- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

প্রণয়ের পদধ্বনি নয়, শুধু আরও কীছু…

কুমার সৌরভ
[কাব্য> প্রণয়ের পদধ্বনি, মঈনুল ইসলাম নান্না, প্রচ্ছদ> আখতার উজ্জামান, প্রকাশক> শব্দকথা প্রকাশন, ৩৪৩৩ রামকৃষ্ণ মিশন রোড, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ> একুশে বইমেলা ২০২২]
মঈনুল ইসলাম নান্না চিকিৎসক ও কবি। একইসাথে ভাল গদ্য লিখেন (তাঁর ফেসবুকের পোস্ট পড়ে এই ধারণা)। আমার প্রিয় শিক্ষক শ্রদ্ধাষ্পদ জনাব মো. মুহিবউল ইসলাম চৌধুরী (এম.আই. স্যার) এঁর ছেলে। তাঁর সদ্য প্রকাশিত কাব্য ‘প্রণয়ের পদধ্বনি’ -এ ৪৫টি কবিতা সংকলিত রয়েছে। প্রতিটি কবিতায় কবি-মনের গহীনে জমে থাকা উপলব্ধি ব্যঞ্জনার বৈচিত্র নিয়ে ফুটে উঠেছে। কবিতা রচনার সময় কবি নিজেকে স্বচ্ছতুয়া বিশাল দীঘি মনে করে তার গভীর জলে ডুব দেন। কখনও খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে নিজের বাইরের চেনা ও অচেনা জগতের সুর ও অসুরকে চিনতে ব্যস্ত হন। তখন তিনি একই সাথে নিজেকে চেনার চেষ্টায় নিরত থাকেন। নিজেকে চিনলেই জগৎকে চেনা যায়। আপন ভাবনার সামাজিক সত্তা বুঝা সম্ভব হয়। কবি মঈনুল ইসলাম নান্না মানুষের মনের এমন দ্বৈধ অবস্থার স্বরূপ তুলে ধরেছেন বইয়ের প্রথম কবিতায়ই-
“বিছানা থেকে পা নামাতে গিয়ে যদি কোনো
পিঁপড়া চাপা পড়ে যায়,
বেদনায় আপ্লুত হয়ে ওঠে আমার মন।
ভীষণ কষ্টে কাটে সারাটি দিন।
আহা এ-ও তো একটা জীবন।”
(অথচ এই আমিই)
একান্ত নির্জনে উদ্ভূত এমন মানবিক উদারতা
নিমিষেই হারিয়ে যায় আর জেগে উঠে অমানবিক সেই মন যেখানে-
“অথচ
যখন শুনি কোনো অসহায় অন্ধ বৃদ্ধের করুণ মিনতি
‘আল্লার ওয়াস্তে চাইড্ডা খয়রাত দেন বাবা’
ক্রোধাগ্নি জ্বেলে দু’চোখে,
বেনসনে দাঁত পিষে, এই আমিই হিসহিসিয়ে বলি,
-মাফ র্ক শুয়োরের বাচ্চা।”
(প্রাগুক্ত)
বর্তমান পুঁজিদাস সময়ের ভদ্রলোকরা এমনই। এরা সভা-সমিতি-লোকালয়ে সজ্জন হয়ে ঘুরে বেড়ায় অথচ নিজের কাজের জগতে একেবারেই হাড়েহারামজাদা। কখনও ধর্মসভা, কখনও সমাজসভায় নীতিকথার বাণ ছুটায় কিন্তু সামাজিক জীবনে যাবতীয় অপকর্মের দোসর হতে একটুও কসুর করে না। কবি সঠিকভাবেই মানুষের এই বৈপরীত্য চিহ্নিত করতে পেরেছেন।
অসহায় কাত্যায়নীর কষ্ট কবি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছেন। প্রান্তিক অবলা কাত্যায়নীর সম্ভ্রম হারানোর কষ্টকথা কবিমনকে এতোটাই দুঃখভারাক্রান্ত করে তোলে যে তিনি কাত্যায়নীর মুখ দিয়ে নিজেই অভিশাপের আগুনে পুড়িয়ে মারতে চাইছেন সামাজিক দুর্বৃত্তদের-
“অসহায় বালিকা কাঁদে
অশ্রু মিশে যায় বৃষ্টি ধারার সাথে
চোখ বোজে
ভেসে উঠে কালী ঠাকুরের মুখ
মা, তুই দেখিস
গলায় রক্ত ওঠে যেন সব ক’টার।”
(কালিমা/৪)
নিষ্ঠুর সমাজবাস্তবতায় কবির কবিতায় কাত্যায়নী আত্মহনন করে জ্বালা মিটায়। মনের ক্রোধ অভিশাপের আগুনে রূপান্তরিত হয়ে ভষ্ম করতে চায় ভ্রষ্টতার জঞ্জাল। কিন্তু অভিশাপ বা আত্মহননে কি সামাজিক অনাচার পুড়ায়? এর উত্তর চাই আমরা পাঠকসমাজ। কারণ কবিরাই পথ তৈরি করে দেন, কবিরাই যে একমাত্র সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান, কবিকণ্ঠই তো স্বাধীনতার অমৃতধারা।
কবি এ উত্তর দিয়েছেন ‘গর্জে ওঠো’ কবিতায়। সেখানে তিনি বলছেন-
“সুদিনের প্রত্যাশায়
হাত গুটিয়ে বসে থাকার কোনো মানে থাকতে পারে না।
বাহুবলে ভাগ্যকে ছিনিয়ে আনাই পৌরুষ।
………………
তাই অধিকার প্রতিষ্ঠার দৃঢ় সংকল্পে
জ্বলে ওঠো তুমি সুতীব্র আক্রোশে।”
( গর্জে ওঠো)
কবি ঐতিহাসিক পরিক্রমার মধ্য দিয়েও এমনটাই অনুভব করেছেন-
“আমি বায়ান্নের ভাষা বিপ্লবে ছিলাম
বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনে ছিলাম
উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানে ছিলাম
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ছিলাম
নব্বইয়ের স্বৈরাচার পতনে ছিলাম।
……………..
আমি পুনরায় জেগে উঠেছি
মহাবিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়েছি প্রচ- ক্রোধে
অবিনশ্বর অস্তিত্ব নিয়ে।”
(আমি আছি)
এই ভাবনার পরিপূর্ণতা দেখি ‘অরুণ, আপোস, বিদ্রোহ’ কবিতায়। যেখানে তার দ্বিধাহীন উচ্চারণ-
“আমি কিছুতেই হারাবো না
আমার স্বকীয়তা
বিদ্রোহ
বিপ্লব।”
‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি স্পষ্ট করে ফেললেন নিজের ইতিকর্তব্য-
“শুধু যখন কোনো অর্বাচীন প্রচ- ঘৃণায়
গালি দেয় আমার দেশকে
বিস্তার করে ষড়যন্ত্রের জাল
ছিনিমিনি খেলায় মেতে ওঠে
দেশের স্বার্থ নিয়ে, স্বকীয়তা নিয়ে
তখনই- কেবল তখনই
শপথ আমার প্রতিপালকের
আবার জ্বলে উঠতে ইচ্ছে করে
বিদ্রোহের অনলে।”
কবির এমন বিদ্রোহী আহ্বানে আমরা প্রাণিত হই। মহাবিদ্রোহের পর এক মহাশান্তিময় জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। আবার দ্বিধাও পিছু ছাড়ে না। কবিভাবনার সেই বিদ্রোহের স্বরূপ কী? অসাম্যপীড়িত বিশ্ববাস্তবতায় মানুষের মুক্তির প্রকৃত পথ কোনটি? বিদ্রোহ-বিপ্লব নিয়ে নানা মুনির নানা পথে আমরা বিভ্রান্ত হই। তবে একটা জিনিস বুঝি। শ্রেণিবিভক্ত সমাজ ব্যবস্থায় অলৌকিক কোনো উপায়ে এর অবলোপন ঘটবে না। এমন ভ্রান্তিবিলাসে মগ্ন হওয়ার নামও পলায়নপরতা। আজ যে-সব মন্দাক্রান্ত বাস্তবতার দেখা পাই আমরা সর্বত্র, তার অবসানে দরকার পরিষ্কার পথের দিশা। যে দিশা দেখাতে পারেন কবিরাও।
মানুষের বয়স বাড়ার সাথে চিন্তার পরিবর্তন ঘটে। শৈশবে যে ঘাসফরিংয়ে উচ্ছ্বলতা তৈরি হয় যৌবনে তা অনুরাগ জাগিয়ে চন্দ্রমল্লিকার রঙে হারিয়ে যেতে পারে অথবা রাজপথের তপ্ত মিছিলে আগুনপাখির মতো সবকিছু পুড়িয়ে দিতেও পারে। এই একই মানুষ প্রৌঢ়ত্বের গ্রিলঘেরা বারান্দায় বসে আকাশের দিকে অবাক দৃষ্টি ছুঁড়ে নিমগ্ন নির্জনতায় ধ্যানের আরেক জগত তৈরি করে নিতে পারে। জরাগ্রস্ত বার্ধক্যে অপরিবর্তিত দেহ-সত্তায় ক্রন্দনকাতরতা কিংবা মোহমুক্তির অপার্থিব উদ্ভাসন দেখা দিতে পারে। এবম্প্রকার বাঁকবদলের কিস্তিখানির নাবিক হেই সামালো হেই সামালো… বলতে বলতে কোথায় কীভাবে নোঙর ফেলবে তাও অননুমেয়। তবে মানব জীবনের সার্থকতা হলো- জীবনের লক্ষ স্থির করা এবং চলতি পথের বাঁকে বাঁকে তাতে অবিচল থাকা। পরিক্রমার শেষ বিন্দুটি হলো গন্তব্যের ঠিকানা। কাব্যের শেষ কবিতাটিও এমনভাবে কবির সারা জীবনের যাবতীয় উপলব্ধির সারাৎসার হয়ে উঠে। আমাদের কবি মঈনুল ইসলাম নান্না কাব্যের শেষ কবিতায় সকাতরে গেয়ে উঠেছেন-
“আমাকে মুক্তি দাও
সকল জাগতিক বন্ধন থেকে;
আমাকে মুক্তি দাও
সকল জাগতিক দায় থেকে।”
(মুক্তি দাও)
কবির এই আবেদনটুকোই পাঠকমনে গেঁথে থাকবে, কবি হয়তো নিজের পরিণত ভাবনাকে পাঠকমনে এভাবেই জায়গা করিয়ে নিতে চান।
সবশেষে বলি, কবি নান্না পেশাগত জীবনে চিকিৎসকের মানবিক ব্রতে নিয়োজিত রয়েছেন। চিকিৎসক মানুষের অসুখ সারিয়ে তাকে সুখ দেন। এই চিকিৎসকের মনোভূমি যখন কবি-মনের সংবেদনশীলতায় পলিময় হয়ে ওঠে তখন তা আরও অর্থবহ, আরও কল্যাণকর আরও শুভবোধতাড়িত হয়ে উঠে। কাব্য ও সেবার মেলবন্ধনে যে কবি এখন পরিণত হয়েছেন, আমাদের প্রত্যাশা- তিনি সকলের চিত্ত ও বিত্তের অভাব ঘুচাতে কলমকে শাণিত রাখবেন, সেবাব্রতী চিকিৎসার হাতকে পীড়িতের ভরসায় পরিণত করবেন।
কবি ও কবিতার সমৃদ্ধি কামনা করি।

  • [১]