স্টাফ রিপোর্টার
তাহিরপুরের উত্তর বড়দল ইউনিয়নের পুরানঘাট গ্রামের বাসিন্দা মো. মানিক মিয়া। তার বোন ও নাতিসহ পরিবারের ৭ জন নায়ায়নগঞ্জের একটি গার্মেন্টস ফেক্টরিতে কাজ করেন। ঈদের ছুটি কাটাতে পরিবার নিয়ে বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। শুক্রবার তাদের ছুটি শেষ দিন ছিলো। শনিবার রাতের ডিউটি পালন করতে হবে তাদের। তাই শুক্রবার সন্ধ্যায় শহরের পুরাতন বাস স্টেশন আসেন তারা। এসে দেখেন বাসের টিকেট নেই। শুক্রবার রাত সাড়ে ১০ টায় পুরাতন বাস স্টেশনের ডাচ্ বাংলা ব্যাংকের সামনে পরিবারের ৭ জনকে নিয়ে বসে থাকতে দেখা গেছে। এসময় তাদের আলাপ হয় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে।
মানিক মিয়া জানান, তারা সবসময় কর্ণফুলী বাস দিয়ে চলাচল করেন। শুক্রবার বিকালে মুঠোফোনে টিকেট কাউন্টারে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয় ৭টি টিকেট রাখা হবে। তাদের সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টার ভেতরে কাউন্টারে উপস্থিত থাকতে বলা হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই কাউন্টারে এসে দেখেন বাসের টিকেট নেই। এছাড়াও ভাড়া দ্বিগুণ। পরে অন্যান্য কাউন্টারে এসেও একই অবস্থা দেখতে পান তারা। তাই টিকেট না পেয়ে হতাশ হয়ে ডাচ্ বাংলা ব্যাংকের সামনে বসে আছেন।
তার বোন বিউটি আক্তার বললেন, গার্মেন্টসে শনিবার রাতের ডিউটিতে না গেলে ৭ দিনের অনুপস্থিত দিবে কর্তৃপক্ষ। এখন বিপদে পড়েছি। কোনো কাউন্টারে টিকেট পাচ্ছি না। আগে কর্ণফুলী বাসের টিকেট ৪০০ টাকা করে নিতো। এখন আটশ’ টাকা পিছনের সিটে বলে। এসে দেখি টিকেট শেষ। এখন টিকেট না পেয়ে বসে আছি। বাড়িতে ফিরে যাওয়ার মতো অবস্থাও নেই। বাড়ি থেকে আসার সময়ও দ্বিগুণের বেশি টাকা দিতে হয়েছে। মিয়ারচর থেকে সুনামগঞ্জের ভাড়া ৮০ টাকা। ঈদ উপলক্ষে আমাদের কাছ থেকে ২০০ টাকা করে নিয়েছে।
শুধু মানিক মিয়া ও বিউটি আক্তার নয়, তাদের মতো হাজারও গার্মেন্টস কর্মী ও বাইরের জেলায় কাজ করা শ্রমিক কর্মস্থলে ফিরতে একই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। যাত্রীদের বেকায়দায় ফেলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। ছুটি কাটিয়ে কার্মস্থলে ফেরা মানুষ শহরের প্রতিটি বাস টিকেট কাউন্টারে উপচে পড়া ভিড়ে একেকটি টিকেট দুর্লভ্য বস্তুতে পরিণত হয়েছে। যে যে রকম পারেন টিকেট সংগ্রহ করছেন। এদিকে কেউ কেউ পকেট ফাকা করে টিকেট সংগ্রহ করতে পারলেও অনেক যাত্রী কাঙ্খিত টিকেট পাচ্ছেন না। বেশিরভাগ যাত্রীদের ঢাকাগামী গাড়ির টিকেট দিয়ে তুলা হচ্ছে সিলেট সুনামগঞ্জ সড়কে চলা লক্কর—ঝক্কর বাসে। লক্কর—ঝক্কর বাসে যাত্রীদের ঠেসে বুঝাই করে রওয়া হচ্ছে সিলেটের দিকে। এসব বাসের চালক ও হেলপাররা বলছেন, সিলেট পর্যন্ত ছোট বাসে করে নিয়ে বড় গাড়িতে তুলে দেয়া হবে যাত্রীদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দূরপাল্লা বাসের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সুনামগঞ্জ ঢাকা সড়কে ঈদে যাত্রী পরিবহণে অতিরিক্ত বাস নামাতে চেয়েছিলেন তারা। তবে জেলা মালিক সমিতির বাঁধার মুখে তা সম্ভব হয়নি। সাধারণ যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে তারা।
একই উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের আমতলী গ্রামের বাসিন্দা সোহেল, নজীর, সাইফুল, সিরাজ বললেন, আমাদের এলাকায় এখন কাজ নেই। তাই নরসিংদীতে যাচ্ছি কৃষি কাজ করতে। কাউন্টারে এসে দেখি টিকেট নেই। ভাড়া দ্বিগুণ। এখন বাড়ি ফিরে যেতে হবে।
বালিজুরি গ্রামের রিপন আহমদ বললেন, আমি ঢাকার একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকরি করি। ঈদের ছুটিতে বাড়িতে আসছিলাম। অনেক কষ্ট করে কর্ণফুলী বাসে আটশ’ টাকায় একটি টিকেট পেয়েছি। সবসময় এনা পরিবহনে যাতায়াত করি। সেখানে দু’দিন আগের টিকেটও বিক্রি হয়ে গেছে।
আনোয়ারপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. ঝুনো মিয়া বললেন, সাকিন পরিবহনে টিকেট কাটলাম আটশ’ টাকা দিয়ে। যাওয়ার সময় আমাদের তুলা হলো ছোট বাসে। একজনের উপর আরেকজনকে বসিয়ে সিলেট নিয়ে বড় বাস দিয়েছে আমাদের।
সুনামগঞ্জ বাস—মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জুয়েল মিয়া বললেন, কেউ যেনো যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া না নেয় সেটা দেখছি আমরা। এছাড়া ঢাকা— সুনামগঞ্জ সড়কে আগে যে বাসগুলো চলেছে সেগুলো চলছে। এই বাইরে কোনো বাস সুনামগঞ্জে আসতে দিচ্ছি না। যাত্রীদের সিলেট পর্যন্ত পৌচ্ছাতে আমাদের বাসগুলো চলছে।
দূরপাল্লার অতিরিক্ত বাস আসতে বাঁধা দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতিরিক্ত দূরপাল্লার বাস আসলে যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়। ভাড়া নির্ধারিত হলেও তা মানেন তারা। এজন্য দূরপাল্লার অতিরিক্ত বাস আসতে দেয়া হয়নি।
সুনামগঞ্জ ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মহিবুল ইসলাম বললেন, যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ব্যাপারে কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।