গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে ‘মুক্তমত’ কলামে ‘অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষাই কোচিংঘরগামীতার কারণ’ শিরোনামে জনৈক এ.এন. তালুকদারের একটি নিবন্ধ ছাপা হয়েছে। নিবন্ধকার তথ্য দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, বর্তমানে নানাবিধ পরীক্ষার ভেন্যু হিসাবে বিদ্যালয়গুলোকে ব্যবহার করার কারণে কছরে চার মাস বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়। পাবলিক পরীক্ষা হিসেবে জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ভেন্যু করা হয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোকে। এই পাবলিক পরীক্ষার বাইরে রয়েছে বিদ্যালয়গুলোর নির্ধারিত নিয়মিত পরীক্ষাগুলো। নিবন্ধকার বলছেন, এতে করে বার্ষিক পাঠপরিকল্পনা অনুসারে ওইসব বিদ্যালয়ে ক্লাস করানো সম্ভব হয় না। বিদ্যালয় যে শুধু পরীক্ষার জন্যই চার মাস বন্ধ থাকে তা কিন্তু নয়। বন্ধ আরও আছে। রমজানের, পুজোর, নানা দিবসের, ধর্মীয় উৎসবাদির, ঋতুকেন্দ্রীক ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোর জন্য রয়েছে লম্বা বন্ধ। একজন শিক্ষকের সাথে আলাপ করে জানা গেল, বিদ্যালয়ে দাপ্তরিক বন্ধ আছে বছরে ৮৫ দিন। সাপ্তাহিক ছুটি বছরে ৫২ দিন। এই ১৩৭ দিনের সাথে পরীক্ষাজনিত কারণে ৪ মাস অর্থাৎ ১২০ দিন যোগ করলে বিদ্যালয়ের শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকে ২৫৭ দিন। ৩৬৫ দিনের ২৫৭ দিন অর্থাৎ ৭০ ভাগ দিনই যদি শিক্ষার্থীদের পড়ানো সম্ভব হয় না তাহলে শিক্ষার্থীরা সিলেবাস আত্মস্থ করবে কোন উপায়ে? নিবন্ধকার এই বন্ধগুলোর কারণে শ্রেণিকার্যক্রম বিঘিœত হওয়ার বিষয়টিকে উল্লেখ করে বলছেন, ‘ঠিক এ কারণেই শিক্ষার্থীদের কোচিংঘরগামী করে তোলে’। তিনি নিবন্ধের শেষে এসে যে পরামর্শ দিচ্ছেন তা এরকম-‘কোচিংবাণিজ্য রুখতে হলে প্রতিটি মানুষকে সচেতন হয়ে এলাকার বিদ্যালয়টিকে সর্বোত্তমভাবে গড়ে তোলায় মনোনিবেশ করতে হবে এবং তা করতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মাধ্যমে’। লক্ষণীয়, তিনি সমস্যা সমাধানের উপায় হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার কথা বলেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা সেটি আমাদের পবিত্র সংবিধানে ঠাই পেয়েছে। সেখানে শিক্ষাকে নাগরিকের মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সকল নাগরিকের একমুখি শিক্ষা পাওয়ার অধিকারের কথা বলা আছে সংবিধানে। কিন্তু বছরে ২৫৭ দিন বিদ্যালয় বন্ধ রেখে এই উদ্দেশ্য সাধন করা কি সম্ভব?
আসলে কোন কিছুর জন্যই একক কোন উপসর্গকে দায়ী করা সম্ভব নয়। আজ প্রাইভেট টিউশন, কোচিংবাণিজ্য, নোট-গাইড বাণিজ্য ইত্যাদির যে ভয়াল বিস্তার আমাদের সার্বজনিন শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভিতর থেকে খুবলে খুবলে খাচ্ছে তার পিছনে অনেকগুলো উপসর্গ দায়ী। শুধু শিক্ষকদের দোষ না দিয়ে সব উপসর্গ মিলিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় যে সিস্টেম দাঁড়িয়েছে তাকে দোষী সাব্যস্থ করতে হবে এবং ওই সিস্টেম বদলানোর কাজ শুরু করতে হবে উপর থেকে শুরু করে নীচ পর্যন্ত। এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা দাঁড় করাতে হবে যেখানে বছরের অধিকাংশ দিন শ্রেণি কার্যক্রম চলমান থাকে, যেখানে সিলেবাস হবে বিজ্ঞানসম্মত ও শিক্ষানুকূল এবং জাতীয় চেতনা ও আকাক্সক্ষার সাথে সংগতিপূর্ণ, শিক্ষকরা হবেন আদর্শবান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই জিনিসগুলোর নিশ্চয়তা বিধান করা গেলে মানসম্মত কিংবা কোচিংহীন শিক্ষা ব্যবস্থাকে আর ভাজা বরফের মতো অবাস্তব কোন বিষয় মনে হবে না। তাই আসুন, খ-িত সমালোচনায় না গিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে সার্বিক যে অবক্ষয়, তার রোধকল্পে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের দিকে আমরা অগ্রসর হই।