বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ-১ আসনের ২৩ ইউনিয়নের মনোনয়ন নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা নেতৃবৃন্দের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডের সামনেই জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান ও সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ, কথা কাটাকাটি, এমনকি একে অপরকে বিষোদগারও করেছেন। রবিবার দুপুরে আওয়ামী লীগের ধানম-ির (৩ নম্বরে) কার্যালয়ে এমন ঘটনা ঘটে। এসময় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও উপস্থিত ছিলেন।
দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক ইউনিয়নে দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্ত সাধন তালুকদার, বংশিকু-া উত্তর ইউনিয়নে আব্দুস সাত্তার, মধ্যনগর ইউনিয়নে প্রবীর বিজয় তালুকদার, সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নে ফরহাদ হোসেন ও চামরদানী ইউনিয়নে আলমগীর খসরুর দলীয় মনোনয়ন মেনে নিতে পারেন নি সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। তিনি এই বিষয়ে দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছেও অভিযোগ জানিয়েছেন। এই ইউনিয়নগুলোর মধ্যে ফেনারবাঁকে সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান দলীয় নেতা করুণা সিন্ধু তালুকদার, বংশিকু-া উত্তর ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান জামাল হোসেন, মধ্যনগরে দলীয় নেতা মোবারক হোসেন, সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নে ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মনিন্দ্র তালুকদার, চামরদানী ইউনিয়নে জাকিরুল আজাদ মান্নাকে দলীয় মনোনয়ন দেবার দাবি জানান।
রবিবার দুপুরে ধানম-ির ৩ নম্বরে মনোনয়ন বোর্ডের প্রভাবশালী সদস্য সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি এই অভিযোগের বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য শুনেন। এসময় কেন্দ্রীয় নেতা ওবায়দুল কাদেরের সামনেই জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান ও সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বাকবিত-ায় লিপ্ত হন। এক পর্যায়ে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন।
সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বাকবিত-ার এক পর্যায়ে মতিউর রহমানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘টাকা খেয়ে অনেক জামায়াত-বিএনপি ও রাজাকারকে মনোনয়ন দিয়েছেন, এর আগে সুনামগঞ্জের ২৬ ইউনিয়নের নির্বাচনী ফলাফল যা হয়েছে, আমার এলাকায়ও সেই ব্যবস্থা করে দিয়েছেন’। এই মন্তব্য শুনে ক্ষুব্ধ হয়ে জবাব দেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান। উত্তেজিত মতিউর এসময় সংসদ সদস্য রতনকে গালিগালাজও করেন। রাগতকণ্ঠে পাল্টাপাল্টি একে অপরকে কয়েক মিনিট বিষোদগার করেন। পাল্টাপাল্টি দু’জন দু’জনকে জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ, আত্মীয়-স্বজন জামায়াত রয়েছে এসব কথাও বলেন। সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনজীবী’র বাড়ি দিরাই, সেও আপনার (মতিউর রহমানের) আত্মীয় বলে মন্তব্য করেন।
দলের জ্যেষ্ঠ কেন্দ্রীয় নেতা মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের পরে এই দুইজনের উত্তপ্ত পরিস্থিতি সামাল দেন।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন বলেন, ‘বাকবিত-ার এক পর্যায়ে আমি সেখানে যাই, আমি বলেছি পার্লামেন্ট মেম্বারদের অবিতর্কিত ও পরিচ্ছন্ন রাখতেই দলীয় সভানেত্রী দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে তাঁদেরকে (সংসদ সদস্যদের) যুক্ত রাখেন নি, আপনি এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করলে ভাল হয়। রাজাকারকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, এমন কথা ঠিক নয় বলেছি, কারো নাম কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডে না গিয়ে থাকলে তৃণমূল থেকে হয়তো আসেনি, বলেছি আমি, পরে সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন রাজাকারকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে এমন কথা তিনি বলেননি বলে উল্লেখ করেন’।
সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন,‘আমি কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনেই টাকা খেয়ে মনোনয়ন দেবার কথা বলেছি এবং এর আগে একারণে সুনামগঞ্জের ২৬ ইউনিয়নের ১৯ টিতে দলের ভরাডুবি হবার কথাও উল্লেখ করেছি, যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষের আইনজীবী শিশির মনির আমাদের জেলা সভাপতির ভাগ্নে সেটিও আমি বলেছি’।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, ‘মধ্যনগরের চামরদানী ইউনিয়নে ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতা, মধ্যনগরের সাবেক সভাপতি প্রয়াত আব্দুল হেকিম তালুকদারের ছেলে আলমগীর খসরু ও আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান ফেনারবাঁকের সাধন তালুকদারকে সে (এমপি রতন) জামায়াত-বিএনপি, রাজাকার বলে মন্তব্য করায় এবং টাকা খেয়ে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বলে কটাক্ষ করায় আমি ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে জবাব দিয়েছি, আমি বলেছি আওয়ামী লীগ তুমি আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে না, আওয়ামী লীগ আমাদের হাতে গড়া, ১৯৬৭ সাল থেকে আওয়ামী লীগের সদস্য আমি, আমাকে তুমি আওয়ামী লীগ শেখাচ্ছ’।