বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কবির বিন আনোয়ার বলেছেন, ‘‘বাঁধের কাজে কিছু অনিয়ম, গাফিলতি আছে।… মন্ত্রণালয়ের কমিটি কাজ করছে। গোয়েন্দাসংস্থাও খোঁজ নিচ্ছে। সব খবর প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাচ্ছে। এবার রক্ষা নেই। বড় বড় কিছু নামও শোনা যাচ্ছে। যারাই যুক্ত, তাদের ধরা হবে। এবার সব হবে ওপেন, একটা হেস্তনেস্ত হবে, কাউকেই ছাড়া হবে না।’’ সচিব কর্তৃক চলমান বাঁধ নির্মাণ কাজে অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়টি স্বীকার করা একটি অগ্রগতি বটে। এটি স্বীকার করার পাশাপাশি তিনি যখন এর সাথে বড় বড় ব্যক্তির সম্পৃক্ততার বিষয়ে ইঙ্গিত দেন তখন সেই কথা আরও অর্থবহ হয় বটে। জেলাবাসী মাত্রই জানেন বাঁধ নির্মাণের ঠিকাদারি প্রথায় আসলে কী হয়। এখানে মূলত পুকুর চুরি ঘটে। আর কে না জানে সংগঠিত কোন দুর্নীতিই বড় হাতের সংযোগ ছাড়া ঘটতে পারে না। বিচ্ছিন্নভাবে ছিঁচকে চুরি করা যেতে পারে কিন্তু পুকুর চুরি করতে হলে অবশ্যই পিছনে খঁুটির জোর লাগে। ছাগল নাচে খঁুটির জোরে বলে বাংলা প্রবাদবাক্য এমনি এমনি তৈরি হয়নি। দুর্নীতির নিয়মই এমন। এখানে যেকোন পর্যায়ের দুর্নীতির পিছনে শিকলের মতো লম্বা লাইনের বিভিন্ন জায়গায় নানা ব্যক্তির অবস্থান থাকে। একেবারে গোড়ার ব্যক্তিটিকে সবাই চিনে কারণ সে সরাসরি মানুষের সামনে দৃশ্যমান থাকে। কিন্তু ওই গোড়ার ব্যক্তিটি চুরির ভাগের খুব সামান্য অংশই পেয়ে থাকে। অদৃশ্যমান শক্তিশালী বড় ব্যক্তিরাই সিংহভাগ উদরস্ত করেন। শুধু বাঁধ নয় যেকোনো দুর্নীতির ক্ষেত্রেই এই সাধারণ নিয়মটি প্রয়োজ্য। বাঁধের কাজে দুর্নীতির ক্ষেত্রে ওই পিছনের ব্যক্তিদের একটি ছোট্ট তালিকা দিয়েছেন ধর্মপাশার চন্দ্রসোনার থাল হাওরে আব্দুল মালেক নামের জনৈক ক্ষুব্ধ কৃষক। তিনি পানিসম্পদ উপমন্ত্রীর নিকট স্থানীয় কিছু নেতার নাম উল্লেখ করে এরা এক লক্ষ টাকা করে পিআইসি বিক্রি করেছেন বলে সরাসরি অভিযোগ করেছেন। দুর্নীতির সম্পর্ক না থাকলে দোয়ারাবাজারের সাত পিআইসি এক ব্যক্তি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হতে পারত না, তাহিরপুরে তিন সহোদরের নামে তিন পিআইসি থাকত না। শাল্লায় জানুয়ারি মাসেই তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানরা পিআইসি গঠনে অনিয়মের লিখিত অভিযোগ এনেছিলেন। সংবাদপত্রগুলোও বিভিন্নভাবে এই সত্য প্রকাশ করে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। প্রশাসন নির্বিকার ছিলেন যাবতীয় অভিযোগ বিষয়ে।
আমাদের সমাজের সাধারণ বৈশিষ্ট্য অনুসারে আমরা বুঝতে পারি, অনেক ক্ষেত্রে পিআইসি না পেয়েও বিরাগবশত অনেকে অভিযোগ আনেন। সুবিধাভোগীদের মধ্যেও দ্বন্দ্ব থাকে। এগুলো প্রকাশিত হয়ে পড়ে মাঝে—মধ্যে। কিন্তু এর ফলে মূল সত্য আড়াল করার কোন সুযোগ নেই। কারণ হাওরের পাড়ে পাড়ে নিরবে খোঁজ নিলে সকলেই বাঁধ দুর্নীতির নানা কায়দা—কানুনের কথা বলবেন। আমরা ঠিকাদারী প্রথাকে পিছনে ফেলে কৃষকদের অংশগ্রহণমূলক পিআইসি প্রথায় উত্তরণ ঘটিয়েছিলাম। কিন্তু এই উত্তরণটিকেও আজ প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। পিআইসি প্রথার উপর দুর্নীতির কলংক আরোপের পর কী? পিআইসি প্রথার বিলুপ্তি? এরকম কথা শোনা গিয়েছিল যেÑ পাউবো নাকি পিআইসি প্রথায় স্বাচ্চন্দ্য পায় না। তাদের সুবিধা ঠিকাদারী প্রথায়। এজন্য নানাভাবে পিআইসি প্রথাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুচতুর প্রয়াসের কথাটিও কোনো কোনো মহল থেকে উত্থাপন করা হয়। এই চাতুরিপনার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে। কোনোভাবেই পুনর্মুষিক ভব হয়ে কৃষকরা ঠিকাদারী প্রথায় ফিরে যেতে চায় না। তারা প্রচলিত পিআইসি প্রথার দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দৃশ্য দেখতে চায় এবং এই প্রথাকে দুর্নীতিমুক্ত অবস্থায় কৃষক—হাওরবাসীর অংশগ্রহণে স্বচ্ছ ও কার্যকর প্রক্রিয়া হিসাবেও দেখতে চায়। পিআইসি প্রথার উপর দুর্নীতিবাজদের আরোপিত কলংকচিহ্ন দেখিয়ে একে বিলুপ্ত করার যেকোনো প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধেই হাওরবাসী ঐক্যবদ্ধ।