- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ফসলের ক্ষয়ক্ষতি বিষয়ে কৃষি বিভাগের তথ্য অগ্রহণযোগ্য

জেলার ফসল হানি বিষয়ে ২৭ এপ্রিল দুপুর পর্যন্ত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে যে তথ্য দেয়া হয়েছে তাকে নিতান্তই হাস্যকর উল্লেখ করেছেন কৃষি বিষয়ে অভিজ্ঞ ও জনপ্রতিনিধিরা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণের উপ পরিচালকের নামে তৈরি হওয়া ক্ষয়-ক্ষতির এই তালিকা থেকে দেখা যায়, জেলায় এবার ২ লাখ ২০ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ফসল চাষ করা হয়। এই আবাদকৃত জমির মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বাঁধ ভেঙে ক্ষতির পরিমাণ দেখানো হয়েছে মাত্র ৩৩২১৯ হেক্টর জমি। অর্থাৎ ক্ষতির পরিমাণ আবাদকৃত জমির মাত্র ১৫%। ক্ষয়-ক্ষতির প্রকৃত তথ্য উদঘাটনে ব্যাপক অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে সত্য কিন্তু চোখের আন্দাজ বলতেও একটা কথা আছে। জেলাবাসী নিজের চোখে প্রতিদিন যেসব হাওর ডুবে ফসল হানির দৃশ্য দেখছেন তাদের কাছে কৃষি বিভাগের দেওয়া এই পরিসংখ্যানকে জেলার ভাগ্যবিড়ম্বিত কৃষকদের প্রতি প্রশাসনিক পরিহাসরূপেই বিবেচিত হচ্ছে। তাহিরপুরে ৬৭৬৫ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত বলে দেখানো হয়েছে। অথচ ডুবে যাওয়া এক শনির হাওরেই জমির পরিমাণ এর চাইতে ঢের বেশি। বৈশাখের প্রথম সপ্তাহে সাধারণত এখনকার উফশী জাতের ধান পাকা শুরু হয় না। এবার হাওরগুলোতে ধান পাকার আগেই দুর্যোগ শুরু হয়। এরকম প্রেক্ষাপটে কৃষকরা পানিঝুঁকির মধ্যে থাকা হাওরগুলোর আধাপাকা ও কাঁচা ধান কিছু কাটার প্রয়াস নিয়েছিলেন বটে কিন্তু এর মধ্য দিয়ে ডুবন্ত হাওরের কোথাও শতকরা ১০ ভাগ ধান কাটা সম্ভব হয়নি। অথচ দিরাই উপজেলার পানিতে ডুবে যাওয়া হাওরগুলোর ক্ষতির পরিমাণ দেখানো হয়েছে মাত্র ৩০.৭৮%। অর্থাৎ কৃষি বিভাগের তথ্য মোতাবেক  দিরাই উপজেলায় ডুবে যাওয়া চাপাতি, বরাম, কালিকুটা ইত্যাদি হাওরের ৬৯.২২% ধান কাটা শেষ হয়ে গেছে । এই তথ্য কি বিশ্বাসযোগ্য? বিশ্বম্ভরপুরে একদিকে করচা, শনি, আঙ্গারুলি ও হালির হাওরকে ক্ষতিগ্রস্ত উল্লেখ করা হয়েছে অথচ অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ দেখানো হয়েছে মাত্র ২৩০০ হেক্টর। অর্থাৎ কৃষি বিভাগ বলছে,  বিশ্বম্ভরপুরের ৭৯% ফসল ঝুকিমুক্ত। একইভাবে বৃহত্তর দেখার হাওর, জাওয়া ও কানলার হাওর ডুবে গেলেও সদর উপজেলায় ১৫৭০০ হেক্টর জমির মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১৭২৫ হেক্টর। অর্থাৎ সদর উপজেলায় ফসল হানির শতকরা হার মাত্র ১১%। পুরো জেলার হিসাবেই এরকম নানা অসঙ্গতি, বিভ্রান্তি লক্ষণীয়। কৃষি বিভাগের এমন লুকোচুরির কারণ কী? কী তাদের লাভ? তারা কি নিজেদের একই সাথে পাউবোকে বাঁচাতে চাইছে? এমন নানা প্রশ্ন আজ জেলাবাসীর মনে। এইসব প্রশ্নের অবসান ঘটা উচিত দ্রুতই।  
পরিসংখ্যান নিয়ে নানা রসিকতা প্রচলিত আছে। সুনামগঞ্জ কৃষি বিভাগ বোধ করি কৃষকদের সাথে নির্মম রসিকতা করলেন। এতে আমরা দারুণভাবে দুঃখিত, স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ। জেলার ব্যাপক বিস্তৃত ফসলহানির বিষয়ে এমন অদায়িত্বশীল আচরণ আমাদেরকে সত্যিকার অর্থেই ব্যথিত করেছে। যে কৃষকরা ফসল হারিয়ে বিপন্ন হয়েছেন স্বভাবতই তারা বেঁচে থাকার জন্য সরকারি সহায়তা ও পুনর্বাসন কর্মসূচির মুখাপেক্ষী থাকবেন। এখন কৃষি বিভাগের ১৫% ফসল হানির তথ্য, যে পরিমাণ ক্ষতি প্রতি বছর এমনিতেই স্বাভাবিকভাবে হয়ে থাকে, বিবেচনায় নিয়ে সরকার যখন মুখ ফিরিয়ে থাকবেন তখন কৃষি বিভাগের কোন কর্মকর্তা কৃষককূলকে রক্ষায় এগিয়ে আসবেন? বাস্তবতা বিবর্জিত তথ্য দেয়ার জন্য কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমরা জেলার বোরো ফসল হানির প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য শক্তিশালী কমিটি গঠন করে দ্রুত হিসাব চূড়ান্ত করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতি আহ্বান জানাই।   

  • [১]