স্টাফ রিপোর্টার
মৃত্যু মানুষের অমোঘ নিয়তি। প্রিয়মানুষকে চিরতরে বিদায় জানানো সব সময়েই বেদনাদায়ক। ২০২২ সালে অনেকেই একে একে বিদায় নিয়েছেন, চলে গেছেন না ফেরার দেশে। বছরজুড়ে শোকের তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। হারানোর বেদনা নিয়ে শেষ হতে যাচ্ছে বছরটি। চলে যাওয়া কীর্তিমানদের শূন্যতা কখনও পূরণ হবার নয়। চলতি বছরে চলে যাওয়া বরেণ্যদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। বছর শেষে তাঁদের আরও একবার স্মরণ।
পীর হাবিবুর রহমান
৫ ফেব্রুয়ারি শনিবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বরেণ্য সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট, বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক পীর হাবিবুর রহমান মারা যান। এর আগে শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পীর হাবিব স্ট্রোক (মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ) করলে তাঁকে ল্যাবএইড হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। গত বছরের অক্টোবরে ভারতের মুম্বাই জাসলুক হাসপাতালে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশনের মাধ্যমে ক্যানসার মুক্ত হন তিনি। গত ২২ জানুয়ারি পীর হাবিবের করোনা শনাক্ত হয়। পরে করোনামুক্ত হলেও কিডনি জটিলতার কারণে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন।
বরেণ্য সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট পীর হাবিবুর রহমান ১৯৬২ সালের ১১ নভেম্বর হাছনগরের এই বাড়িতে জন্মেছিলেন। ৭ ফেব্রুয়ারি সোমবার সুনামগঞ্জ পৌরসভা চত্বরে মরহুমের মরদেহে সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা জানান। দুপুর আড়াইটায় কেন্দ্রীয় ঈদগাহে প্রথম জানাজা শেষে নিজ গ্রাম মাইজবাড়ীতে পিতা-মাতার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন পীর হাবিবুর রহমান। দীর্ঘ কর্মজীবনে পীর হাবিবুর রহমান দৈনিক বাংলাবাজার, যুগান্তর, মানবকণ্ঠ, আমাদের সময় পত্রিকায় কাজ করেছেন। সর্বশেষ তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। পীর হাবিবুর রহমান দেশের জনপ্রিয় নিউজপোর্টাল পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজের প্রতিষ্ঠাতা।
বাউল মকদ্দস আলম উদাসী
১৪ জুলাই সিলেট অঞ্চলের অন্যতম বাউল মকদ্দস আলম উদাসী চলে যান না ফেরার দেশে। সকাল ৬টায় দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংহপুর ইউনিয়নের চাইরগাঁও গ্রামে তিনি নাতনির বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গুণী এ বাউল কবি জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় কাটিয়েছেন জগন্নাথপুর উপজেলায়। নব্বই দশকে তিনি ছাতক থেকে জগন্নাথপুর উপজেলায় চলে আসেন। উপজেলা সদরের দিঘির পাড়ে ছোট কুটিরে সংসার জীবন শুরু করেন। সেখানে নিজে গান গাইতেন আর শিষ্যদের গান শেখাতেন। পরবর্তীতে তিনি গীতিকবি রাধারমণ দত্তের জন্মভূমি কেশবপুর গ্রামের এক কলোনিতে বসবাস শুরু করেন।
এম এ হালিম বীর প্রতীক
এম এ হালিম ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এলাকার কয়েকজন ছাত্র-যুবককে নিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ভারতের রেঙ্গুয়া বাজারে গিয়ে তাঁরা নাম লেখান মুক্তিবাহিনীতে। ইকো-১ ট্রেনিং সেন্টারে এক মাসের ট্রেনিং শেষে তাঁদের পাঠানো হয় ৫ নম্বর সেক্টরের বালাট সাব-সেক্টরে। সেখানে এক যুদ্ধে আহত হন তিনি। বালাট এলাকা সম্পর্কে তাঁদের কোনো ধারণা ছিল না। পরে তাঁদের নিজেদের এলাকায় পাঠানো হয়। তাঁদের মোট ৭৩ জন সেলা সাব-সেক্টরে এসে যোগ দেন।
২১ সেপ্টেম্বর দোয়ারাবাজার উপজেলার সুরমা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ হালিম বীর প্রতীক মারা যান। বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ হালিম বীর প্রতীক দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস, কিডনি ও বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভোগছিলেন। গত প্রায় দেড় মাস ধরে তিনি সিলেটে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর বাড়ি দোয়ারাজার উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের টেংরাটিলা গ্রামে। তাঁর পিতার নাম মো. আবদুল কুদ্দুস এবং মাতার নামা জোবেদা খাতুন। ২০২১ সালের ১১ নভেম্বর সুরমা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৫ হাজার ৪৪৫ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী হিসেবে তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন।
জয়ন্ত কুমার সরকার
১৮ সেপ্টেম্বর দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর এর দিরাই উপজেলা প্রতিনিধি জয়ন্ত কুমার সরকার পরলোকগরণ করেন। জয়ন্ত কুমার সরকার সাংবাদিকতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাধারমণ পরিষদ ও আন্তর্জাতিক রাধারমণ ধামাইল সংঘ দিরাই শাখার সাধারণ সম্পাদক ও প্রতাপরঞ্জন স্মৃতি পরিষদেও ছিলেন। দিরাই উদীচীর ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকেরও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন।
বাদল সরকার
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সদস্য, সুনামগঞ্জ জেলার সভাপতি এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের জেলা-সহসভাপতি আজীবন সংগ্রামী নেতা বাদল সরকার ২৮ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন।
আকমল হোসেন
মীরপুর ইউনিয়নের শ্রীরামসি গ্রামের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক তালেব আলীর সন্তান আকমল হোসেন ১৯৯৮ সালে মীরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে তিনি টানা দ্বিতীয়বারের মতো মীরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। সে সময় ২০০৭ সালে তত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান হিসেবে গোল্ড মেডেল পান। ২০০৯ সালে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচনে অংশ নেন। ওই নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদের ফলাফল নিয়ে আইনি জটিলতা দেখা দিলে উচ্চ আদালতের রায়ে শাহারপাড়ার এক কেন্দ্রে পুনভোটের মাধ্যমে তিনি ২০১১ সালে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৬ সালে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি সিলেট বিভাগের শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান মনোনীত হন। গত ২ নভেম্বর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি আবারও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে গত ৮ ডিসেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
আকমল হোসেন ১৯৯৮ সালে জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। দীর্ঘদিন সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পর ২০১৪ সালে জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। সর্বশেষ গত ১৬ নভেম্বর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে তিনি আবারও সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি একজন সৎ,পরিচ্ছন্ন নির্ভিক ধৈর্যশীল আপাদমস্তক সজ্জন রাজনীতিবীদ ছিলেন। শ্রীরামসি স্কুল এন্ড কলেজের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও শহীদ স্মৃতি সংসদ শ্রীরামসির উপদেষ্টা ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর চাচাতো ভাই সাদ উদ্দিন শহীদ হন।
জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আকমল হোসেন (৬৭) সোমরাত রাত দেড়টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টায় সিলেট নায়েবপুল জামে মসজিদে জানাযা শেষে বেলা ১১ টায় উপজেলা পরিষদ চত্বরে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ জগন্নাথপুর আনা হবে। পরে দুপুর ২.৩০ মিনিটে উপজেলার মীরপুর ইউনিয়নের শ্রীরামসি স্কুল এন্ড কলেজ মাঠে জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।
আকমল হোসেন গত ২৪ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকায় গিয়েছিলেন। রাজধানীর পল্টন এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে সোমবার রাত সাড়ে ১২টায় তিনি আকস্মিক অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাত দেড়টায় চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।