ধর্মপাশা প্রতিনিধি
নূর মিয়া নামের এক ব্যক্তি হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত কাজের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভাপতি। তবে তিনি কত নম্বর প্রকল্পের সভাপতি তাও স্পষ্ট করে বলতে পারেন না। তিনি শুধু রোজ ৫০০ টাকার বিনিময়ে বাঁধে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। একই প্রকল্পের সদস্য সচিব রইছ মিয়া প্রকল্পের বরাদ্দকৃত টাকা কোন ব্যাংক থেকে উত্তোলন করতে হয় তাও বলতে পারেন না। তিনি শুধু চেকে সই করেন। টাকা উত্তোলন করে অন্য কেউ। আর নীতিমালা অনুযায়ী তাদের কমিটিতে আরও ৩ জন সদস্য থাকার কথা। কিন্তু সভাপতি ও সদস্য সচিব জানালেন তাদের কমিটি দুই সদস্য বিশিষ্ট। তাদের আর কোনো সদস্য নেই। এমন অসঙ্গতি রয়েছে ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার গুরমার হাওরের বর্ধিতাংশের ১২৫ নম্বর প্রকল্পে। শুধু তাই নয় এ প্রকল্পের পার্শ্ববতীর্ ১২৬ নম্বর প্রকল্পের সদস্য সচিব দীপক চন্দ্র সরকারও বাঁধে শ্রমিক হিসেবে রোজ ৫০০ টাকার বিনিময়ে কাজ করেন। আর ১২৭ নম্বর প্রকল্পের সভাপতি খেলন চন্দ্র সরকার শুধুমাত্র ব্যাংক থেকে বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করতে গেলে যাতায়াত খরচ বাবদ কিছু টাকা পান আর হোটেলে তাকে খাওয়ানো হয় পেট ভরে। এভাবেই স্থানীয় লোকদের ব্যবহার করে ১২৫, ১২৬ ও ১২৭ নম্বর প্রকল্পের কাজ হাতিয়ে নিয়েছেন সাইফুল ইসলাম নামের এক মধ্যস্বত্বভোগী। সাইফুল ধর্মপাশা সদর ইউনিয়নের লংকাপাথারিয়া গ্রামের বাসিন্দা সেন্টু মিয়ার ছেলে।
মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর গ্রামে আব্দুল কুদ্দুসের মেয়েকে বিয়ে করেছেন সাইফুল। সেই সুবাদে সাইফুল প্রায়ই শশুর বাড়িতে যাতায়াত করেন। সাইফুলের শশুর জানিয়েছেন, সাইফুল এসব প্রকল্পগুলো পাইয়ে দিয়েছেন। ১২৬ নম্বর প্রকল্পের সভাপতি হিসেবে সাইফুলের শশুর আব্দুল কুদ্দুস ও ১২৫ নম্বর প্রকল্পে আব্দুল কুদ্দুসের ছোট ভাই রইছ মিয়াকে সদস্য সচিবসহ নিজেদের লোকজন দিয়ে কমিটি গঠন করা হয়। তবে প্রত্যেক কমিটিই ২ সদস্য বিশিষ্ট। ১২৫ নম্বর প্রকল্পে ১ কিলোমিটার কাজের জন্য ১৮ লাখ ৭১ হাজার টাকা, ১২৬ নম্বর প্রকল্পে ০.৫১ কিলোমিটার কাজের জন্য ১৭ লাখ ৪০ হাজার ৪২১ টাকা ও ১২৭ নম্বর প্রকল্পের কাজের জন্য ১৮ লাখ ৬ হাজার ১০৫ টাকাসহ ৫৪ লাখ ১৮ হাজার ৪৮৮ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সাইফুল তিনটি প্রকল্পের সভাপতি ও সদস্য সচিবকে দিয়ে বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করে নিজেই প্রতিটি বাঁধে নিম্নমানের কাজ করেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়রা কথা বললে হুমকি ধামকিও দিয়েছেন সাইফুল। গত ২ এপ্রিল তাহিরপুরের নজরখালি বাঁধ ভেঙে গেলে ওইসব প্রকল্পের বাঁধে ফাটল দেখা দেয়। শনিবার সকালে ১২৬ নম্বর প্রকল্পে বিশাল ফাটল দেখা দেয়। এ সময় সাইফুল বাঁধের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করলে উত্তেজিত কৃষকদের দেখে তিনি ফিরে যান।
শালদিঘা হাওরের কৃষক ও স্থানীয় স্কুল শিক্ষক মহেন্দ্র চন্দ্র সরকার বলেন, ‘শালদিঘা হাওরে আমার ৮০ বিঘা জমি রয়েছে। তাই প্রতি বছরই বাঁধের কাজ তদারকি করি। কিন্তু এইবার কাজ শুরু হলে সাইফুলকে বলেছিলাম কাজ ভালো হচ্ছে না। তখন সাইফুল আমাকে বলেছিল— যতো বড় মুখ নয় ততো বড় কথা। আপনাকে বলে কাজ করতে হবে?’
১২৫ নম্বর প্রকল্পের সভাপতি নূর মিয়া বলেন, ‘আমি দৈনিক ৫০০ টাকার বিনিময়ে বাঁধে কাজ করি।’ একইভাবে বাঁধে কাজ করেন, ১২৬ নম্বর প্রকল্পের সদস্য সচীব দীপক চন্দ্র সরকার। তিনি বলেন, ‘তারা (সাইফুল) বলে কাজ ঠিকঠাক মতো হলে আমাকে খুশি (টাকা দেওয়া হবে) করা হবে।’ আর এ প্রকল্পের সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমার জামাই সাইফুল এ কাজ এনে দিয়েছে। সেই—ই কাজ দেখাশোনা করে। সে শিক্ষিত মানুষ। হিসেবটা সহজে রাখতে পারে।’
১২৭ নম্বর প্রকল্পের সভাপতি খেলন চন্দ্র সরকার বলেন, ‘আমি একজন কাঠ মিস্ত্রি। ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন আমরাই করি। কিন্তু টাকা নিয়ে যায় সাইফুল ও কুদ্দুস। বিগত দিনেও এ বাঁধের কাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। কিন্তু কোনো সুযোগ পাইনি। তাই এবার কাজে যুক্ত হয়েছি। এবার সুযোগ বলতে ধর্মপাশায় টাকা উত্তোলন করতে গেলে যাতায়াত খরচ দেয় আর হোটেলে ভাত খাওয়ায়।’
সাইফুল ইসলামকে সংশ্লিষ্ট বাঁধে পাওয়া যায়নি। এমনকি তার মুঠোফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য জানা যায়নি। তবে তার ছোট ভাই মঞ্জুরুল হক সুজন বলেন, ‘সাইফুল ভাই সকালে শশুর বাড়িতে গিয়েছে। এখন কোথায় আছে বলতে পারছি না। আর প্রকল্পগুলো আমাদের নয়।’ তবে সুজন গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ওইসব বাঁধে গিয়ে প্রকল্পগুলো নিজের দাবি করে ফেসবুকে ছবি পোষ্ট করেন। (স্ক্রিনশট সংরক্ষিত)
বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউপি চেয়ারম্যান রাসেল আহমদ বলেন, ‘হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ রক্ষায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সদয় দৃষ্টি রয়েছে। অথচ দেখা যাচ্ছে বাঁধের কাজ কিছু মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হচ্ছে। কমিটি গঠনে অনিয়ম হচ্ছে। যার ফলে বাঁধের কাজ নিম্নমানের হচ্ছে। ফলে বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাচ্ছে।’
ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার দায়িত্বে থাকা সুনামগঞ্জ পাউবোর উপ—সহকারী প্রকৌশলী ইমরান হোসেন বলেন, ‘দুই সদস্য বিশিষ্ট কমিটি হওয়ার কথা নয়। অবশ্যই ৫ সদস্য বা ৭ সদস্য বিশিষ্ট হয়। হয়তো অন্য সদস্যদের সাথে তাদের (সভাপতি ও সদস্য সচিব) সম্পর্ক ভালো নয়। তাই তারা আসছে না। অন্য কেউ কাজ করছে বললে বলা যায়, এক্সকেভেটর দিয়েতো অন্য কেউ—ই কাজ করে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনতাসির হাসান বলেন, ‘১২৬ নম্বর প্রকল্পের বাঁধের ফাটল প্রতিরোধে ইতোমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’