(মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভাটি অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধ সমন্বয়ক সালেহ চৌধুরীর মতে হাওরবেষ্টিত ভাটি এলাকার প্রথম শহীদ আরশ আলী। এই সাহসী মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুদিবস আজ। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসাবে এই লেখাটি প্রকাশ করা হলো। লেখাটি সালেহ চৌধুরীর ভাটি এলাকার মুক্তিযুদ্ধ: আমার অহংকার বই থেকে নেয়া)
দাস পার্টির একজন সদস্য-দেখতে ছোটখাটো, কথাবার্তায়ও তেমন চৌকস নয়। সংগতভাবেই সে তেমন করে কারও নজর কাড়েনি, আমারও না। এই অতিসাধারণ ছেলেটিই আমাদের এলাকার প্রথম শহীদ হয়ে সবার মন জুড়ে বসল। নাম তার আরশ আলী। বাড়ি আজকের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার আসথুমা গ্রামে।
প্রতিটি গেরিলা দলকেই কয়েক দিন পর পর বিশ্রামের জন্য টেকেরঘাট পাঠানো হতো। দাস পার্টি তেমনি বিশ্রামে। আমি টেকেরঘাট গেছি। সকাল বেলা আরশ আলী এসে হাজির হলো। বলল, এখানে তো এমনি বসে আছি। দিন তিনেকের ছুটি দেওয়া হোক।
জিজ্ঞেস করে শুনলাম, তার বাড়ি জয়কলসের কাছে। সাত্তার ও তার রাজাকারদের ভয়ে ওদের পরিবার আরেকটু ভাটির দিকে এসে আশ্রয় নিয়েছে। যুদ্ধে আসার আগেই তার বিয়ে হয়েছিল। খবর পেয়েছে একটি মেয়ে হয়েছে। তিন দিনের ছুটি পেলে বাবা-মা আর মেয়েকে দেখে আসতে পারে।
আপত্তি করার কোন কারণ ছিল না। বললাম জ্যোতির অনুমতি নিয়ে চলে যেতে। এ ধরনের ছুটিতে কাউকে অস্ত্র নিতে দিতাম না। ওকে বলে দিলাম জ্যোতির কাছ থেকে দুটি গ্রেনেড চেয়ে নিতে।
নজরুলকে রেখে এসেছিলাম অচিনপুর গ্রামে। সেদিনই ওর কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল পাঠানো হচ্ছিল। ওটা জানতে পেরেই কিছুক্ষণের মাঝেই আরশ আলী ফিরে এলোÑস্যার, আর ছুটির দরকার নাই। আমাকে এই দলের সঙ্গে যুক্ত করে দিন। আরও জানাল, জ্যোতির সঙ্গে কথা বলেই এসেছে। তার আপত্তি নাই। আসলে টেকেরঘাট বসে থাকাকে অনেকে কষ্টকর মনে করত।
মানিক তখন নিয়োজিত ছিল দিরাইর উত্তর পাশে। তার প্রধান দায়িত্ব ছিল জয়কলস বা সুনামগঞ্জ থেকে কোন হামলা এলে তা প্রতিহত করা। মানিকের আরও জনবল দরকার। নজরুলকে জানিয়ে দিয়েছিলাম নতুন দল থেকে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে মানিকের সঙ্গে দিয়ে দিতে। আরশ আলীর ঝোঁক ছিল জয়কলসের কাছে যাওয়ার। সাত্তার বাহিনীর উপর বদলা নেওয়ার। অচিনপুরে গিয়ে সে মানিকের সঙ্গে যাওয়াই বেছে নেয়।
মানিক নদী আর হাওরে টহল
দিতে গিয়ে বাইবনা (ব্রাহ্মণী) গ্রামের এক মৌলবির সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে। চোরের থাঙ্কিদার (চোরাই মাল সামাল দেওয়ার সাহায্যকারী) হিসেবে মৌলবির কুখ্যাতি ছিল। মানিক এমন একটি লোককে সন্দেহ না করে তার দাওয়াত মেনে নেয়। দাওয়াত খেতে হাজির হয় তার বাড়িতে। মৌলবি ‘এই খাবার তৈরি হলো প্রায়, এইতো খাবার দেওয়া হবে’ ইত্যাদি বলে সময় কাটাতে থাকে।
মৌলবির বাড়ির পাশে খালে নৌকা রেখে মানিক সহযোদ্ধাদের নিয়ে পুকুর পাড়ে শুয়ে বসে অপেক্ষা করতে থাকে। হঠাৎ একজন চিৎকার করে উঠে Ñ একি, হানাদারেরা আসছে যে। একদল রাজাকার আর মিলিশিয়া রাইফেল বাগিয়ে ওদের দিকে তখন এগিয়ে আসছিল। চিৎকার শুনেই ওরা গুলি শুরু করে।
মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রপাতি সবই নৌকায়। ওরা দিশেহারা প্রায়। পরিস্থিতি সামাল দেয় দুই কিশোরÑখালিয়াজুরির ব্রজগোপাল আর দিরাই চানপুরের অনিল (?) । দুজনই হামা দিয়ে নৌকায় নেমে যায়। প্রথমেই উপরে ছুড়ে দেয় মানিকের এলএমজি এবং কখনো হামা দিয়ে, কখনো ছুঁড়ে ছুঁড়ে রাইফেল আর গুলির থলে সরবরাহ করতে থাকে।
মানিকের এলএমজি আর রাইফেলগুলো সচল হওয়ায় হানাদারেরা আর এগোতে পারেনি। কয়েকজন আহত হওয়ায় ওরা গুলি ছুঁড়তে ছুড়তে পলায়নপর হয়। জয়কলসের দুশমনেরা পালিয়ে যাবে আরশ আলী এটা বরদাশত করতে পারছিল না। ধর হারামজাদাদের- বলে ঝাঁপ দেয় খালে। সহযোদ্ধাদের ডাকে কান না দিয়ে সামনে ছুটতে থাকে।
গুলি করতে করতে একটা খোলা মাঠে পৌঁছাতেই হানাদারদের গুলি লাগে ওর বুকে। ওর সাহায্যে এগিয়ে আমাদের মধ্যে ভরারগাঁও এর ময়নার (পরে শিক্ষক) হাতেও গুলি লাগে। মুক্তিযোদ্ধারা আহতদের দিকে ঝুঁকে পড়ার অবকাশে হানাদারেরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
আরশ আলী ঘটনাস্থলেই শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করে। মানিক শহীদের লাশ আর আহমদ ময়নাকে নিয়ে ভাটিপাড়া ফিরে আসে। ওরা শহীদ আরশ আলীকে সমাহিত করে ভাটিপাড়া আর বারোঘরের মধ্যবর্তী গোরস্থানে।
মানিক ও তার সহযোদ্ধারা এর প্রতিশোধ নিয়েছিল। ওই মৌলবি মুক্তিযোদ্ধাদের দাওয়াতের খবর দিয়ে জয়কলস থেকে হানাদারদের ডেকে এনেছিল।