সোহানুর রহমান সোহান
হাওরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে নড়বড়ে মাটির ঘর। ঘরের চালে রোদে দেয়া হয়েছে পড়নের ছেঁড়া শাড়ি, লুঙ্গি আর বাচ্চাদের কাপড়। উঠোনে রশিতে ঝুলছে কয়েকটি ছেড়া কাঁথা। এই কাঁথা দিয়ে ৭ সন্তান নিয়ে কনকনে শীতের রাত পার করে ফাতেমা। কাঁথার এমন দুরবস্থা যে, ছেঁড়ার আর কোন জায়গাই নেই কাঁথাতে। ঘরের ভেতরে গিয়ে দেখা গেলো আরও করুণ দশা। কাপড় চোপড়, আসবাবপত্র সবই ব্যবহার অনুপযোগী। এসব কাঁথা দিয়েই এবারের শীত কাটাতে হচ্ছে ফাতেমার মতো হাওরের সংগ্রামী মানুষদের।
ফাতেমা আক্তার (৩০) সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গোয়ারচর গ্রামের দিনমজুর আলতাব আলীর স্ত্রী। ২ ছেলে আর ৫ মেয়ে নিয়ে ফাতেমার পরিবার। ছেঁড়া কাঁথাই এখন তাদের শীত নিবারণের একমাত্র ভরসা।
ফাতেমা বেগম বললেন, নতুন বছর এসেছে আমাদের কোনো আউশ রঙ নাই, মনের মাঝে ফুর্তি নাই। বাচ্চারে কিভাবে খাওয়াবো, কিভাবে পড়াবো চিন্তা থাকে। এই যে শীত আসছে, ফাড়া ছেঁড়া কাঁথা আর কাপড় পড়ে থাকছি। একটা কোলের শিশু নিয়ে খুব কষ্টে আছি। বন্যায় আমার কাঁথা-বালিশ, গরু-ছাগল সব নিয়ে গেছে।
গত বছরের জুন মাসে ভয়াবহ বন্যায় প্লাবিত হয় পুরো জেলা। জেলার ১২টি উপজেলার প্রায় সবকটি গ্রাম প্লাবিত হয় বন্যার পানিতে। বন্যা কবলিত হয়ে পানিবন্দি ছিলেন অর্ধলক্ষাধিক পরিবারের কয়েক লাখ মানুষ। প্রাণ বাঁচাতে মানুষ আশপাশের উঁচু স্থাপনায় আশ্রয় নেয়। কোনোমতে প্রাণ বাঁচাতে পারলেও পানিতে ঘরবাড়ি তলিয়ে ভেসে যায় গৃহস্থালী জিনিসপত্র। নষ্ট হয়ে যায় ঘরে থাকা লেপ-তোষক, বালিশ ও শীতবস্ত্র।
এদিকে নতুন বছরের সাথে সাথে সুনামগঞ্জে জেঁকে বসেছে শীত। লেপ-তোষক হারিয়ে হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় ভোগছেন হাওরপাড়ের মানুষেরা। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের কৃষি ও শ্রমজীবী পরিবারের লোকজন অর্থাভাবে শীতবস্ত্র কিনতে না পেরে ছেঁড়া কাপড়ের কাঁথা দিয়ে কোনোমতে শীত নিবারণ করছেন। অন্যান্য সময়ের চেয়ে এবার শীতের কষ্টটা একটু বেশি অনুভব হবে বলে জানান শীতার্তরা। শীতের প্রকোপ কাটাতে ঢালাওভাবে শীতবস্ত্র বিতরণের তাগিদ দিয়েছেন তারা। তবে চাহিদার তুলনায় সরকারি শীতবস্ত্র অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বন্যাক্রান্ত জেলা হওয়ায় আরও বরাদ্দ বাড়াতে চিঠি দেয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়।
গোয়ারচড় গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ বিধবা গুলফর বিবি বলেন, বন্যায় আমার কাপড় চোপড় ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। সাথে আমার ঘরও গেছে। এখন মানুষের বাড়িতে আশ্রয়ে থাকি। তারা খাবার দিলে খাই, কাপড় দিলে পড়ি। শীতে খুব কষ্ট পাচ্ছি।
একই গ্রামের ইলিয়াস আহমেদ বলেন, বন্যায় আমার গ্রামের সবার ঘর প্লাবিত হয়েছে। পানিতে সবার আসবাপত্র, কাপড়-চোপড় নষ্ট হয়েছে। এখন আমাদের গ্রামের মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শীতের কাপড়। তাহলে এই গ্রামের মানুষ শীতে একটু আরামে থাকতে পারবে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফীকুল ইসলাম বললেন, শতবছরের ভয়াবহ বন্যায় সুনামগঞ্জ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই সাথে শীতবস্ত্র নষ্ট হয়ে যায়। আমরা একাধিক পত্র প্রেরণ করেছি অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়ার জন্য।
জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী বলেন, গত বছর শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় মানুষের শীতবস্ত্র নষ্ট হয়েছে। ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে ৪৫ হাজার শীতবস্ত্র পেয়েছি। সেগুলো উপজেলায় বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আমরা ইতিমধ্যে চিঠি লিখেছি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যাতে বাস্তবতা বিবেচনা করে আরও শীতবস্ত্র পাঠানো হয়। বরাদ্দ পাওয়ার সাথে সাথে সেগুলো বিতরণ করা হবে। এছাড়াও শীতার্ত মানুষের শীত নিবারণে যারা বিত্তবান আছেন তাদের এগিয়ে আসার আহবান করছি।