- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ফেরিওয়ালারাও পিআইসি প্রধান

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
জামালগঞ্জে হাওর রক্ষা বাঁধ কাজে অপ্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও পিআইসি গঠনে ব্যাপক অনিয়মসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। অনর্থক বরাদ্দের পাশাপাশি ফেরিওয়ালা, গার্মেন্টসকর্মী, রাখাল ও হাঁস পালকের মতো সম্বলহীন অযোগ্যদের পিআইসিতে যুক্ত করে বিতর্কের ক্ষেত্রটাকে পাকাপোক্ত করেছে উপজেলা কাবিটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি।
গত বছর ৫৩টি পিআইসির অধীনে বাঁধের কাজ করা হলেও চলতি বছর ১৬টি বাড়িয়ে ৬৯টি পিআইসির জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা। গেল মৌসুমে যার ব্যয় ছিল ৬ কোটি ৭৭ লাখ। প্রকৃতিগত বিপর্যয়ে বাঁধ বিনষ্ট কিংবা শতভাগ মাটি সরে যাওয়ার মতো ঘটনা না ঘটলেও বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়টিতে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
হাওর পারের কৃষক ও সাধারণ মানুষ মনে করছেন, এই পিআইসি বাণিজ্যে লাভবান হবে তারাই, যারা তালিকার বাইরে থেকেও পিআইসি নামধারী অকৃষিজীবী আর্থিক সামর্থহীন মানুষগুলোকে ব্যবহার করছে।
সম্প্রতি জেলা প্রশাসক বরাবরে অভিযোগ দায়ের করা ৪০নং পিআইসির আওতাভূক্ত ভীমখালী ইউনিয়নের জামালগঞ্জ-সুনামগঞ্জ সড়কের নোয়াগাঁওয়ের খাল ও সুরমা তীরবর্তী উজ্জ্বলপুর-জাল্লাবাজ মধ্যস্থলের ভাঙ্গাটি পরিদর্শনের গিয়ে দেখা যায়, ছোট ছোট খাল কিংবা ভাঙ্গার জন্য যে আজগুবি বরাদ্দ (১৭ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৯ টাকা) দেওয়া হয়েছে তা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অপ্রয়োজনীয়। সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের পেট ভরাতেই এ বরাদ্দ বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অপরদিকে অভিযুক্ত ৩৯নং পিআইসির অবস্থাও অনেকটা এ রকম বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
নোয়াগাঁও খালের পার্শ্ববর্তী বসবাস করা ষাটোর্ধ্ব এক প্রবীণ জানিয়েছেন, ‘বাবারে এই বয়সে এখন পর্যন্ত হুনি নাই এ খাল দিয়া হাওরে পানি ঢুকছে। কিতার লাগি এইখানে বরাদ্দ দিছে এইডা এরাই কইতে পারব।’
ভীমখালী ইউনিয়নের ছোট ঘাগটিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও ৩নং ওয়ার্ড মেম্বার বাবুল মিয়া বলেন, ‘এই ছোটখাটো কাজের জন্য এত বরাদ্দ কেন দেওয়া হল সেটা বোধগম্য নয়।’
ভীমখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আক্তারুজ্জামান শাহ বলেন, ‘এই বরাদ্দটা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। এর সামনে এলজিইডির পাকা রাস্তা রয়েছে। এরপরও কোন কারণ বশতঃ যদি বাঁধ দেওয়া হয় তাহলে এত টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন নেই।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৪নং পিআইসি সভাপতি ছুরত জামানের অধীনে শনির হাওর উপ-প্রকল্পের জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। ২৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭২২ টাকায় বরাদ্দকৃত এই পিআইসি মূলত অন্য আরেকজনের। সেখানে তালিকাভূক্ত ছুরত জামানকে কেবল কাজের লোক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ রকম অবস্থায় প্রায় অধিকাংশ পিআইসির।
৪নং পিআইসি সভাপতি ছুরত জামানকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘যারা বরাদ্দ দিছে হেরা বুইঝ্যাই দিছে। এইখানে কাজ করতে টেকা বেশি লাগব, তাই বরাদ্দের পরিমাণ বেশি দেওয়া হইছে।’
জানা যায়, হালির হাওর উপ-প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত ৬০নং পিআইসি সভাপতি বেহেলী ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের বাসিন্দা নিরঞ্জন রায় একজন ফেরিওয়ালা। গ্রামে গ্রামে ফেরি করে পণ্য বিক্রি করাই যার প্রধান পেশা। নামমাত্র কৃষক এই অভাবী মানুষটিকেই পিআইসির সভাপতি করা হয়েছে। যার নুন আনতে পানতা ফুরোয় অবস্থা তাকে দেওয়া হয়েছে ২৪ লাখ ৫৪ হাজার টাকার বিশাল বরাদ্দ। পিআইসি তালিকায় নিতান্ত গরীব নিরঞ্জন রায়ের নাম দেখে তার গ্রামের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। শুধু তাই নয়, এ রকম অনেক পিআইসি নিয়েই কথা উঠছে।
পিআইসি নিরঞ্জন রায়ের বিষয়টিতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানিয়েছেন, ‘তাকে গ্রামের কেউ ৫শ’টাকা ধার দিতেও ভয় পায়। যার ২ হাজার টাকারও ক্ষমতা নাই, তাকে এত বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যাদের পিআইসি বানানো হয়েছে, এদের প্রায় সবাই এ কাজ করার সামর্থ রাখে না। আসলে এদের ব্যবহার করে ফায়দা লুটার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
এ ব্যাপারে অভিযোগ অস্বীকার করে নিরঞ্জন রায় বলেন, ‘এই কাজডা আমারে দেওয়া হইছে, আমিই করতাছি। আমার সাথে কেউ সম্পৃক্ত নাই।’
৬৬নং পিআইসির সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাঁধের ঘাস না সরিয়েই দেদারছে মাটি ফেলা হচ্ছে। মানা হচ্ছে না কোন নিয়মনীতি।
অভিযুক্ত ৪০নং পিআইসি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি প্রিয়াংকা পাল বলেন, ‘গত দুই বছর এখানে কাজ করা হয়েছে। এটা নতুন কোন প্রজেক্ট নয়। আর এই অংশটা পাউবোর আওতাভূক্ত।’ এছাড়া ৬০নং পিআইসির সভাপতিকে নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘তিনি কৃষক, হাওরে তার জমি আছে। কাজও প্রায় অর্ধেক শেষ করে ফেলেছেন তিনি। কারও কাছ থেকে ধার নিয়েও তো তিনি কাজ করতে পারেন, তাহলে সমস্যা কোথায়।’
উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান ইউসুফ আল আজাদ বলেছেন, ‘এ সম্পর্কে বলে আর কি হবে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম একটা, রাতের আঁধারে ঘইটা গেল আরেকটা।’

  • [১]