এবারের তিন দফা বন্যায় জেলায় সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত খাতের নাম হলো সড়ক। জেলা-উপজেলা, উপজেলা-ইউনিয়ন ও গ্রামীণ রাস্তার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে উপর্যপুরি বন্যার কারণে। কী পরিমাণ সড়কের ক্ষতি হয়েছে, ক্ষতির ধরণ ও মেরামতে কত টাকা ব্যয় হতে পারে তার পুংখানুপুঙ্খ হিসাব এখনও সওজ, এলজিইডি, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলো শেষ না করতে পারলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যে বিশাল তা মানুষের মুখে মুখে প্রচারিত তথ্য থেকেই বুঝা যায়। উপজেলা ও গ্রামীণ সড়কের একটি বড় অংশ বন্যার পানিতে একাধিকবার ডুবেছে। এতে সড়কের কিনারা ভেঙেছে, বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, সড়কের মাটি সরে গেছে, ঢালাই ভেঙেছে, বিটুমিন উঠে গেছে। বন্যা হলে সড়কের ক্ষতি হয় এটা সবার জানা। জেলা শহরের এমন কোনো রাস্তা নেই যার বড় আকারের ক্ষতি হয়নি। শহরের খুব অল্প পরিমাণ রাস্তা ছাড়া সবগুলো রাস্তাই তিন তিনবার জলমগ্ন হয়। সড়কগুলোর উপর দিয়ে রীতিমতো নৌকা চলেছে কয়েকদিন। এখন পানি সরে গিয়ে রাস্তার কঙ্কাল বেরিয়ে এসেছে। সড়কগুলো অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভ্যন্তরীণ ও আন্ত উপজেলা-ইউনিয়ন রাস্তার অনেকগুলোতেই এখন যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকায় বিভিন্ন স্থানে জিনিসপত্রের দাম বাড়াসহ সরবরাহ ঘাটতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। সড়ককেন্দ্রীক দুর্ভোগ কমানোর জন্য তাই জরুরিভিত্তিতে সড়কগুলোকে চলাচলের উপযোগী করার কাজে হাত দিতে হবে।
আমরা জানি বিশাল পরিমাণের ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামতে সময় লাগবে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপন, প্রাক্কলন তৈরি, অনুমোদন, ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পাদন ও কাজ করা; এর সবগুলো ধাপই সময়সাপেক্ষ। এতদিন অপেক্ষা করতে হলে মানুষের বারোটা বেজে যাবে। তাই এডহক বেসিসে দ্রুত কিছু কাজ এখনই শুরু করতে হবে। প্রতিটি সংস্থারই আপৎকালীন কিছু তহবিল থাকে। আবার জরুরি কাজ সম্পাদনের কিছু বিশেষ ক্ষমতাও দেয়া আছে। এই সুযোগ ব্যবহার করে যেসব রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলোর জরুরি সংস্কার করা দরকার। ভাঙা স্থানে বালি, মাটি ও ইটের সুরকি ফেলে লেভেল করে দিতে হবে যাতে কোনমতে যানবাহনগুলো চলাচল করতে পারে। আমরা আশা করি সপ্তাহখানেকের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই সাময়িক ব্যবস্থাগুলো শেষ করতে সক্ষম হবেন। আশার কথা হলো এই, ইতোমধ্যে কিছু সড়কে এমন সাময়িক মেরামত কাজ শুরু হয়েছে বলে আমরা দেখতে পেয়েছি। তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে এই কাজে আরেকটু গতি সঞ্চার ও পরিধি বাড়ানোর দাবি জানাই।
স্থায়ী কাজ শুরু করার আগে ভাবতে হবে সড়কগুলো যাতে বন্যায় তলিয়ে না যায়। বিটুমিনের সড়কে পানি উঠলেই সর্বনাশ। তাই রাস্তাগুলো উঁচু করতে হবে। রাস্তার কিনার যাতে না ভাঙে এজন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ঢাল রাখা ও রাস্তার পাশে প্রচুর বৃক্ষ রোপণ করতে হবে। হাওরাঞ্চলের রাস্তা ভাঙার প্রধান কারণ প্রমত্তা হাওরের বিশাল বিশাল ঢেউ। অধিকমাত্রায়, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে আমাদের হাওরগুলোর পরিবেশগত বিপর্যয় তথা প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে পড়েছে। এখন হাওরে কোন বনবাদাল, চাইল্যা, নলখাগড়া বা গুল্মলতা দেখা যায় না। ফলে ঢেউয়ের আঘাত সামলানোর মত প্রাকৃতিক কোনো রক্ষাকবচ হাওরে নেই। এজন্যই সড়কের কিনারে অধিকমাত্রায় হিজল করস জাতীয় গাছ লাগানো প্রয়োজন।
উপরে যে কথাগুলো বলা হলো তা বাস্তবায়ন করা খুব কঠিন নয়। সদিচ্ছা থাকলেই সম্ভব। সড়ক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলো জনস্বার্থে এই কাজগুলো দ্রুততার সাথে করবেন এ কথা আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে চাই।