- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যাঁরা জীবনের জয়গান

হোসেন তওফিক চৌধুরী
বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। দুর্গম গিরি-কান্তার মরু অতিক্রম করে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত এবং দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ এক সাগর রক্ত দিয়েই স্বাধীনতা অর্জন করে বিশ^সভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। স্বাধীনতার বেদীমূলে রক্তদান স্বার্থক হয়েছে। ব্যর্থ হয়নি।
পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী নিশ্চিত পরাজয়ের আগে বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার এক হীন পরিকল্পনা ও চক্রান্ত গ্রহণ করে। পাকিস্তানী বাহিনীর দোসর ‘আল-বদর’, ‘আল-শামস’ কে দিয়ে এ হীন পরিকল্পনা কার্যকরী করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনায় এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও জাতীয়তাবোধে উদ্ধুদ্ধ ব্যক্তিদের এক তালিকা প্রণয়ন করে এবং তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই পরিকল্পনায় কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশার বুদ্ধিজীবীদের তালিকা করা হয়। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ১১ তারিখ থেকেই তাদেরকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে আসে ‘আল-বদর’, ‘আল-শামস’। এদেরকে ঢাকার রায়েরবাজার বৈধ্যভূমিতে নিয়ে নির্মম ও নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়। এই বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আমার প্রিয় তিনজন শিক্ষক রয়েছেন। এরা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইতিহাস (সাধারন) বিভাগের অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য্য, আবুল খয়ের এবং গিয়াস উদ্দিন আহমদ। এরা তিনজনই আমার প্রত্যক্ষ শিক্ষক। আমি ১৯৬৬-৬৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইতিহাস (সাধারন) বিভাগের ছাত্র ছিলাম। সন্তোষ বাবু পড়াতেন মধ্যযুগের ইতিহাস, আবুল খয়ের-আমেরিকার ইতিহাস, গিয়াস উদ্দিন আহমদ পড়াতেন বাংলার ইতিহাস। এরা তিনজনই কৃতী অধ্যাপক ছিলেন। তাঁদের শিক্ষাদান পদ্ধতি ও কলাকৌশলের মধ্যে স্বাতন্ত্রবোধ ছিল। পাকিস্তানী বাহিনীর তালিকা অনুযায়ী এই তিনজনকেও রাতের আঁধারে তাঁদের বাসা থেকে তুলে নেয়া হয় এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁদের লাশ পাওয়া যায় রায়ের বাজার বৈধ্যভূমিতে। তাঁদের একমাত্র অপরাধ ছিল তাঁরা বাঙালি জাতির স্বাধীনতা চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হোক মনে প্রাণে কামনা করতেন। তাঁরা স্বাধীন বাংলাদেশের সূর্যোদয় দেখে যেতে পারেননি সত্য কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবেই এ দৃঢ় প্রত্যয় বোধ নিয়েই হাসি মুখে স্বাধীনতার বেদীমূলে শহীদ হয়েছেন। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ঊষালগ্নে এভাবে অগনিত বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়। উদ্দেশ্য একটাই বাংলাদেশ যেনো প্রতিভা ও মেধাশূন্যতা লাভ করে। ডা. মুনির চৌধুরী, মোয়াজ্জল হায়দার চৌধুরী, সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হোসেন, আ ন ম গোলাম মোস্তফা প্রমুখ এভাবেই স্বাধীনতার বেদীমূলে শহীদ হয়েছেন। এসব বুদ্ধিজীবীদের ত্যাগ ও তিতিক্ষা আমাদের ইতিহাসে চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে। যুগ যুগ ধরে তাঁরা স্মরণীয়-বরণীয় হয়ে জাতির শ্রদ্ধা ভালোবাসা লাভ করবেন। তাঁদেরকে আজ বিন¤্র শ্রদ্ধা জানাই।
‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী
ভয় নাই ওরে ভয় নাই
নিঃশেষে প্রাণ, যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই…।’
লেখক : সিনিয়র আইনজীবী-কলামিষ্ট

  • [১]