- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

প্রতিবন্ধীদের প্রেরণার উৎস অন্ধ মৃত্যুঞ্জয়

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যে মানুষের সুজনশীলতাকে আটকে রখতে পারে না অন্ধ মৃত্যুঞ্জয় তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মাত্রই সমাজ ও পরিবারের বোঝা, তাঁরা অন্যের গলগ্রহ হয়ে কোনো মতে জীবন ধারণ করবেন, তাঁরা পরনির্ভরশীল হয়ে থাকবেন; এমন ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস সম্মানের সাথে জীবন যাপনের উদাহরণ তৈরি করে আরও বহু প্রতিবন্ধীর কাছে অনুকরণীয় হয়ে উঠেছেন। গতকাল তাঁকে নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে একটি সংবাদ ফিচার প্রকাশ হয়। দিরাই উপজেলার করিমগঞ্জ ইউনিয়নের পুরাতন কর্ণগাঁও গ্রামের বাসিন্দা মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস। তাঁর বর্তমান বয়স ৩০ বছর। ১২ বছর বয়সে তিনি চোখের জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারান। অভাবের কারণে কোনো চিকিৎসা নিতে পারেননি তিনি। এরকম অবস্থায় মৃত্যুঞ্জয়ের জীবনে ঘোর অন্ধকার নেমে আসার কথা। কিন্তু মৃত্যুঞ্জয় অন্য ধাতুতে গড়া এক জীবন সংগ্রামী। তিনি হেরে যাওয়ার পাত্র নন। নন নুয়ে পড়ার মতো মেরুদ-হীন চরিত্র। যে বিদ্যা তার হাতে ছিলো তাই অবলম্বন করে জীবনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তার জানা ছিলো বাঁশের কাজ। বাঁশ দিয়ে কুলা, চাটাই, চাঙারি, টুকরি, উড়া, ডালা, খলই ইত্যাদি তৈরি করার কৌশল ছিলো তাঁর করায়ত্ত। ওই বিদ্যা সম্বল করেই যাত্রা শুরু তাঁর। এখনও রয়েছেন এই পেশায়। পেশাটি তাকে খুব বেশি স্বচ্ছলতা দিতে না পারলেও মুখে দু’’মুঠো খাদ্যের জোগান দিতে পেরেছে। তিনি বিয়ে করেছেন। বাবা-মা আর ছোট ভাইকেও তিনি প্রতিপালন করেন।
একটা আফসোস আছে মুত্যুঞ্জয়ের। যে দ্রব্য তিনি উৎপাদন করেন তার ন্যায্যমূল্য পান না তিনি। পাইকারদের কাছে জিনিস বিক্রি করেন বলে মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি থাকে পাইকারদের হাতে। তাঁর উৎপাদিত দ্রব্য বাজারে যে দামে বিক্রি হয় তার চাইতে অনেক কম দাম পান তিনি। মূলত লাভের বড় অংশটি পাইকারদের পকেটে ঢুকে যায়। দিরাই বাজারে একটি নিজের দোকান থাকলে তিনি ন্যায্যমূল্যে জিনিস বিক্রি করতে পারতেন বলে জানিয়েছেন। আমাদের দেশে যে বাজার ব্যবস্থা চালু রয়েছে সেখানে সর্বত্রই মৃত্যুঞ্জয়ের মতো প্রান্তিক উৎপাদকরা ঠকে থাকেন। কোনো প্রণোদনার অংশ পৌঁছে না মৃত্যুঞ্জয়দের কাছে। এরকম অসম বাজার ব্যবস্থার মাঝেও মৃত্যুঞ্জয় যেভাবে এখন অব্ধি নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছেন তাই তাকে অনন্য করে তোলেছে।
মৃত্যুঞ্জয়ের প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া নেই। কিন্তু জীবন শিক্ষায় তিনি শিক্ষিত। ওই শিক্ষা থেকেই তিনি বলতে পারেন, ‘ভিক্ষা করা, মানুষের কাছে হাত পেতে কিছু নেয়া আমি পছন্দ করি না। … কাজ করে খাওয়ার মাঝে আনন্দ আছে। সমাজে সবার সঙ্গে আনন্দ নিয়ে থাকা যায়।’ এই যে উপলব্ধি, বর্তমান সমাজে প্রায় বেশির ভাগ মানুষের মাঝে তা দেখা যায় না। এই সমাজে যেখানে যেকোনোভাবে অন্যকে ঠকিয়ে শুধু নিজের ভাগ বাড়ানোর উন্মত্ত প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায় সেখানে মৃত্যুঞ্জয়ের উপলব্ধি অনেক বেশি শিক্ষণীয়। মৃত্যুঞ্জয়ের এই বোধ থেকে আমাদের উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি জড়িত লোকজনের সহজিয়া জীবনবোধ ও সৎভাবে জীবন ধারণের আকাক্সক্ষার পরিচয়ও পাওয়া যায়। সাধারণের এই সততা মধ্যসত্ত্বভোগী ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কহীন শ্রেণির ধুরন্ধরবাজির কাছে আজ পরাজিত। মৃত্যুঞ্জয়রা তাই যেখানে নিজের উৎপাদন সামগ্রী দিয়ে পেটের ক্ষুধা মিটাতে হিমশিম খান সেখানে ওই দ্রব্যের ব্যবসা করেই মাঝখানের কিছু সুবিধাভোগী লোক অজস্র পরিমাণ লাভের টাকা নিজের পকেটে ঢুকানোর মওকা তৈরি করে নেয়। এই বৈষম্যমূলক আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের মাঝেই মৃত্যুঞ্জয়দের মুক্তি নিহিত।
সংগ্রামী ও আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাসকে আমাদের কুর্নিশ। তাঁর ও এমন লোকদের জন্য সম্মানের সাথে বসবাসের যোগ্য একটি সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠুক এই আমাদের কামনা।

  • [১]