নূরুল ইসলাম চৌধুরী
বয়স এখন ৭৮। বিছানা থেকে ওঠতে পারি না। শরীর একেবারে ভেঙে পড়েছে। বঙ্গবন্ধু’র সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল সম্ভবত. ১৯৬৭ ইংরেজির শেষ দিকে অথবা ৬৮’এর প্রথম দিকে। সুনামগঞ্জে পাবলিক মিটিং করতে এসেছিলেন। সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়ক তখন পাকা ছিল না। কাঁচা সড়কে ধুলোমাখা হয়ে আসতে হতো। বঙ্গবন্ধুও জীপ গাড়িতে সেভাবেই এসেছিলেন। ঐ সময় দেওয়ান ওবায়দুর রাজা চৌধুরী’র বাসভবনের দু’তলায় বঙ্গবন্ধু’র বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
দুপুরের খাবারের পর ওবায়দুর রাজা চৌধুরী’র দোতলায় আব্দুর রইছ সাহেব, আব্দুজ জহুর সাহেব, খলিলুর রহমান সাহেব, হোসেন বখ্ত সাহেব, আছদ্দর মোক্তার সাহেবসহ আমরা অনেকেই ছিলাম। নিচে আওয়ামী লীগের কয়েক’শ নেতা-কর্মী।
বঙ্গবন্ধু নিচের কর্মীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে ছয়দফা’র বিষয়ে জনগণকে বুঝাতে হবে। আওয়ামী লীগের প্রাণশক্তি আপনারাই, সকলকে জনগণের আস্থার মধ্যে থাকতে হবে।’
এরপর কোর্ট মসজিদের পেছনের দিকে এটিম ফিল্ডে (বর্তমান স্টেডিয়াম) করা জনসভা মঞ্চে গিয়ে হাজার হাজার মানুষের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন বঙ্গবন্ধু।
১৫ আগস্ট গভীর রাতে স্তব্ধ হয়ে যায় জাতি। সুনামগঞ্জে থম থমে ভাব। আমরা যার যার মতো করে নিরাপদ অবস্থানে থেকেছি। কোন প্রতিবাদ- বিক্ষোভ হয়নি। পুরো পরিস্থিতি-ই ছিল আওয়ামী লীগের প্রতিকূলে।
আব্দুজ জহুর সাহেব তখন অ্যাসেম্বলি সদস্য ছিলেন। অনেক গোপনে ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জে আসেন।
এই পরিস্থিতিতেও আমরা কয়েকজন বিকালে প্রতিদিনই মিলিত হতাম। একেকদিন একেক জনের বাসায়। কোনদিন আব্দুর রইছ সাহেবের বাসায়, আবার কোন কোনদিন বসতাম খলিলুর রহমান সাহেবের বাসায়।
১৫ আগস্টে আগে পুরাতন কলেজ প্রাঙ্গণে এখনকার আলফাত স্কয়ারে (সাবেক ট্রাফিক পয়েন্ট) সপ্তাহে ৩-৪ দিন সভা হতো।
রাজনৈতিক অবস্থা ছিল। সেটি তখন একেবারেই স্তব্ধ হয়ে যায়। ট্রাফিক পয়েন্টের হৈ-হুল্লোর থেমে যায়। বিকালে ডিএস রোডের বিকাশ বাবু’র ফার্মেসীতে (আলেয়া ফার্মেসী) গিয়ে বসতাম। ওখানে আব্দুর রইছ সাহেব, দেওয়ান ওবায়দুর রাজা সাহেব, খলিলুর রহমান সাহেব, আলফাত মোক্তার সাহেব, মাঝে মাঝে বরুণ বাবু, জহুর সাহেবও আসতেন।
বসে বসে জাতীয় সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলে আবার বাসায় ফিরে আসা। এর চেয়ে বেশি রাজনৈতিক কর্মকান্ড ছিল না।
১৯৭৫’এর শেষ দিকে জিয়াউর রহমান যখন সামরিক শাসন জারি করে, তখন নিজের বাসা থেকেই আব্দুর রইছ, আব্দুজ জহুর, খলিলুর রহমান, আপ্তাব উদ্দিনসহ জেলাজুড়ে অনেকেই গ্রেপ্তার হন। সকলের নামও এখন আমার মনে পড়ছে না। এরপর থেকে আমাদের সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রম দুর্বল হতে থাকে।
পরবর্তীতে জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনা দেশে আসার পর থেকে বিশেষ করে এরশাদ সরকারের পতনের পর আমাদের দল আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু’র শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে আমি মনে করি বঙ্গবন্ধু’র স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে আদর্শিক, সৎ কর্মী বাহিনীর বড় বেশি প্রয়োজন।
অনুলিখন : পঙ্কজ দে