- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

বঞ্চিত অসহায়রা

বিশ্বজিত রায়
বারান্দায় আবছাটে আলো। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। মা পাশের বাড়িতে কাজে ব্যস্ত। হাঁটুমোড়া দিয়ে দু’হাত এঁটে নিশ্চুপ বসে আছে মেয়েটি। তার মুখচ্ছবি, বসার ধরণ ও বসনে সাফ প্রতিবন্ধীর চিহ্ন। নড়াচড়া ও কথা বলায় সামর্থশূন্য মেয়েটির বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন তার বিধবা মা। আর মায়ের ভরসা বলতে অন্যের বাড়িতে- হোটেলে ঝি’এর কাজ করা। বিধবা ও প্রতিবন্ধী এই মা ও মেয়ের ভাগ্যে কোন ধরনের ভাতা না জুটায় প্রতিবেশীরা ক্ষোভ ঝাড়ছিলেন এই প্রতিবেদকের কাছে। জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের সাচনা গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত মা ও মেয়ে এরা।
সাচনা বাজারে হোটেলে পানি বয়ে কোনরকম জীবনধারণ করা শোভা রানী দাস উপজেলার বেহেলী ইউনিয়নের বেহেলী গ্রামের বিনয় ভূষণ দাসের স্ত্রী। স্বামী মারা যাওয়ার পর কারও সহায়তা না পেয়ে তিনি মেয়ে সম্পা রানী দাসকে নিয়ে চলে আসেন সাচনা গ্রামে। প্রায় ২০ বছর ধরে রঞ্জু দাসের বাড়ির ছোট্ট একটি ঘরে প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে বসবাস করে আসছেন তিনি। গত বন্যায় ঘরটা তলিয়ে গেলে ওঠেন আরেক বাড়ির বারান্দায়। ঘর না শুকানোয় এখন পর্যন্ত সেখানেই আছেন। আগের ইউপি সদস্য রবীন্দ্র কুমার দাস থাকাবস্থায় মা-মেয়ে দু’জনে ভাতা পেলেও বর্তমান ইউপি সদস্য মো. কাদির মিয়া আসার পর নাম দুটো বাতিল হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন অসহায় শোভা রানী ও স্থানীয়রা।
প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে চরম বিপদে পড়া শোভা রানী দাস বলেন, ‘কোমরে ধরা নিয়াই বাজারে পানি টাইন্যা চলতাছি। এখন আর পারতাছি না। মেয়েডারে নিয়া কতটা বিপদে আছি হেরা (প্রতিবেশী) দেখতাছে। কিন্তু ভাতা-টাতা কিচ্ছু দেওয়া হয় না আমারে। রবীন্দ্র মেম্বারের সময়ে দু’জনেই ভাতা পাইতাম। এখন আর পাই না।’
প্রতিবেশী নিহার দাস বলেন, ‘অনেক স্বচ্ছল মানুষরা ভাতা পাচ্ছে। শোভা রানীর মতো চূড়ান্ত অসহায় মানুষেরা ভাতা পাচ্ছে না, এটা লজ্জাজনক। এই বিধবা নারী প্রতিবন্ধী মেয়েটাকে নিয়ে কত কষ্ট করে জীবন পার করছেন আমরা কাছ থেকে দেখতে পাচ্ছি। জানি না, আর কত অসহায় হলে ভাতা মিলবে শোভা রানীর কপালে।’
এ ব্যাপারে ইউপি সদস্য মো. কাদির মিয়া বলেন, ‘আমি তাদের কাছ থেকে কার্ড এনে সমাজসেবা অফিসে জমা দিয়েছি। যখন ভাতা হয়নি তখন তারা আমাকে জানিয়েছেন। আমি তাদেরকে অফিসে যোগাযোগ করার জন্য বলেছি। কিন্তু কেন ভাতা হয়নি সেটা বলতে পারব না।’
শোভা রানী দাস বা তার মেয়ে কেবল নয়, জেলাজুড়েই আছে ভাতা বঞ্চিতদের ক্ষোভ।
বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আছে গ্রামে গ্রামে। ভাতা প্রাপ্তিতে মোটা অংকের টাকা লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
কোন কোন ইউপি সদস্য ভাতা দিতে নামপ্রতি ৩-৫ হাজার টাকা দাবি করছেন এমন অভিযোগও আছে। এতে করে বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীসহ প্রতিবন্ধী ও শারীরিকভাবে অক্ষম বয়স্ক নারী-পুরুষের বদলে স্বচ্ছল পরিবারের লোকজনের নাম চলে আসছে ভাতা প্রাপ্তির তালিকায়।
জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সোনাপুর গ্রামের ৮৬ বছর বয়সী বিধবা নূরে আফতাব বলেন, ‘আমরা কোন ধরনের সহযোগিতা পাই না। আমার একমাত্র পোলা ঢাকায় থাইক্যা রিক্সা চালায়। তার পাঠানো সামান্য টাকায় পরিবার চলে। হুনতাছি অনেক ভালা ভালা মাইনসে ভাতা পায়। কিন্তু আমি পাই না।’
চাঁনপুর গ্রামের ৬৮ বছর বয়সী জয়নব বিবির ছেলে দিনমজুর জামাল হোসেন বলেন, ‘ছোটবেলায় বাবা মারা গেছেন। আমার আম্মা আমরারে অনেক কষ্ট কইরা বড় করছেন। আমার অভাব-অনটনের সংসারে আম্মারে কোনকিছু আইন্যাও দিতাম পারি না। যদি আম্মা ভাতার কার্ডটা পাইতেন তাহইলে খুব উপকার হইত। কিন্তু মেম্বারের কাছ থাইক্যা এই সাহায্য পাইতাছি না।’
একই গ্রামের হাত ভাঙা পঁচাত্তরোর্ধ মো. মর্তুজ আলী জানিয়েছেন, এক দুর্ঘটনায় তার হাতটা ভেঙে গেছে। ছেলেরা থাকলেও তাদের সবাই আলাদা। মাঝে মাঝে ছেলেদের কেউ সামান্য সাহায্য সহযোগিতা করলে তা দিয়েই কোনরকম চলছেন তিনি। তবে সরকারের কোন ভাতাদি পান না বলে জানিয়েছেন এই প্রবীণ।
ভাতা না পেয়ে সাচনা বাজার ইউনিয়নের পলক গ্রামের ৬৭ বছর বয়সী নিঃসন্তান গঙ্গা চন্দ্র বনিক বলেন, ‘আমার ছেলেমেয়ে নাই। বাজারের দোকানে দোকানে ধুনা দিয়া দু’এক টেকা পাইয়া কোনরকম চলি। কিন্তু আমারে কিচ্ছু দেওয়া হয় না।’
একই ইউনিয়নের হরিহরপুর (বাগহাঁটি) গ্রামের মৃত আব্দুন নূরের বিধবা স্ত্রী ফুলরাজ বেগম বলেন, ‘ছেলেরা বিয়া কইরা আলাদা হইয়া গেছে। হেমন্তকালে আমি ছোট্ট ছেলেডারে লইয়া গরুর পিছে রাখ্খালী করি। বর্ষাকালে পানি থাকায় কিচ্ছু করতে পারি না। স্বামী না থাকায় খুব কষ্ট কইরা চলতাছি। কেউ আমারে একটা ভাতার ব্যবস্থা কইরা দেইন।’
জেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা সুচিত্র রায় বলেন,‘প্রতিবন্ধীদের ভাতার আওতায় নিয়ে আসার কাজ শেষ পর্যায়ে। বিধাবাদের ক্ষেত্রে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম। বয়স্কদের ক্ষেত্রে কিছুটা অজ্ঞতা অর্থাৎ কোথায় গেলে ভাতার ব্যবস্থা হবে এটা না জানা, আবার সংশ্লিষ্টদের অবহেলাও আছে। আমরা এসব খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।

  • [১]