অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার জন্য পাগলপারা নেশায় আশক্ত যুবকদের জীবন খোয়ানোর বেদনাদায়ক অধ্যায়ের ইতি ঘটছেই না বরং বেড়ে চলেছে। শনিবারের দৈনিক সমকাল জানচ্ছে, লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে নরসিংদী জেলার ১৩ যুবকসহ ২৮ বাংলাদেশি নিখোঁজ হয়েছেন। এরমধ্যে আব্দুল নবী নামের এক যুবকের মরদেহের সন্ধান মিলেছে। এই যুবকরা দেশ ছেড়েছিলেন নিজের ভাগ্য বদলানো ও পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরানোর উদ্দেশ্য নিয়ে। সংশ্লিষ্ট যুবকদের পবিরার সর্বস্ব বিক্রি করে এদের জীবনের নিশ্চয়তা দিতে চেয়েছিলেন। এখন এরাই সবচাইতে গভীর অনিশ্চয়তা পড়ে গেছেন। কী নিদারুণ দুর্ভাগ্য। এরকম ঘটনা আখছারই ঘটতে শোনা যায়। সুনামগঞ্জের অনেক তরুণের এমন দুর্ভাগ্যের খবর মাঝেমধ্যেই প্রকাশ হতে দেখা যায়। এরকম খবরের পর আমরা সম্পাদকীয় মন্তব্য স্তম্ভে এই সর্বনাশা পথ থেকে সরে আসার জন্য আহ্বান জানই। কিন্তু সবই অরণ্যে রোদন হয় মাত্র। দেশে জীবিকার কোনো সুনিশ্চিত ব্যবস্থার সন্ধান না পেয়ে এরা নিজের জীবন নিয়ে জুয়া ধরে। যে জিতে সে হয়তো পৌঁছে যায় কাক্সিক্ষত গন্তব্যে। অবশিষ্টরা জীবন দিয়ে জীবনের দায় শোধ করে।
দেশে এখন সক্ষম তরুণ তরুণীর সংখ্যা বেশি। একে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলে আমরা আখ্যায়িত করি। কিন্তু এই বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দেশের ভিতর উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা আমরা করে দিতে পারিনি। তাই এই তরুণ জনগোষ্ঠী দলে দলে বিদেশ পাড়ি দিতে চায়। বৈধ অবৈধ পন্থা কোনো কিছুর ধার ধারছে না আগুণে ঝাঁপ দেয়ার জন্য তৈরি এই জনগোষ্ঠী। এই সুযোগে দেশের ভিতর গড়ে উঠেছে বিশাল এক মানবপাচারচক্র। এরা প্রলোভিত করে লোকজনকে। নিশ্চয়তার আশ^াস দেয়। স্বপ্ন দেখায় রঙিন ভবিষ্যতের। এই প্রলোভনে দিগ্ভ্রান্ত হয় সকলে। যখন বিদেশ গিয়ে প্রতারণার শিকার হয় তখন ওই মানবপাচারচক্র থাকে বেশ ঝুঁকিমুক্ত অবস্থায়। এদের হাত অনেক লম্বা। এদের গিঁট খোলার সাধ্য কারও নেই। ফলে এই প্রতারণার রাজত্ব বন্ধ হয় না। কেউ মারা পড়লে, সাগরে সলিল সমাধি ঘটলে কিংবা অন্যভাবে প্রতারিত হলে ভুক্তভোগীর পরিবার ভিন্ন আর কোথাও এই দুর্ঘটনাগুলো আলোড়ন তুলতে পারে না। যে দালালচক্র এদের জীবনের সর্বনাশ ঘটিয়েছে তাদের শায়েস্তা করতে অনিচ্ছুক থাকে প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে এরা বেপরোয়া, অপ্রতিরোধ্য এবং সাংঘাতিকভাবে বিরাজমান থাকে।
সকলের সচেতন হওয়ার সময় এসেছে। এরকম অনিশ্চিত পথে কেউ সন্তানদের বিদেশ পাঠাবেন না। বিদেশ যাওয়ার বহু বৈধ পথ আছে। সেই পথগুলো অনুসরণ করুন। অযথা দালালদের মিষ্টি কথায় ভুলে সন্তানের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলবেন না। প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। এদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রাগুলোই আমাদের রিজার্ভের মূল উৎস। এই উৎসকে যতœ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দেশের ভিতর যে কুচক্রী বেনিয়াগোষ্ঠী প্রতারণার জাল বিছিয়ে রয়েছে দয়া করে তাদের সমূলে উৎপাটন করুন, সাজা দিন। তাহলে নিরীহ মানুষ অগ্নিকু-ে নিক্ষিপ্ত হওয়ার হাত থেকে বাঁচে। বিদেশ গিয়ে জীবন হারানো পরিবারগুলোর আজীবনের কষ্ট-দুঃখ-বেদনাকে অনুধাবন করার চেষ্টা করুন। দেশের ভিতর কারা মানব পাচার চক্রের মাথা তার ঠিকুজি রাষ্ট্রের অজানা থাকার কথা নয়। রাষ্ট্রের হাতের চাইতে লম্বা হাত আর কোনো কিছুর হতে পারে না, হতে নেই। হলে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব হুমকিগ্রস্ত হয়। আমরা কি সেরকম অস্তিত্বসংকটে থাকা রাষ্ট্রিয় কাঠামোর মধ্যে আছি? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা ভীষণ জরুরি। কারণ সকল ক্ষেত্রে এখন যেরকম অনিয়মের রাজত্ব চলছে তখন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব খোঁজার প্রয়াস করা জরুরি বৈকি। সর্বশেষে একটাই কামনা, সাগরে পড়ে মারা যাওয়ার হারিয়ে যাওয়ার এই আত্মঘাতী নিষ্ক্রমণ বন্ধ হোক।