ইকবাল কাগজী
আজ নববর্ষ। দেশজুড়ে উৎসব চলবে। উৎসব মানেই আনন্দ। কিন্তু সুনামগঞ্জে নববর্ষের উৎসব করা কতটা যুক্তি সঙ্গত সে নিয়ে কয়েকদিন আগে উদীচী একটি বিশেষ সভা ডেকেছিল। সেখানে নবীন-প্রবীণ সকলেই একমত হয়েছেন যে, সারা দেশে যাই হোক অন্তত সুনামগঞ্জে আনন্দঘন পরিবেশে নববর্ষ উদযাপন করা সঙ্গত হবে না। কারণ মাত্র এই কদিন আগে এখানকার প্রায় সবকটি হাওর অতিবৃষ্টি-পাহাড়ি ঢলের জলের তলে তলিয়ে গেছে। এখানে কৃষকদেরকে তথা সমগ্র সুনামগঞ্জকে দুর্গত অবস্থার মধ্যে রেখে সদরের বুকে আনন্দোৎসবে মেতে উঠার কোন মানে হতে পারে না, বরং তা হবে সর্বহারা কৃষকদের প্রতি এক নির্মম পরিহাসপ্রহরণের প্রক্ষেপণ। অতএব আলোচনা শেষে এই প্রস্তাব গৃহীত হলো যে, উদীচী নববর্ষের উৎসবকে আনন্দোৎসব নয়, যতটা সম্ভব প্রতিবাদী করে তুলে সর্বহারা-বিপন্ন কৃষকসম্প্রদায়ের সহমর্মী হয়ে উঠার প্রয়াস চালাবে। প্রতি বছরের মতো এবারেও হাওরের ফসলহানির জন্যে কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ দায়ী নয়, দায়ী হাওররক্ষাবাঁধ নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অবাধে করা লাগামহীন অনিয়ম-দুর্নীতি। অনিয়ম-দুর্নীতি হাওররক্ষাবাঁধ নির্মাণের কাজে এখানে প্রতি বছরই হয়ে থাকে। বলতে গেলে এটাই এখানকার অলিখিত নিয়ম। সর্বমহলে এই দুর্নীতির বিষয়টি একটি প্রতিকারহীন প্রকাশ্য গোপনীয়তার মতো একটি প্রপঞ্চ মাত্র। উদীচী মনে করে, এবারের নববর্ষের অনুষ্ঠান হতে হবে ফসলহারা কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর কার্যক্রমে সজ্জিত সাংস্কৃতিক প্রকাশ, ফসলহানির জন্যে দায়ী দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ঘৃণা জানানোর (থু থু নিক্ষেপ )
সাংস্কৃতিক চর্চা।
উদীচীর প্রসঙ্গটি বলা হলো। এবার বলি সমগ্র সমাজের প্রতিনিধিত্ব যাঁরা করেন তাঁদের কথা। গত ১০ এপ্রিল ২০১৭ (২৭ চৈত্র ১৪২৩) সোমবার, জাতীয় দৈনিক সমকালের একটি সংবাদশিরোনাম ছিল, ‘হাজারো কুষকের সর্বনাশে দায়ী অনিয়ম ও দুর্যোগ’। সংবাদপ্রতিবেদনের শুরুতেই আছে, ‘সুনামগঞ্জের সব কটি হাওরের ফসলডুবির ঘটনা। গতকাল রোববার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জেলার সব সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, জেলার বিভিন্ন পৌর মেয়র, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, গণমাধ্যমকর্মীসহ পাউবো কর্মকর্তা ও বিশিষ্টজন উপস্থিত ছিলেন। সভায় বক্তারা বলেন, জেলার কৃষকদের সর্বনাশে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ দ’ুটোই দায়ী। সভায় তোপের মুখে পড়েন পাউবো কর্মকর্তারা।’ অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘পাউবো ঠিকাদার ও পিআইসিদের গাফিলতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই দুইয়ে মিলেই প্রায় ২৫ লাখ কৃষক দুর্ভোগে পড়েছেন।’ সভায় বক্তারা পাউবো ও পিআইসির দুর্নীতির তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে বিলের টাকা উত্তোলন করতে না দেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে জেলাকে দুর্গত ঘোষণা করে ন্যায্যমূল্যে চাল বিক্রি শুরু করা, ফেয়ার প্রাইসের সংখ্যা বাড়ানো, প্রান্তিক চাষীদের কৃষিঋণ মওকুফ এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদানেরও জোর দাবি জানানো হয়। কিন্তু ঠিকাদারদের উত্তোলিত টাকা, যদি এর মধ্যে তাঁরা তোলে থাকেন, তবে সেই টাকার কী হবে সেটা সম্পর্কে প্রতিবেদনে কোনও উল্লেখ নেই।
উপরের বর্ণনায় সুনামগঞ্জের হাওরডুবির প্রসঙ্গে দু’টি সভার বিবরণ পাওয়া গেলো। সব বিষয়েই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সভা দু’টির মতামত প্রায় অভিন্ন, কেবল একটি বিষয়ে মতভিন্নতা আছে। উদীচী মনে করে ‘ফসলহানির জন্যে কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ দায়ী নয়।’ অন্যদিকে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষের সভা মনে করেন ‘পাউবোর ঠিকাদার ও পিআইসিদের গাফিলতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই দুইয়ে মিলেই প্রায় ২০ লাখ কৃষক দুর্ভোগে পড়েছেন।’ এখানে স্পষ্ট যে, একপক্ষ হাওরডুবির জন্যে কেবলমাত্র হাওরের বাঁধনির্মাণকাজে সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতিকেই দায়ী করেছেন, ফসলডুবির জন্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অর্থাৎ অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের ভূমিকাকে স্বীকার করছেন না। এই পক্ষ মনে করে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ হাওরডুবির নিয়ামক নয়। অন্যপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগকে হাওরডুবির নিয়ামক হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছেন।
মানুষকে শেষ অবধি সত্যসন্ধ হতেই হবে কিংবা হতেই হয়। সত্যকে না জেনে মানুষ নিজের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না। উন্নয়ন করতে পারে না মানে সভ্যতার বিকাশ ঘটাতে পারে না। অর্থাৎ নিজেকে সভ্য করে তুলতে পারে না। প্রতি বছর হাওর ডুবে যায়। কী কারণে ডুবে সেই সত্যটি আবিষ্কার করতে না পারলে হাওররক্ষার অনিশ্চয়তা কাটবে না কখনও। আর আমরা হাওরবাসীরাও প্রকৃতপ্রস্তাবে সভ্য হতে পারবো না। অসভ্যই থেকে যাবো, উন্নতি ঘটবে না। ১৯৪০ সালে আমেরিকার এক চিন্তক এমা গোল্ডম্যান বলেছিলেন, ‘বস্তুজগতে মানুষ যে মাত্রায় উন্নতি লাভ করেছে তার মাধ্যমে সে প্রকৃতিকে বশে এনেছে এবং তার জন্য উপযোগী করে তুলেছে। আদিম যুগে প্রথম আগুন আবিষ্কার করে অন্ধকারকে জয় করা, বাতাসকে বশীভূত করা কিংবা পানিকে নিয়ন্ত্রণে আনার মাধ্যমে প্রগতির পথে মানুষ ধাপে ধাপে এগিয়েছে।’ সুনামগঞ্জে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল (কেউ কেউ স্বার্থসিদ্ধির দুরভিসন্ধি থেকে বলেন ‘অকাল বন্যা’। এতে ঠিকাদারদের বাঁচিয়ে দেবার ভাষিক কৌশল নিহিত থাকে।) হাওর ডুবিয়ে দেয়। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংক্রান্ত সত্যটি মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই জানে। এই সত্যটি জেনে এখানকার মানুষ সেই প্রাচীনকালেই আবিষ্কার করেছে এই দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে হলে ‘হাওর রক্ষাবাঁধ’ দিতে হবে। পাউবো, পিআইসি, ঠিকাদার যখন ছিল না তখনও লোকে হাওররক্ষাবাঁধ নিজেরাই দিয়েছে। হাওরডুবি থেকে সুরক্ষিত হয়ে এমা গোল্ডম্যানের মতানুসারে হাওরাঞ্চলের কৃষক নিজেদেরকে সভ্য প্রমাণ করেছে। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, পাউবো-পিআইসি-ঠিকাদরের প্রচেষ্টায় হাওররক্ষাবাঁধ নির্মাণ করে হাওররক্ষা হচ্ছে না। কৃষকের সর্বনাশের বদলে প্রকারান্তরে কতিপয় দুর্নীতিবাজের শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে, আখেরে এই দুর্নীতিবাজরা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে। আর অন্যদিকে কৃষক কর্পদকশূন্য হয়ে মুক্তবাজার অর্থনীতির মুক্তবাজারে আক্ষরিক অর্থেই ভিক্ষুক হয়ে প্রকারান্তরে একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ অসভ্যে পর্যবশিত হচ্ছে। জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হচ্ছে, এবারের (আসলে প্রতিবারেরই) হাওরডুবির জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগই দায়ী। এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে যদি কেউ এই অনুসিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, প্রযুক্তিগত উন্নতির যুগে বসবাস করে হাওরডুবিকে সামান্য পাহাড়ি ঢলের হাত থেকে রক্ষা করতে না পেরে সুনামগঞ্জ নিজেকে নিজে অসভ্য বলে ঘোষণা দিয়েছে। তাহলে কি এই অনুসিদ্ধান্তকারী খুব বেশী একটা অতিকথনের দোষে দুষ্ট হয়ে পড়বে?
হাওরডুবির বিষয়ে বোধগম্যতার মাত্রা বাড়ানোর জন্য, বিশেষ করে খেয়াল করা দরকার যে, শনির হাওর এখনও পাহাড়ি ঢলের জলের তলে তলিয়ে যায়ানি। সেখানে কৃষকরা রাতদিন বাঁধ পুনর্নির্মাণের কাজ করে চলেছেন। এই একটি হাওর রক্ষা করে কৃষক প্রমাণ করেছেন তাঁরা অসভ্য হয়ে পড়েননি। বরং তাঁদেরকে অসভ্য করে দেওয়ার যে ষড়যন্ত্র পাউবো, পিআইসি ও ঠিকাদার করেছিলেন তাঁরা তা এখনও ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। শনির হাওরের এই উদাহরণটি সেই সত্যকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, যে-পাহাড়ি ঢলকে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে, তা আসলে দুর্যোগ নয়, স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা মাত্র। এ ঘটনা সুনামগঞ্জে প্রাচীনকাল থেকেই প্রতি বছর এমন সময়ে সংগঠিত হয়ে আসছে। প্রকৃতপ্রস্তাবে এবারের পাহাড়ি ঢলকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা হচ্ছে কোনও এক পক্ষের ব্যর্থতাকে ঢেকে রাখার জন্য। যে-ব্যর্থতার পেছনে আছে হাওররক্ষাবাঁধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি। অনিয়ম ও দুর্নীতি পরিহার করে পরিমিত উচ্চতা, পরিমিত প্রশস্ততা নিশ্চিত করে সময়মতো বাঁধ নির্মাণ করলে স্বাভাবিক পাহাড়ি ঢল ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারতো না। মনে রাখতে হবে, হাওররক্ষাবাঁধের বরাদ্দকৃত বড় অঙ্কের টাকা আত্মসাতের ষড়যন্ত্র করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই বিপর্যয়কে কৌশলে সৃষ্টি করা হয়েছে। অর্থাৎ কৃষকের জন্য বিপদকে ডেকে আনা হয়েছে মাত্র। আর মজার কথা হলো, স্বাভাবিক পাহাড়ি ঢল প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হলেই পাউবো, পিআইসি ও ঠিকাদারদের পোয়াবারো। তাঁদের সমৃদ্ধির ব্যাপক শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। এই কারণে স্বাভাবিক পাহাড়ি ঢলকে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’-এ পরিণত করার সকল প্রকার প্রয়াস চালাতে তাঁরা কখনও কার্পণ্য করেন না। এমনকি তাঁরা পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতির ধারক-বাহক হয়ে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষের সভাকেও প্রভাবিত করতে পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেন। সেখানেও লাগামহীন অনিয়ম দুর্নীতিকে প্রকারান্তরে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বলে চালিয়ে দেবার চালবাজিতে তাঁরা জিতে যান। সেখানে বরাবরের মতো কৃষকের প্রকৃত সুহৃদের অনুপস্থিতি থাকে।
পরিশেষে বলা যায়, সরকারপক্ষ থেকে যে-পদ্ধতি অনুসৃত হচ্ছে সে কর্মপদ্ধতিতে হাওররক্ষাবাঁধে রূপান্তরিত হয়ে পড়ে। সে কথা জানার পরও কেন আবার এই একই কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করা হয়। সে রহস্য অবোধহয় নয়। বারান্তরে সে কথা বলা যাবে, এমন নয়। কেবল বলি এর পেছনে দেশে প্রচলিত পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতির প্রকট প্রভাব বিরাজিত, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এই পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতির সুবিধাভোগীদের দ্বারা হাওররক্ষাবাঁধ নির্মাণ পদ্ধতি বজায় থাকলে প্রতিবছরই কোনও না কোনওভাবে পাহাড়ি ঢল তথাকথিত ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ হয়ে ওঠবেই, তার অন্যথা হবে না। সুতরাং সাধু সাবধান।