গুমরোমুখো আষাঢ়ের ক্রন্দন থামছেই না। সেই যে জ্যৈষ্ঠের শেষে শুরু হয়েছিলো অঝোর ক্রন্দন তা এখনও অব্যাহত আছে। কবে থামবে কেউ জানি না। গতবছরের ভয়াল বন্য সুনামগঞ্জের মানুষের মনোজগতে যে ভয় ঢুকিয়ে গিয়েছিলো সেই ট্রমা থেকে এখনও কেউ বেরিয়ে আসতে পারেনি। ফলে এই টানা বর্ষণের কারণে মানুষ শঙ্কা নিয়ে দিন পার করছে। এবার বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রত্যাশিত বৃষ্টি হয়নি। ফলে হাওরগুলো থেকে গিয়েছিলো শুকনো। ফলে চলমান অতি বৃষ্টিপাতের পানি নেমে যাওয়ার জায়গা পেয়ে যাচ্ছে বলে জনপদগুলোতে এখনও বন্যার থাবা মেলতে পারেনি। বিভিন্ন হাওরে এখনও অনেক জায়গা রয়েছে পানি ধারণ করার। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত এক সংবাদ থেকে জানা যায়, শাল্লার ছায়ার হাওরে বেশ কয়েকটি বাঁধ কেটে দেয়া হয়েছে পানি নামার জন্য। এরকম অবস্থা আরও কিছু হাওরের। এবারের বিলম্বিত বর্ষা হাওরের প্রাণ-প্রকৃতির জন্য নেতিবাচক। মাছ বংশ বিস্তার তথা পোনা ছাড়ার জন্য এবার যথেষ্ট সময় পায়নি হাওরে পানি না থাকায়। ফলে এবার মাছের উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কা করা হচ্ছে। অকাল ও বিলম্বিত বন্যা বা বর্ষা উভয়েই আমাদের প্রকৃতি পরিবেশের জন্য ক্ষতির কারণ। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের যে প্রতিক্রিয়া সেটি আমরা হাওরবাসী সরাসরি টের পাচ্ছি। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে রয়েছে মনুষ্যসৃষ্ট প্রকৃতি বিধ্বংসী তৎপরতা। এই যে, নদীতে প্রচুর পানি কিন্তু হাওর শুকনো এর পিছনেও আমাদের অপরিনামদর্শী কর্মকা-ের সম্পর্ক রয়েছে। হাওরগুলোতে ফসলরক্ষা বাঁধ দেয়ার নামে এখন যেভাবে মাটির পাহাড় বানিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে তাতে নষ্ট হয় পড়েছে হাওরের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। হাওরে নির্মিত এইসব ফসলরক্ষা বাঁধ অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের বিরুদ্ধে অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে বারবার।
বর্ষা আছে কি নেই এই বিতর্কের পিছনে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে চলেছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও প্রকৃতি ধ্বংসকারী কর্মকা- তার বিরুদ্ধে সরব হওয়া উচিৎ সকলের। বন্যা মানে মানুষের জীবনে বিপর্যয় তৈরি করার মতো পানির আগ্রাসন। সেটি পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতার অভাবে অল্প বর্ষায়ও হতে পারে। যেমন সুনামগঞ্জ শহরের বেশ কিছু এলাকা অল্প বৃষ্টিপাতেই জলাবদ্ধতার শিকার হযে যায়। বর্ষা, বন্যা ছাড়াও এই উপদ্রব মানুষের জীবনকে অতীষ্ট করে তোলতে সক্ষম। এই হাওর নিজের বৈশিষ্ট্য ও সম্ভাবনা নিয়ে টিকে থাকতে পারবে কিনা তাই এখন বড় প্রশ্ন। হাওরের যে সম্ভাবনা তার কিয়দংশও ব্যবহৃত হয়নি। বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে হাওরের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বহু সুযোগ রয়েছে। এজন্য চাই হাওরের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুণœ রাখা। এ লক্ষে সকল সচেতন মহলের কণ্ঠ উচ্চকিত হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ভূখ-টি প্রকৃতির আশীর্বাদ স্বরূপ অনেক প্রাচুর্য নিয়ে গড়ে উঠেছে। আমরা এই প্রকৃতির উপহারকে রক্ষা করতে পারছি না। বাইরের পরামর্শে হাজার বছরের লোক-অভিজ্ঞতাকে অবজ্ঞা করে চলেছি। খামারের মাছকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে গিয়ে নষ্ট করে ফেলছি দেশীয় মাছের বিপুল ঐশ্বর্যকে। ধানবীজ থেকে আমাদের কৃষকরা হয়ে গেছেন অধিকার হারা। কৃষিক্ষেত্র চলে গেছে সর্বতোভাবে কর্পোরেট পুুঁজির মুনাফালোভী বিশাল মুখের ভিতরে। উৎপাদিত কৃষিসামগ্রীও এখন কর্পোরেট বাণিজ্য উপকরণ। ফলে কৃষক যে জিনিসের ন্যায্যমূল্য পায় না সেই জিনিসই ভোক্তাকে কিনতে হচ্ছে গলাকাটা দামে। কৃষির এই লুপ্ত স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনাও সময়ের অন্যতম দাবি হওয়া উচিৎ।
মানুষের বন্যাতঙ্কের পিছনে কাজ করছে গতবারের ভয়াল স্মৃতি। এই মানসিক ভীতি দূর করা কঠিন। কঠিন এ কারণেই যে মানুষ প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় দেখছে না কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি বা বদলে দেয়ার প্রচেষ্টা। সুতরাং কথার ফুলঝুরি দিয়ে এই ভয় তাড়ানোর পরিবর্তে দরকার ব্যাপক প্রকৃতিবান্ধব কর্মযজ্ঞ।