- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

‘প্রধানমন্ত্রীর টেকা না পাইলে ঘর বানানি অইলোনানে’

বিশেষ প্রতিনিধি ও ইয়াকুব শাহরিয়ার
শান্তিগঞ্জ উপজেলার পূর্বপাগলা ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা বাক্-প্রতিবন্ধী রোমন মিয়া। সন্তান-সন্ততিসহ ৬ জনের সংসার। জেলার জাউয়াবাজারে গাড়ি থেকে মালামাল উঠানো-নামানোর কাজ করেন তিনি। ভয়াবহ বন্যার সময় চাল সমান পানি ছিল তার বসতঘরের। কাঁচা ঘরটি এখন আর থাকার উপযোগী নয়। সম্প্রতি বসতঘর মেরামত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে দেওয়া ১০ হাজার টাকা পেয়ে যারপরনাই খুশি তিনি। ভাষায় প্রকাশ করতে না পারলেও টাকা পেয়ে সমস্ত শারীরিক ভাষা ব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছিলেন তিনি। খুশি তাঁর গৃহিণীও। স্ত্রী সাহেরা বেগম বললেন, ‘বোবা মানুষ হারাদিন কাম কইরা পরিবারের হকলের খাওন যোগাইন, বন্যার পরে ঘর দুয়ারে থাকার মতো আছিল না। প্রধানমন্ত্রীর টেকা পাইয়া ঘরখান ঠিক করবার লাগি বাঁশ-কাশ আনছি, ই-টেকা না পাইলে ঘর বানানি অইলোনানে।’ প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানালেন সাহেরা বেগম। দু’হাত তুলে প্রধানমন্ত্রীর জন্য দোয়া করলেন বাক্-প্রতিবন্ধী রোমন মিয়াও।
একই ইউনিয়নের দামোধরতপী গ্রামের বাসিন্দা রহিমুদ্দি। চাষবাসের সময় জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ আর অবসর সময়ে গুটিকয়েক হাঁস পালন করেন তিনি। এবারের বন্যায় তার ঘরের তো ক্ষতি হয়েছেই পাশাপাশি নানা রোগশোকে মারা গেছে পালিত হাঁসগুলো। তিনিও পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অনুদানের ১০ হাজার টাকা। অনুদানের এই টাকা পেয়ে বেজায় খুশি তিনিও। বললেন, আমি পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। কি করবো বুঝতে পারি নি। ওই সময় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ১০ হাজার টাকা হাতে পাই। টাকাগুলো পেয়ে, আরও কিছু টাকা ঋণ করে নিজের ছোট ঘর, গরুর ঘর, হাঁসের ঘর পুনঃনির্মাণ করেছি।
একই উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের দক্ষিণহাটির বাসিন্দা মৃদুল চক্রবর্তী। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। বন্যায় তার বসতঘর একেবারেই নষ্ট হয়ে যায়। পাশের গ্রামের এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রিত ছিলেন তিনি। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বাড়িতে আসবেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহারের ১০ হাজার টাকা পেয়ে নিজের ঘর মেরামত করেন তিনি।
তিনটি পরিবারের প্রধানমন্ত্রীর উপহার পাওয়ার ধারাবাহিক গল্প এটি। তবে সুনামগঞ্জে সরকারি হিসাবে ৪৫ হাজার ২৮৮ পরিবার বসতঘর হারিয়েছেন। এই পর্যন্ত ১০ হাজার ২৭২ পরিবার বসতঘর নির্মাণের অর্থ সহায়তা পেয়েছেন।
বন্যার্তদের জন্য প্রথম পর্যায়ে পাঠানো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পেয়েছেন সুনামগঞ্জ জেলার পাঁচ হাজার পরিবার। টাকার অঙ্কে যা পাঁচ কোটি টাকা। বন্যা পরবর্তীতে সরকার প্রধানের এমন মানবিক আর্থিক উপহার পেয়ে খুশি পরিবারগুলো।
ইতোমধ্যে যাঁরা অনুদান পেয়েছেন তাঁরা পুনঃনির্মাণ করেছেন তাঁদের বাঁশ-কাঠের ঘর। ঘরে কেউ লাগিয়েছেন টিন, কেউ কিনেছেন বাঁশ-কাঠ, কেউ কেউ ঠিকঠাক করেছেন গরুর গোয়াল, কেউ বা কিনেছেন সন্তান সমতুল্য গৃহপালিত গরুর খাদ্য (খড়)। অর্থাৎ টাকাগুলোর যথোপযুক্ত ব্যবহার করেছেন বন্যায় মরণপণ লড়াই করে ঠিকে থাকা নি¤œবিত্ত মানুষেরা।
মহাপ্লাবনে শ্বাসরুদ্ধকর সময় পার করার পর নিম্ন আয়ের বন্যার্ত এসব মানুষের কপালে ভাঁজ পড়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর নিদারুণ চিন্তায়। পানি কমার পর যখন প্রধানমন্ত্রী গৃহ নির্মাণের অর্থ দেবেন এই সংবাদ কানে কানে গ্রামে গ্রামে পৌঁছায় তখন কিছুটা আশায় বুক বাঁধেন অনেকে। টাকা পেয়ে খুশিতে উদ্বেলিত হন ‘হাতখালি’ মানুষের একটি অংশ। ‘সাঁতারে জিরিয়ে নেওয়ার’ মতো করে প্রচ- অস্বস্তিতেও যেনো একটু স্বস্তি পেয়েছিল সুবিধাভোগী পরিবারগুলো।
এই যাত্রায় (দ্বিতীয় দফায়) ঢেউটিন ও নগদ অর্থবিতণের কাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি উপজেলার অন্য ক্ষতিগ্রস্তরা এই অর্থ ও ঢেউটিন পাবেন। এর আগে যাঁরা ১০ হাজার করে নগদ অর্থ, ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ৫ হাজার টাকা পেয়েছেন কোনো ভাবেই তাঁরা পুনরায় দ্বিতীয় পর্যায়ের ঢেউটিন বা নগদ টাকা পাবেন না বলে জানিয়েছেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার ১২ টি উপজেলার পাঁচ হাজার পরিবার ইতোমধ্যে বুঝে পেয়েছেন ১০ হাজার করে টাকা। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বললেন, প্রথম পর্যায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুদান জেলার পাঁচ হাজার পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৪শ’ বান্ডিল ঢেউটিন ও নগদ ৭২ লাখ টাকা গৃহহারাদের প্রদান শুরু হয়েছে। প্রতি পরিবার দুই বান্ডিল ঢেউটিন ও নগদ ছয় হাজার টাকা করে পাবে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরাই অনুদান পাচ্ছেন। কোনোভাবেই আগে সুবিধাভোগীরা দ্বিতীয় পর্যায়ের ঢেউটিন বা নগদ টাকা পুনরায় পাবেন না।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখার তথ্য মতে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ৬২১, শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ৩১৩, দিরাই ৩১৩, জামালগঞ্জ ৪২৫, বিশ্বম্ভরপুর ৪১৬, তাহিরপুর ৫০৮, জগন্নাথপুর ৪৪০, দোয়ারাবাজার ৪৭৯, ধর্মপাশা ১১৪, মধ্যনগর ১৬৬, শাল্লা ৬৩০ এবং ছাতক ৫৭৫ টি পরিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া এ উপহার পেয়েছেন।
বন্যায় সুনামগঞ্জে সরকারি হিসাবে বসতঘর হারিয়েছেন ৪৫ হাজার ২৮৮ পরিবার। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন দাবি করেছেন, তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া অনুদানসহ এই পর্যন্ত ১০ হাজার ২৭২ পরিবারকে গৃহ নির্মাণের অর্থ সহায়তা দিয়েছেন। এরমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কল্যাণ তহবিল থেকে দেওয়া পাঁচ কোটি টাকা, বেসরকারি ব্যক্তি ও সংস্থার দেওয়া ৫৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ২৪ শ’ বা-িল ঢেউটিন এবং ৭২ লাখ টাকা এবং পরে আরও এক কোটি ৬৫ লাখ টাকা পেয়ে মোট ১০ হাজার ২৭২ পরিবারকে গৃহ নির্মাণের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে পাঁচ হাজার ৪০৮ পরিবারকে ১০ হাজার টাকা, তিন হাজার ৬৬৪ পরিবার পাঁচ হাজার টাকা এবং ১২শ পরিবার পাবে দুই বান্ডিল ঢেউটিন ও ছয় হাজার টাকা। তিনি জানালেন, বসতঘর হারানো ৪৫ হাজার ২৮৮ পরিবারই পর্যায়ক্রমে অর্থ সহায়তা পাবেন।

  • [১]