ঈদুল ফিতরের টানা ছয় দিনের বন্ধ শেষে আজ আবারও দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর পাঠকের হাতে পৌঁছল। এই ছয় দিনে বহু ঘটনা ঘটেছেÑ ভাল ও মন্দ; দুই ধরনেরই। অর্থবছর শেষ হওয়ায় গতকাল পাস হয়েছে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। ব্যাংক আমানতের উপর আবগারি শুল্ক আরোপের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে অর্থমন্ত্রী নমনীয় হয়েছেন। এক লক্ষ টাকার নীচে লেনদেন হওয়া সঞ্চয়ী হিসাবকে শুল্কমুক্ত রাখা হয়েছে। এক লাখ টাকার উপরের হিসাবগুলোতে ধাপে ধাপে শুল্কায়নের নতুন প্রস্তাবটি অগ্রহণযোগ্য নয়। তবে সঞ্চয়পত্রে সুদহার কমানোর সিদ্ধান্তটি মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য কষ্টের কারণ হবে নিঃসন্দেহে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের সংঘবদ্ধ চাপের কারণে অর্থমন্ত্রী নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা থেকে সরে এসেছেন। এই আইনটি আরও ২ বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। ক্রেতারা পণ্য বা সেবা ক্রয়ের সময় মূল্যের সাথে যে ভ্যাট পরিশোধ করেন ব্যবসায়ীরা সেই টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিবেন। এই সরল বিষয়টি বাস্তবায়নে ব্যবসায়ীদের এত গা জ্বালা কেন এবং এর ভিতরে কোন কারচুপি রয়েছে তার জটিল বিষয়-আশয় আমাদের স্বল্পবুদ্ধির মাথায় ঢুকছে না। তবে সরকার বুঝেছেন এই সময়ে ব্যবসায়ীদের খেপানো ঠিক হবে না। হাওরে ২০০ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ দেয়ার বিষয়টি পত্রিকান্তরে জানা গেল। এবারের ভয়াবহ ফসল হারানোর প্রেক্ষাপটে এই বরাদ্দ যাতে নতুন লুটপাটের খনি না হয়ে উঠে সেটি হচ্ছে বড় চ্যালেঞ্জ। সত্যিকার অর্থে এই টাকা হাওরের উন্নয়নে ব্যয়িত হলে হাওর সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথটি উন্মুক্ত হবে। যাহোক নতুন বাজেট দেশের ও মানুষের কল্যাণে যদি ন্যূনতম ভূমিকা রাখতে পারে তাহলেই বাজেটের স্বার্থকতা প্রমাণিত হবে।
এই ৬ দিনের টানা বন্ধে টাঙ্গুয়ার হাওরে একটি পরিব্রাজক দলের সদস্য সিলেট এমসি কলেজের ছাত্র আশরাফুল হাসান এর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে পানিতে ডুবে। বিভিন্ন পর্যটনস্পটে পানিতে ডুবে মারা যাওয়া পরিব্রাজকের সংখ্যা কেবল বাড়ছেই। বিশেষ করে সাঁতার না জানা ছেলে-মেয়েরা এই মর্মান্তিক ঘটনার শিকার হচ্ছে বেশি। টাঙ্গুয়ার হাওরে যে ছেলেটি মারা গেছে সে সুনামগঞ্জ শহরের হাজিপাড়ার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী চান মিয়ার সন্তান। ছেলের অকাল মৃত্যুতে এই পরিবারে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার। যে ছেলেকে ঘিরে পরিবারটি স্বপ্নের জাল বুনছিল এক মুহূর্তের প্রলয়তান্ডবে সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেল। আমরা তার মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত। তার শোকার্ত পরিবারের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা রইল। এই ঘটনায় পর্যটনস্পটগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়টি আবারও সকলের সামনে চলে আসল। এই স্পটগুলোতে কোথায় কোন ধরনের ঝুঁকি রয়েছে সেসব বিষয়ে প্রচারবোর্ড টানিয়ে রাখা উচিৎ। এছাড়া পর্যটকদের নানাভাবে উদ্বুদ্ধ ও সাবধান করাটাও সমান জরুরি। নদীমাতৃক বাংলাদেশে জলপথকে এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই। অসংখ্য নদী, খাল, হাওর, বাওর বেষ্টিত এই শ্যামল দেশ। জলই আমাদের প্রাণের মর্মকথা। সুতরাং আমাদের বাঁচতে হবে জলকে সাথে নিয়েই। আর এ কারণে জলে টিকে থাকার কৌশল রপ্ত করাটা সকলের অবশ্য দায়িত্ব। সাঁতার শিখা এই অবশ্য দায়িত্বের অন্যতম। আমাদের অভিভাবকদেরকে যেকোনভাবে সন্তানদের সাঁতার শিখাতে হবে। তাহলে জলপথের ঝুঁকি থেকে এরা কিছুটা হলেও মুক্ত থাকবে।
গুটিগুটি পায়ে ফসলহারানোর তিন মাস চলে যাচ্ছে। কষ্টের বার মাসের তিন মাস চলে যাওয়া মানে সামনে আরও নয় মাসের কষ্টযন্ত্রণা সহ্য করার বাস্তবতা। কোন কোন মহল থেকে সুচতুর কায়দায় হাওরের কান্না আনন্দে পরিণত হওয়ার ধারণা দেয়া হচ্ছে। এই প্রচারণায় হাওরের কষ্ট আরও ভারী হয়েছে। মানুষের কষ্টকে উপহাস করার মতো নির্মমতা আর কিছু হতে পারে না।