স্টাফ রিপোর্টার
নিশ্চিত মৃত্যু থেকে প্রাণপণ চেষ্টা করে নিজেকে বাঁচালেন বাবা। তবে প্রাণ ভিক্ষা চেয়েও খুনীদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারলেন না নিজের সন্তান সাকিবকে। পরদিন ছেলের মৃত মুখটি দেখার কষ্ট ভুলতে পারছে না অসহায় বাবা মুজিবুর। ছেলের মৃত্যু শোকে তিনি এখন নির্বাক হয়ে আছেন। কারো সঙ্গে কথা বলছেন না, মাঝে মধ্যে কেবল বিলাপ করছেন। গেল সোমবার (২৪ এপ্রিল) মাঝরাতে এমন মর্মস্পর্শি ঘটনা ঘটে তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের ঘাগটিয়া গ্রামে।
বৃহস্পতিবার বিকালে সীমান্ত পথে জাদুকাটা নদী পার হয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা ঘাগটিয়া গ্রামের মুজিবুর রহমানের বাড়ি যান। তখন বাড়ির উঠোনে অসংখ্য মানুষের ভিড়। কেউ সাকিবের বাবা মুজিবুর কে, কেউ মা তেরাপজন বেগমকে শান্তনা দিচ্ছেন। আত্মীয়-স্বজনকে ঘরের ভেতরে বসে কোরআন তেলাওয়াত করতেও দেখা যায়।
নিহতের বাবা মুজিবুর মিয়া জানালেন, রাত সাড়ে ১০টার দিকে আমার ছেলেকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায় মোশারফ মিয়ার লোকজন। আমরা কেউ জানতাম না। খবর পেয়ে গিয়ে দেখি আমার ছেলেকে তারা সবাই মিলে মারপিট করছে। এই অবস্থা দেখে তাদের কাছে ছেলের প্রাণ ভিক্ষা চাই। কিন্তু তারা উল্টো আমাকে মারপিট শুরু করে। একপর্যায়ে টিনের সীমানা বেড়া ভেঙে পালিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করি। পরে বাড়িতে এসে মানুষজন বলেছি, কেউ এগিয়ে আসেনি। তিনি বলেন, তারা প্রভাবশালী, অনেক টাকা তাদের, এজন্য আমার কথায় কারো মন গলেনি।
মুজিবুর বললেন, রাতে পুলিশ তাদের বাড়িতে গেলেও কাউকে আটক করেনি। এখন মামলা হওয়ার পরেও কাউকে গ্রেপ্তার করছে না। আসামীদের পালানোর সুযোগ দিচ্ছে তারা। উল্টো আমাকে চাপ দেয় আসামীরা কোথায় আছে, আমি জানলে তাদেরকে জানানোর জন্য।
নিহত সাকিবের মা তেরাপজন বেগম কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আমার পুলারে যারা খুন করছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই।
শোকাহত এলাকাবাসী এই ঘটনা মেনে নিতে না পারলেও গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি নয় তারা কেউই। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে মধ্যবয়সি এক ব্যবসায়ী বললেন, সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ঘাগটিয়া গ্রামের ধনাঢ্য ব্যক্তি মোশাররফের লোকজন মুজিবুর মিয়ার ছেলে সাকিব রহমানকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে যায়। পূর্ব শত্রুতার জেরে সেখানে সাকিবকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে ও নখ উপড়ে হত্যা করে। ছেলেকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে শুনে বাবা ছুটে যান মোশাররফের বাড়িতে। সেখানে গিয়ে দেখতে পান সবাই মিলে ছেলে সাকিব কে মারপিট করছে। ছেলেকে বাঁচাতে বাবা প্রাণ ভিক্ষা চাইলেও মন গলেনি খুনীদের। শেষে মুজিবুর রহমানকেও মারপিট শুরু করে তারা। একপর্যায়ে বাড়ির টিনের বেড়া (প্রাচীর) ভেঙে পালিয়ে রক্ষা পান বাবা। তবে ছেলের শেষ রক্ষা হয়নি। সারারাত নির্যাতন করে হাত-পা ভেঙে সাকিবকে হত্যা করা হয়।
ঐ ব্যবসায়ী জানালেন, তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি, দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের বড় শুল্কস্টেশন বড়ছড়া-চারাগাঁও ও বাগলীর আমদানীকারকদের সংগঠন তাহিরপুর কয়লা আমদানীকারক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন এলাকায় ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় সংসদ সদস্যেরও ঘনিষ্ট মানুষ হিসেবে পরিচিত মোশারফ হোসেনের উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে সখ্যতা রয়েছে।
মোশারফ হোসেনের গ্রাম ঘাগটিয়ার পাশ দিয়ে বহমান জাদুকাটা নদীর তীর কেটে বালু-পাথর উত্তোলনের সঙ্গে তার পরিবারের সম্পৃক্ততার বিষয়টি এলাকায় আলোচনায় রয়েছে। জাদুকাটায় আধিপত্য ধরে রাখতে এর আগে মোশারফ হোসেনের আত্মীয় স্বজন ও মুজিবুরের স্বজনদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। মোশারফের ভাই প্রয়াত ভাই মোবারক হোসেন আকাশ ২০১৬ সালে মুজিবুরকে মারপিট করে। পরে মুজিবুর দা দিয়ে আকাশের আঙ্গুলে কেটে দেয়। এর জের ধরে মোশারফের লোকজন মুজিবুরের আত্মীয় স্বজনের আটটি ঘরবাড়ি পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। এরপর কিছুদিন মুজিবুরের স্বজনরা গ্রাম ছাড়া ছিল। এ ঘটনার রেশ চলছে এখনো।
ঈদের সপ্তাহখানেক আগে মোশারফের ছোট ভাই মোশাহিদের উপর পানি ছিটায় মুজিবুরের ছেলে সাকিব। এই ঘটনাকে পেট্রাল ছিটানো হিসাবে প্রচার দেয় মোশারফ পক্ষ। এই ঘটনার জের ধরেই সোমবার গভীর রাতে মোশারফের লোকজন সাকিবকে বাড়ি থেকে খবর দিয়ে ডেকে নিয়ে এই ঘটনা ঘটায়।
নিহত সাকিবের মা তেরাপজন বেগম বললেন, আমার ছেলের চার হাত-পা ভেঙে মারপিট করে মেরেছে তারা। ফজর ওয়াক্তে পুলিশ এসে বলেছে, রোগীর কাছে যাওয়ার জন্য। পরে তার বাবা তাহিরপুর হাসপাতালে গেছে, সেখানে পাননি ছেলেকে। সুনামগঞ্জ হাসপাতালে গিয়েও পান নি। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে ছেলের লাশ পেয়েছে তার বাবা।
ঘাগটিয়ার নয়াপাড়ার বাসিন্দা বুরহান উদ্দিন বললেন, মোশাররফ হোসেন তালুকদার ২০১৬ সালে পেট্রোল দিয়ে সাকিবদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিলো। এ নিয়ে এলাকাবাসি কেউ মুখ খুলে নি। যারাই বলবে তাদেরকে হামলা, মারপিট করবে এই ভয়ে কেউ কথা বলে না। তাদের অনেক টাকা। সেই টাকার গরমে এলাকার মানুষের উপর নির্যাতন করে তারা। এছাড়া তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। তার ক্ষমতা বেশি।
তিনি বলেন, রমজান মাসের শেষ দিকে এর জের ধরে সাকিব পেট্রোল নিয়ে তাদের বাড়িতে গিয়েছিলো। পরে তার বাবা এই ঘটনার জন্য ক্ষমা চায় তাদের কাছে। তবুও সোমবার রাতে সাকিবকে ডেকে নিয়ে বাড়িতে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করেছে তারা।
এদিকে ঘটনার পরে মঙ্গলবার (২৫ এপ্রিল) রাতে তাহিরপুর থানায় ১০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন নিহত সাকিবের বাবা মজিবুর রহমান।
মামলায় আসামিরা হলেন- উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ঘাগটিয়া গ্রামের সাদেক আলীর ছেলে মোশারফ হোসেন তালুকদার (৫৮), মহিনুর তালুকদার (৫৩), মোশাহিদ তালুকদার (৫৫), একই গ্রামের মহিনুর তালুকদারের ছেলে রফি তালুকদার (২৯), মোশারফ তালুকদারের ছেলে মোনায়েম হোসেন তালুকদার রাজু (৩৪), মৃত মকবুল হোসেনের ছেলে নুরুজ আলী (৫০), নরুজ আলীর ছেলে কাহার (২৬), বাহার (২২), ছামাদ তালুকদারের ছেলে পটল তালুকদার (৩২), রাজা মিয়ার ছেলে সামছু মিয়া (৫৮)। এছাড়া আরও ৩-৪ জনকে এ মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
মোশারফ হোসেন তালুকদারের ঘাগটিয়ার বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায় নি। বাড়ির প্রধান ফটকে তালা ঝুলানো রয়েছে। মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। এজন্য তাদের কারো বক্তব্য পাওয়া যায় নি।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবুল হোসেন খান বললেন, মোশারফ হোসেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও নিরীহ ভদ্রলোক হিসাবেই পরিচিত। তার বাড়ির পাশে খুন হয়েছে বলে সেই খুন করেছে এটি এখনো প্রমাণ হয়নি। তার বিরুদ্ধে খুনের মামলা হয়েছে। তদন্তে এর সত্যতা মিললে তার বিরুদ্ধে দলের পক্ষ থেকেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ এহ্সান শাহ্ বললেন, ছেলেটিকে বাড়ি ডেকে নিয়ে চিৎকার করে পরিবেশ তৈরি করে ওকে মারপিট করা হয়। ছেলের বাবা মুজিবুর খবর পেয়ে গিয়ে ওই বাড়ি ঢুকতে পারেন নি। পরে তাকেও মারপিট করা হয়। রাত দেড়টায় খবর পেয়ে পুলিশ ওখানে গিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় ছেলেটিকে সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। ওখানেই তার মৃত্যু ঘটে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে।
ঘটনার তিন দিন পরেও আসামী গ্রেপ্তার না হওয়ায় নিহতের পরিবারের সদস্যরা পুলিশের উপর অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন। এমন কথার জবাবে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসামী ধরার চেষ্টা করছে বলে জানান পুলিশ সুপার।