বড়গুপটিলা কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ছিল তাহিরপুরের সীমান্তবর্তী আদিবাসী সম্প্রদায়সহ বাঙালি শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের অন্যতম একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। খ্রিস্টান মিশনারী গারো ব্যাপ্টিস্ট কনভেনশন ১৯৬২ সনে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করে। ওই ব্যাপ্টিস্ট মিশনই ২০০৫ সন পর্যন্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন—ভাতা পরিশোধ করত। ২০০৫ সনের পর সানক্রেড নামক বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) বিদ্যালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করে। সানক্রেডের পরিচালনায় ২০২০ সন পর্যন্ত বিদ্যালয়টি পরিচালিত হয়। ২০২০ সনের মার্চ মাস থেকে সানক্রেড বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন দেয়া বন্ধ করে দেয়। সানক্রেডের বক্তব্য থেকে জানা যায়, তারা সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শিক্ষকদের বেতনের ব্যয়ভার বহন করত। প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা এখন বেতন দিতে পারছে না। সর্বশেষ বিদ্যালয়ে ৪ জন শিক্ষক কর্মরত ছিলেন এবং তাদের প্রত্যেককে মাসে ৩ হাজার টাকা করে বেতন দেয়া হত। ২০২০ সনে যখন বিদ্যালয় বন্ধ হয় তখন শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ২৫০ জন। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে আরও জানা যায়, বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে পড়ায় সীমান্তবর্তী বড়গোপ, মাঝের টিলা, আনন্দপুর, মাহারামটিলা (বারিক্যা টিলা) ও আশ্রয় কেন্দ্র এলাকার শিশু শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুবিধাটি সংকুচিত হয়েছে। একটি পুরনো বিদ্যালয়ের এমন অপমৃত্যু কখনও কাম্য হতে পারে না।
মাত্র ৩ হাজার টাকা মাসিক বেতনের বিনিময়ে এখনও শিক্ষকরা কাজ করেন এটা ভাবা যায় না। ভাবা না গেলেও এমন সামান্য বেতনেই বিদ্যালয়টির শিক্ষা দান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন ৪ শিক্ষক। সানক্রেড একটি প্রতিষ্ঠিত এনজিও। তারা আদিবাসী সম্প্রদায়ের আর্থ—সামাজিক সমস্যার উন্নতিকল্পে কাজ করে থাকেন বলে আমরা জানি। একটি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও ৪ জন শিক্ষকের বেতনের বিকল্প ব্যবস্থা করা তাদের জন্য কঠিন কাজ বলে আমাদের মনে হয় না। করোনার কারণে গত ২ বছরের অধিককাল যাবৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। আগামী ২ মার্চ থেকে সরকার সবগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলে দিচ্ছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলোÑ এসময় বড়গোপটিলা কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বন্ধই থাকবে। অথচ শিক্ষা দান করার মত অবকাঠামো এবং অন্যান্য সামগ্রী ও সুযোগ—সুবিধা প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে। শুধুমাত্র কয়েকজন শিক্ষকের সামান্য পরিমাণ বেতনের বন্দোবস্ত করলেই সমস্যাটি মিটে যায়। আমরা মনে করি এই বিদ্যালয়টি যাতে বন্ধ না হয় সেজন্য দ্রুত স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। এজন্য সানক্রেড বা অন্য এনজিও’র সাথে দ্রুত যোগাযোগ করে শিক্ষক বেতনের বিষয়টি সুরাহা করতে হবে। এর সমাধান প্রক্রিয়া জটিল বা দীর্ঘমেয়াদী হলে আপাতত উপজেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল থেকে ৪ শিক্ষকের আগের হারে বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। উপজেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিলের অবস্থা এত খারাপ নয় যে তারা একটি এলাকার প্রাথমিক শিক্ষার জন্য মাসে ১২ হাজার টাকা খরচ করতে পারবেন না।
বন্ধ হয়ে যাওয়া ওই বিদ্যালয়টির শিক্ষা দান কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার বিষয়ে আমরা সানক্রেডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, উত্তর বড়দল ইউনিয়ন পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও তাহিরপুরের উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। মাসে ১২ হাজার টাকা খরচ করার অপারগতার জন্য একটি সক্ষম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অপমৃত্যু আমরা দেখতে চাই না। সীমান্তবর্তী অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের শিক্ষা গ্রহণের সর্বজনীন অধিকার নিশ্চিত করণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উপযুক্ত পদক্ষেপ আমরা কামনা করি। মনে রাখতে হবে সুযোগের অভাব ঘটিয়ে শিক্ষা গ্রহণের অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করে রাখা একেবারেই অনুচিত কাজ।