- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

বদরুলের যাবজ্জীবন

সু.খবর ডেস্ক
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে আদালতের রায়ে বিচার পাওয়ার পর শুকরিয়া আদায় করেছেন সিলেটের কলেজছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিস। রায়ে খুশি হওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘ন্যায়বিচার পেয়েছি।’ দুপুরে খাদিজা যখন কথাগুলো বলছিলেন, তার চোখে-মুখে তখন স্বস্তির ছায়া। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে গতকাল বুধবার দুপুরে তার ওপর কাপুরুষোচিত হামলার মাধ্যমে হত্যাচেষ্টা মামলার রায় হয়। সিলেট মহানগর দায়রা জজ আকবর হোসেন মৃধা একমাত্র আসামি ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলমের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দেন। পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এ রায় হাজারো বদরুলের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বিচারক বেলা ১১টা ৩৫ মিনিট থেকে শুরু করে ৩০ পৃষ্ঠার রায় পড়ার পুরোটা সময় কাঠগড়ায় নির্লিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন বদরুল।
গতকাল সকাল ১০টায় কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবি) ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সহ-সম্পাদক বদরুলকে আদালতে আনা হয়। বেলা সোয়া ১১টার দিকে তাকে মহানগর দায়রা জজ আদালতের কাঠগড়ায় তোলা হয়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই বিচারক রায় পড়া শুরু করেন। বদরুলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। রায় ঘোষণার পর কারাগারে নেওয়ার সময় বদরুল চিৎকার করে বলতে থাকে_ ‘এটা আবেগি রায়।’ প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে নিয়ে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় বদরুল ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেয়।
সিলেটে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী (পিপি) মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এ রায় ঐতিহাসিক। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আদালতের এ রায়ে খাদিজা ন্যায়বিচার পেয়েছেন। তিনি বলেন, আদালত দণ্ডবিধির ৩২৪, ৩২৬ ও ৩০৭ ধারায় বদরুলকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেওয়া হয়েছে। আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে সর্বক্ষেত্রে সাফল্য ও অগ্রগতির পরও নারীরা অরক্ষিত এবং নির্যাতিত বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, আদালত এ মামলার সাক্ষীদের প্রশংসা করেছেন। প্রত্যেকে ঘটনাস্থলে সাহসী ভূমিকা পালনের পাশাপাশি আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে মামলার সুবিচার নিশ্চিতে সহযোগিতা করেছেন। চাঞ্চল্যকর এ মামলাটির বিচারকাজ মাত্র ৫ মাস ৫ দিনে শেষ হয়েছে বলে জানান মিসবাহ উদ্দিন। রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বদরুলের আইনজীবী মো. সাজ্জাদুর রহমান চৌধুরী বলেছেন, বদরুল সুবিচার পাননি। রায়ের কপি পর্যালোচনা করে উচ্চ আদালতে যাওয়ার
কথা চিন্তা করা হচ্ছে।
রায় ঘোষণার পর খাদিজার সিলেট সদর উপজেলার হাউশা গ্রামের বাসিন্দারা আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। অনেকেই ছুটে আসেন এ কলেজছাত্রীর বাড়িতে। সবাইকে খাদিজার পরিবারের পক্ষ থেকে মিষ্টিমুখ করানো হয়। মামলার বাদী ও খাদিজার চাচা আবদুল কুদ্দুস বলেন, সবার সহযোগিতায় বদরুলের যাবজ্জীবন কারাদ হয়েছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আইনের ফাঁকে যাতে এ রায় বদল না হয় সে জন্য সবার কাছে দাবি করছি। মেয়ে সুস্থ হয়ে গ্রামের বাড়িতে ফেরার পর খাদিজার বাবা মাসুক মিয়া আবার সৌদি আরব ফিরে যান। গ্রামের বাড়িতে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে খাদিজার মা মনোয়ারা বেগম রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। এ সময় খাদিজা সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী, আদালতসহ সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। সবার সহযোগিতায় ন্যায়বিচার পেয়েছি। এখন আবার লেখাপড়া শুরু করে জীবনকে নতুনভাবে গড়তে চাই। দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আপাতত ভালো আছি।
গত বছরের ৩ অক্টোবর নগরীর ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার পর খাদিজার ওপর অতর্কিত হামলা চালায় শাবি ছাত্র বদরুল। তার ধারালো চাপাতির আঘাতে গুরুতর আহত খাদিজাকে প্রথমে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই রাতেই আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। স্কয়ার হাসপাতাল ও সাভারের সিআরপিতে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি গ্রামের বাড়ি ফেরেন খাদিজা। খাদিজা সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের স্নাতক (পাস) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। ঘটনার পরই বদরুলকে আটক করে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে দেয় স্থানীয়রা।
গত ১ মার্চ মহানগর হাকিম আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন নির্ধারিত হলেও রাষ্ট্র ও বাদীপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সেদিনই মামলাটি মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়। গত ৫ মার্চ দায়রা জজ আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর বিচারক রায় ঘোষণার জন্য গতকালের দিন নির্ধারণ করেন। ওইদিন পিপি মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেছিলেন, নিম্ন আদালতে আসামি বদরুলকে পর্যাপ্ত সাজা দেওয়ার সুযোগ না থাকায় মামলাটি দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়।
শাবিতে ভর্তির পর বদরুল ২০১০ সালে খাদিজাদের বাড়িতে লজিং মাস্টার হিসেবে থাকত। সেই সময় থেকে বদরুল খাদিজাকে উত্ত্যক্ত করে আসছিল বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল। একপর্যায়ে বদরুলকে পিটুনি দিয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এই আক্রোশ থেকে বদরুল খাদিজাকে কুপিয়েছে বলে আদালতের রায়ে বলা হয়েছে। তবে আসামি পক্ষ থেকে হামলার সময় বদরুল ‘নেশাগ্রস্ত’ ছিল বলে যে দাবি করা হয়েছিল, তা খারিজ করে দেওয়া হয়। একইভাবে বিচারের একপর্যায়ে বদরুল তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ‘জোর করে আদায়’ করার দাবি করে তা প্রত্যাহারের আবেদন করলেও রায়ে বিচারক সাক্ষ্য-প্রমাণে তাও খারিজ করে দেন।

  • [১]