রোপণের কাজে ব্যস্ত হতে দেখা যাবে বোরো চাষীদের। কৃষক এখন বীজতলা ছেড়ে আঁটসাঁট বেঁধে রোপণযোগ্য জমিনে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেও গত কয়েকদিন ধরে বিনামূল্যের সরকারি সার-বীজ বিতরণের গুরুদায়িত্ব পালন করছে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। অসময়ে বন্টনকৃত সার-বীজ পেয়ে কৃষকের কোন কাজে আসবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে এ কার্যক্রম সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হচ্ছে, তাদের কিছু করার নেই বলে দাবি করেছে উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর।
হালি হাওরসহ আশপাশের ছোট-বড় কয়েকটি হাওর ঘুরে দেখা যায়, বোরো চাষীরা এখন সাইল ক্ষেতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বোরোর বীজতলার চেয়ে কৃষকের নজর এখন ধানী জমিতে। ক্ষেতে কেউ ট্রাক্টর দিয়ে হালচাষ করছেন, কেউ কোদাল দিয়ে জমিনের তীরে জমাটবাঁধা পরিত্যক্ত মাটি সরানোর কাজ করছেন, কেউ কেউ ক্ষেতে পানি সেচে নিজেকে নিয়োজিত রাখছেন, কেউবা ক্ষেতের আইল প্রস্তুতে হাত দিয়েছেন। কৃষকের এই ব্যতিব্যস্ততার মাঝে কৃষি বিভাগ অসময়ে কৃষি উপকরণ বিতরণ করছে। উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দুই কর্মসূচির আওতায় সার ও বীজ বিতরণ করা হচ্ছে। যারা হাইব্রিড তারা শুধু ২ কেজি বীজই পাচ্ছেন। আর যারা উফসী ব্রি ধান অর্থাৎ ২৮, ২৯, ৮৮, ৮৯, ৬৭ জাতের চাষী, তারা ৫ কেজি বীজ এবং ২০ কেজি সার পাচ্ছেন। এর মাঝে ১০ কেজি ডিএপি ও ১০ কেজি এমওপি সার রয়েছে। উপজেলার ৪ হাজার কৃষকের মাঝে শুধু হাইব্রিড বীজ ও ৩ হাজার ৬০০ উফসী চাষীদের মাঝে সার ও বীজ বিতরণ করা হচ্ছে। দুই জাত মিলিয়ে সারা উপজেলায় ৭ হাজার ৬ কৃষক বিনামূল্যের সার ও বীজ সুবিধা পাচ্ছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জেলার ৪০ হাজার কৃষককে পাঁচ কেজি করে উফশী বোরো ধান বীজ এবং ১০ কেজি করে বিএপি এবং ১০ কেজি এমওপি দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ৩৮ হাজার ৫০০ কৃষককে দুই কেজি হাইব্রিড বোরো বীজ দেওয়া হচ্ছে॥
হাওরপাড়ের একাধিক কৃষক জানান, অগ্রহায়ণ মাসের শুরুতে বোরোর বীজতলা প্রস্তুত এবং বীজধান ভিজানোসহ কৃষককে নানা কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। তা চলে অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি পর্যন্ত। পরে কোণ, কোদাল, মই ও ট্রাক্টর নিয়ে নামতে হয় সাইল জমিনে। ধান রোপণের আগ পর্যন্ত চলে এ কাজ। পৌষ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হয় ধান রোপণ। যা মাঘের মাঝামাঝি পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। এ মুহূর্তে কৃষি অফিসের কৃষিসামগ্রী বিতরণের যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে তাতে কৃষক তেমন লাভবান হবে না বলে জানিয়েছেন বোরো চাষীরা।
ফেনারবাঁক ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর টাকিপাড়া গ্রামের কৃষক কামাল মিয়া বলেন, ‘কৃষি অফিস থাইক্যা আমি ১৭ জনের বীজ একসাথে আনছি। কেউ বীজ আনার লাগি গেছে না। সবগুলা আমি আইন্যা যার যার নামে বিলাইয়া দিছি। প্রত্যেকে দুই প্যাকেট কইরা পাইছে। আমিও দুই প্যাকেট পাইছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই বীজগুলা আরও সপ্তাহ-দশদিন আগে দেওয়ার দরকার আছিল। সরকার গরীব-কাঙ্গালরে দিছে কৃষিকাজে সুবিধার লাগি। আমি নিজে ৪০০ টাকা কেজি ধান আইন্যা বাইন করছি। মাইনষের জালাটালা ফালাইয়া শেষ। এখন তেমন একটা কাজে লাগত না।
হালি হাওর পারের লম্বাবাঁক গ্রামের কৃষক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমি জালা ফেলাইছি অগ্রহায়ণের প্রথম দিন। আমার জালা মোটামুটি রোপণের উপযুক্ত হইয়া গেছে। এখন হাইব্রিড যে বীজগুলা দেওয়া হইতাছে এগুলো কৃষকের কোন কাজে আসবে না।’
জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও কৃষক শাহজাহান সিরাজ বলেন, সরকার কৃষকের লাভের কথা চিন্তা করে বিনামূল্যে সার ও বীজ বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু অসময়ে এগুলো বিতরণ করায় কৃষকের কোন লাভ হবে না।
ভীমখালী ইউপি চেয়ারম্যান মো. আখতারুজ্জামান তালুকদার বলেন, সার-বীজ বিতরণের কার্যক্রমটা যদি আরও আগে শুরু করা যেত তাহলে কৃষক শতভাগ উপকৃত হত। সরকারের উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখত। এখন বীজ পেয়ে স্কীমের চাষীরা কিছুটা উপকৃত হলেও বাকিদের কাজে লাগবে না।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বলেন, কৃষকদের সার ও বীজ সুবিধা পাইয়ে দিতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। আমাদেরকে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই কাজ করতে হয়। সার ও বীজ পাওয়ামাত্রই আমরা বিতরণের কাজ শুরু করে দিয়েছি। শুক্র-শনিবার বন্ধের দিনও এ কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। যারা স্কীমের জমি করে তাদের কাজে লাগবে। কিছু চাষী আছে হয়তো তাদের কাজে আসবে না। আমরা ইউনিয়ন পরিষদকে বলে দিয়েছি যারা এখনও বীজ বপন করেননি তাদেরকে যেন এ প্রণোদনাটা দেওয়া হয়।
হাওরাঞ্চলে যাতে আরও বিশদিন আগে এ সুবিধাটা দেওয়া হয় সরকারের কাছে সেই আবেদন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, বিএডিসি ও কৃষি ডিপার্টমেন্ট দুইটা আলাদা আলাদা বিভাগ এতে জড়িত। আমরা চেষ্টা করি দুই বিভাগের সমন্বয়ে দ্রুত সার ও বীজ বন্টনের। এ ব্যাপারটা আসলে সরকারের ঊর্ধ্বতন সিদ্ধান্ত।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বললেন, জেলায় ১১ হাজার হেক্টর বীজতলার মধ্যে এখনো ২২ শ’ হেক্টরে বীজ বপনের বাকী। ১০ দিন আগে বীজ বিতরণ শুরু হয়েছে। বিএডিসি বীজ সরবরাহ করতে সময় নেওয়ায় বিতরণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। কালকের মধ্যে বীজ বিতরণ শেষ হয়ে যাবে। ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বোরো বীজ বপন করতে পারবেন কৃষকরা।

  • [১]