- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

প্লাস্টিক চাঁই দিয়ে টাঙ্গুয়া হাওরে চলছে মাছ ধরার মহোৎসব

আমিনুল ইসলাম, তাহিরপুর
দেশের অন্যতম রামসার সাইট সর্ববৃহৎ জলাভূমি টাঙ্গুয়া হাওরের সর্বত্র প্লাস্টিক চাঁই (মাছ ধরার বিশেষ যন্ত্র) দিয়ে চলছে অবাধে মাছ ধরার মহোৎসব। মৎস্য আহরণকারীরা বোঝাই ভর্তি প্লাস্টিক চাঁই দিয়ে হাওরে অবাধে মাছ শিকার করছে।
তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়া হাওরে প্লাস্টিকের চাঁইয়ের অবাধ ব্যবহারে হুমকিতে পড়েছে দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট টাঙ্গুয়া হাওরের মৎস্য, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। গত দশ বছর ধরে টাঙ্গুয়া হাওরসহ উপজেলার ছোট—বড় সবক’টি হাওরে চিংড়ি মাছ ধরার জন্য ব্যবহৃত প্লাস্টিকের চাঁইয়ের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। ফলে চরম হুমকির মুখে রয়েছে টাঙ্গুয়া হাওরসহ সবকটি হাওর। এছাড়াও মানবসৃষ্ট বিভিন্ন দূষণেও হুমকির মুখে পড়েছে এই হাওরটি।
তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়া হাওর, শনির হাওর, মহালিয়া হাওর, মাটিয়ান হাওর, বনুয়ার হাওর, সমসার হাওর, এরালিয়া কোনা হাওর ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার পাঠাবুকা, সুলেমানপুর, লামাগাঁও, মানিকখিলা, রামসিংহপুর, জয়পুর গোলাবাড়ি, মন্দিয়াতা, ইন্দ্রপুর, বিনোদপুর, পানিয়াখালী, তেরঘর, কলাগাঁও, নবাবপুর, জামালপুর, শিবরামপুর, বেতাগড়া ও মধ্যনগর উপজেলার রুপনগর, বাকাতলা, ইছামারী, রাজেন্দ্রপুর, রংচি, আমানিপুর, নিশ্চিন্তপুর, বংশীকুন্ডা, সানুয়া, কাউহানী, খিদিরপুর, হাতপাটন গ্রামের জেলেরা মাছ শিকারে প্লাস্টিকের চাঁই ব্যবহার করছেন।
এই চাঁই দিয়ে হাওরজুড়ে এবং শুকনো মৌসুমে হাওরের বিল, নদী—নালায় পানির নিচে সারিবদ্ধভাবে সুতা দিয়ে বেঁধে ময়দার টোপ অথবা শামুক দিয়ে প্লস্টিকের চাঁই রেখে দেওয়া হয়। সকালে এসব চাঁই তুলে এর ভিতর থেকে চিংড়ি ও ছোট মাছ বের করে সেগুলো আবারও রেখে দেওয়া হয়। এক সময় চাঁই গুলো নষ্ট হয়ে গেলে জেলেরা একেই ভাবে পানিতে ফেলে দেন। এজন্য হাওরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্লাস্টিকের চাঁই।
টাংগুয়ার হাওরপাড়ের গোলাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা খসরুল আলম বলেন, চাঁইগুলো প্লাস্টিকের হওয়ায় এগুলো অপচনশীল। এসব চাঁই মাছ ধরার জন্য অবাধে ব্যবহারের পর জেলেরা হাওরেই যত্রতত্র ফেলে দেন। এগুলো হাওরের জলচর প্রাণীসহ মাছের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লামাগাঁও গ্রামের কয়েস মিয়া বলেন, চিংড়ি মাছ ধরার চাঁইগুলো দেখতে গোলাকার। এছাড়াও ২ লিটার সয়াবিন তেলের বোতল দিয়েও বিশেষভাবে তৈরী করা হয় এই চাঁই। প্লাস্টিক মুড়িয়ে বাঁশের কঞ্চি ও তার দিয়ে তৈরি করা হয় গোলাকারকৃত চাঁই। ১০/১২ বছর পূর্বে শুধুমাত্র বাঁশের তৈরি চাঁই দিয়েই চিংড়ি মাছ ধরা হতো। এরপর থেকে কম খরচে তৈরি করা এসব প্লাস্টিকের চাঁই স্থানীয়দের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। খুব সহজে বেশি পরিমাণ চিংড়ি ও ছোট মাছ শিকার করায় এই চাঁইয়ের ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
রাজধানী ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাব্বিরুল ইসলাম বলেন, প্লাস্টিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। প্লাস্টিক ব্যবহারের পর যদি হাওরে যত্রতত্র ফেলে রাখে তাহলে হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়বে। প্লাস্টিক অপচনশীল আর এসব প্লাস্টিক দিয়ে মাছ ধরার চাঁই পানির নিচে ও জলাশয়ে ফেলে রাখা মাছসহ জলচর বিভিন্ন প্রাণীর জন্য চরম ক্ষতিকর।
সিলেটস্থ পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, প্লাস্টিকের চাঁইয়ের ব্যবহার রোধ করতে না পারলে টাঙ্গুয়া হাওরসহ অন্যান্য হাওরগুলোর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য আরও হুমকির মুখে পড়বে। এগুলো ব্যবহার রোধে হাওরবাসীকে সচেতনতা বৃদ্ধি ও আইনের সঠিক ব্যবহার করা জরুরী।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রায়হান কবির বলেন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য এবং মৎস্য সম্পদ রক্ষায় দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাওরে যারা প্লাস্টিক চাঁই দিয়ে মাছ ধরার সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

  • [১]