- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ফুলের বাগান দেখতে যাচ্ছেন দর্শনার্থীরা

স্টাফ রিপোর্টার
সুনামগঞ্জ শহরের একটু দূরেই ফ্লাওয়ার লেক নামে নতুন একটি পর্যটন স্থান গড়ে ওঠেছে। সেখানে বিকেল হলেই দর্শনার্থী ও পর্যটকেরা ভিড় করেন। শহরের ব্যস্ততার ছাপ ও ক্লান্তি ভুলতে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরের দর্শনীয় স্থানে ছুটে যাচ্ছেন অনেকে। তুলছেন সেলফি, চাইলেই পাওয়া যাচ্ছে প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারও। নতুন আয়ের উৎস তৈরি হয়েছে সাত উদ্যোক্তাসহ দুই ফটোগ্রাফারের। গেল বছর একইভাবে আরও কিছু উদ্যোক্তা এভাবেই বাগান করেছিলেন।
নতুন উদ্যোক্তারা হলেন আরিফুল ইসলাম, নুরুল আমিন, মো. রুবেল, আবু বাক্কার, শামীম আহমেদ, রতন মিয়া ও ফয়সাল। লালপুর গ্রামের এই উদ্যোক্তারা ছোটখাটো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। করোনাকালীন সময়ে ব্যবসায় সুবিধা করতে না পেরে বিকল্প আয়ের পথ তৈরি করেছেন তারা। এতে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে তাদের।
ফ্লাওয়ার লেক সুনামগঞ্জ- তাহিরপুর সড়কের ডান পাশে অবস্থিত। সড়ক থেকে নেমেই ছোট একটি লেক। সে লেক পার হয়েই নানান ফুলের বাগান তৈরি করেছেন এই সাতজন। দর্শনার্থীদের সুবিধার কথা ভেবে নির্মাণ করেছেন ওয়াসরুম, ক্যান্টিন, লেকের উপর বাঁশের সেতু, নৌকা ও ছবি তোলার বিভিন্ন ইভেন্ট।
মাঘ মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রকৃতিতে বইতে শুরু করেছে ফাল্গুনের হাওয়া। ঋতুরাজ বসন্ত তার আগমনী বার্তা নিয়ে প্রকৃতির দরজায় কড়া নাড়ছে। বছর ঘুরে প্রকৃতি তার নানা পরিবর্তন পেরিয়ে আবার সেজেছে নতুন রূপে। ফ্লাওয়ার লেকের লাল, হলুদ ও সবুজ ফুল দর্শনার্থীদের খুব সহজেই আপন করে নিচ্ছে।
দর্শনার্থীরা বলছেন, শহরের ক্লান্তি ভুলতে ফ্লাওয়ার লেক এ এসে সময় কাটাচ্ছেন অনেকে। এখানে রয়েছে সুন্দর একটি লেক। লেকে ঘুরে বেড়ানোর জন্যে রয়েছে দুটি নৌকা। ক্যান্টিন, বসার জায়গা ও লেকের উপর বাঁশ, কাঠের সেতু রয়েছে। এই ফ্লাওয়ার লেকে বিকেল হলেই ছুটে আসেন ভ্রমণপিপাসুরা। টিকটকাররাও এখানে ভিডিও বানানোর জন্য ছুটে আসেন।
দর্শনার্থী পলি রায় বললেন, শহরের একঘুয়েমিতে অনেক সময় হাঁপিয়ে যাই। বিনোদনের প্রয়োজন হয়। শহরে কোনো বিনোদনের ভালো কোন ব্যবস্থা নেই। এখানে আসলে গ্রামীণ পরিবেশের অনুভূতি পাওয়া যায়। লেক, নৌকা, সূর্যমূখী, গাঁদা, সিলভিয়া, কুসুমসহ সব ধরণের ফুল রয়েছে। এছাড়াও দোলনা, ক্যান্টিন, বাঁশের সাঁকোও আছে। এসেছি নিজেকে রিফ্রেশ করার জন্যে। ভালোলাগে, মনে হয় গ্রামে আছি।
মো. হারুনুর রশিদ বললেন, আমি প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার। এখানে সব সময় ছবি তুলি। শুক্রবার উপচেপড়া দর্শনার্থী আসে। তাদের ছবি তুলে দিতে ভালো লাগে। এরজন্যে প্রতিদিন হাজার পনেরোশ’ টাকা আয় করতে পারি। এতোদিন বেকার ছিলাম। এই ফ্লাওয়ার লেক হওয়ায় আমাদের আয়ের পথ তৈরি হয়েছে।
টিকটকার মো. আরমান বললেন, আমরা ৩ জন আসছি। এখানে ফুলগুলো খুব সুন্দর। লাইটও ভালো পাওয়া যায়। তাই আমরা টিকটক ভিডিও করতে আসছি। দুই তিনঘটা হয়েছে আসছি। এখন আর যেতে মন চাইছে না।
ফ্লাওয়ার লেকের মালিক মো. রুবেল বললেন, এখানে একটি লেক আছে। সেটি দেখে বাগান করার চিন্তা করি। পরে আমরা সাতজন প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ করে এখানে বাগান করেছি। নাম দিয়েছি ফ্লাওয়ার লেক। তিনি বললেন, এখানে যে ফুলগুলো রয়েছে সেগুলো সিলেট থেকে এনেছি। সেলভিয়া, ডালিয়াসহ প্রায় ৩৫ হাজার টাকার চারা এনেছি। কাঠ ও বাঁশ দিয়ে লেকের উপরে একটি সেতু করেছি। সেখানেও ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ২ টি নৌকাও দিয়েছি। মোট খরচ হয়েছে দেড় থেকে পৌনে দুই লাখের মতো। এখন পর্যটক আসেন। প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা আয় হয়।
ঠিক একইভাবে শহরতলীর লালপুর গ্রামের ছয় তরুণ। বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালে পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়েন। ভাবতে থাকেন কী করবেন? এই ভাবনাতেই তাদের চলে যায় অনেক মাস। অল্প পুঁজি নিয়ে শুরু করেন সূর্যমুখী ফুলের চাষ। গড়ে ওঠে বাগান। নাম দেন ‘স্বপ্ন ছোঁয়া সানফ্লাওয়ার গার্ডেন’। এই গল্প গেল বছরের করোনা মহামারি সময়কার। সে সময়ে মাত্র ৩৪ হাজার টাকা খরচ করে ১ মাসে দুই লাখ টাকার উপরে আয় করেন তারা। সেখান থেকেই যাত্রা শুরু।
এবারও তারা সে স্বপ্ন নিয়ে তিনগুণ বিনিয়োগ করে করেছেন সূর্যমূখী ফুলের বাগানে। বসন্ত আসার আগেই ফুল ফুটেছে বাগানে। দর্শনার্থীর সংখ্যাও এখন কম। বসন্তের রং মানুষের মনে লাগলে দর্শকও বাড়বে বললেন উদ্যোক্তারা।
উদ্যোক্তারা বললেন, ফুলের বাগান থাকবে ১ মাস। এরপরেই প্রকৃতির নিয়মে হারিয়ে যাবে। তাই লোকসানের আশংকা করছেন এই ছয় তরুণ উদ্যোক্তা। তবে তারা দমে যাওয়ার মত নয়। স্বপ্ন দেখছেন গেল বছরের মতো অসংখ্য দর্শনার্থী তাদের বাগানের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে আসবে।
এই বাগানের উদ্যোক্তারা হলেন- নজরুল ইসলাম, রেজাউল করিম, রুকনউদ্দিন, ফরহাদ আহমদ, পারভেজ আহমদ ও রুবেল হোসেন।
গৌরারং ইউনিয়নের লালপুর গ্রামের স্বাধীন বাজারের পাশে প্রায় ১০০ শতাংশ জমিতে এই বাগান করেছেন তারা। জমি তৈরি ও বীজ কেনা বাবদ খরচ হয়েছে ৯৪ হাজার টাকা। বাগানের ভেতরে বাচ্চাদের দোলনা ও অন্যান্য আসবাবপত্র দিয়ে সাজাতে টাকা খরচ করতে হয়েছে। এই দুয়ের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে তাদের ‘স্বপ্ন ছোঁয়া সানফ্লাওয়ার গার্ডেন’।
বাগানের মালিক মো. রেজাউল করিম বললেন, আমরা ছয় বন্ধু মিলে গতবছরের মতো এবারেও বাগান করেছি। মানুষকে আনন্দ ও নিজেদের কিছু উর্পাজনের জন্যে বাগানকরি আমরা। আমরা ভালো কিছু করতে পারলে গ্রামের অন্য বেকার তরুণরাও উদ্যোগ নিতে সাহস পাবে। এবার গেল বছরের মতো পর্যটক আসছে না। তবে আশা ছাড়ছি না আমরা।

  • [১]