বোরো চাষাবাদের সময় সমাগত প্রায়। ইতোমধ্যে কৃষকরা বীজতলা প্রস্তুতের কাজ শুরু করে দিয়েছেন। হাওরের পানি ধীরে নামছে। পানি নামা মাত্র চারা রোপণের কাজ শুরু হবে। চারা রোপণের পর কৃষকরা চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে অপেক্ষায় থাকবেন সোনালি ফসল ঘরে তোলার। বোরো চাষাবাদ হাওরের অর্থনীতির প্রধান খাত। ধানের দাম আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাওয়ায় গত দুই বছর ধরে বোরো চাষিদের লোকসান হচ্ছে, যদিও এসময়ে বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। ধানের দর পতনের কারণে এবার বোরো চাষাবাদে কৃষকদের আগ্রহ কমেছে। রঙজমা বা বর্গা দেয়ার জন্য জমির মালিকরা লোক পাচ্ছেন না। যাও পাচ্ছেন তাও অত্যধিক কম টাকায়। ধানের দর পতনের জন্য এমন অবস্থা। বোরো চাষের প্রতি আগ্রহ হারলে হাওরের অর্থনীতি তথা জাতীয় অর্থনীতির বড় সর্বনাশ ঘটে যাবে। তাই কৃষকগণকে ধানের উপযুক্ত মূল্য পাইয়ে দিতে সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। চলতি আমন মৌসুমে সরকারিভাবে কেবল ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় মানে কৃষকদের ভাগ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষকদের নিকট থেকে বেশি পরিমাণ ধান ক্রয়ের নীতিমালাও জারি হয়েছে। প্রকৃত কৃষকদের তালিকা হালনাগাদ করার কাজ শুরু হয়েছে। কৃষকদের ডাটাবেজ তৈরি হবে। অনুমিত হয় সরকারের এই নীতিমালা সামনের বোরো মৌসুমেও অব্যাহত থাকবে। এসব নীতিমালা চালু থাকলে সামনের বোরো কাটা-মারার পর কৃষকরা ধানের উপযুক্ত মূল্য পাবেন বলে সকলেই আশাবাদী। অন্যদিকে ফসলকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে রক্ষা করতে সরকার গত দুই বছরের ন্যায় এবারও ফসল রক্ষা বাঁধ সংস্কার ও মেরামতের জন্য পিআইসি ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছেন। লুটেরা প্রকৃতির ঠিকাদারি ব্যবস্থাকে বিদায় জানানোর পর হাওরের বাঁধ নিয়ে অভিযোগ ও দুর্নীতি দৃশ্যমানভাবে কমে এসেছে। এখনও এখানে যেসব দুর্বলতা রয়েছে সেগুলো একটু উদ্যোগ নিলেই দূর করা সম্ভব বলে হাওরবাসী মনে করেন।
হাওরের কোন বাঁধ কী পরিমাণে সংস্কার, মেরামত, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা দরকার সে বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রাক জরিপ কাজ শুরু করেছে। হাওরের পানি একেবারে কমে গেলে চূড়ান্ত প্রাক্কলন তৈরি করা হবে। হাওরবাসী দাবি করছেন বাঁধের প্রয়োজনীয়তা ও পরিমাণগত বিষয়াদি নির্ধারণে সরাসরি কৃষকদের সম্পৃক্তকরণের। এছাড়া বাঁধের জন্য যে পিআইসি গঠন করা হবে সেখানেও কৃষকদের সরাসরি মতামত প্রদানের ব্যবস্থা এবং কৃষকদের মধ্য থেকেই পিআইসি গঠনের দাবি উঠেছে। কৃষকদের এইসব দাবি খুবই যৌক্তিক ও কৃষিবান্ধব। সরকারের উচিৎ এই দাবিগুলো আমলে নেয়া। ঠিকাদারি প্রথার বিলুপ্তির পর পিআইসিতে ক্ষমতাসীন দল ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এক ধরনের আধিপত্য লক্ষ করা গেছে। কৃষকরা এই আধিপত্যূ দূর করার দাবি তুলেছেন। বাঁধের কাজে সরাসরি কৃষকদের অন্তর্ভূক্ত করা গেলে আখেরে কৃষি ও কৃষকেরই লাভ হবে। এই জায়গায় ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে যাতে প্রশাসন যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে। প্রধানমন্ত্রী সকল কাজে স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিমুক্ত অবস্থা দেখতে চান। প্রধানমন্ত্র্রীর এই মনোভাবকে মূল্য দিতে হবে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে। পক্ষান্তরে প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্তরাও যাতে কোনো অনিয়ম না করতে পারেন সেটিও নিশ্চিত করতে হবে তাদেরই। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় এ হলো ভারসাম্য বজায় রাখার ব্যবস্থা। এখন তেলে-জলে মিলে গিয়ে এক বোতলে আশ্রয় নিলে সমস্যা হবেই।
আমরা আশা করব এবারের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ অতীতের যেকোনো সময়ের চাইতে আরও ভাল, সুন্দর ও কৃষকবান্ধব হবে।