বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকার বৃহদংশ সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। হাওরের বাকি অংশ সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মনবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ জেলায় অবস্থিত। হাওরাঞ্চল ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা প্রভৃতি রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা। পাহাড়ের পাদদেশে নি¤œভূমির এই হাওরাঞ্চলের মাটি অতিশয় উর্বর। হাওরাঞ্চলের গভীর নি¤œ এলাকায় রয়েছে বহু বিল যা মিঠা পানির মাছের সুবৃহৎ আধার। ধান ও মাছের কারণে হাওরাঞ্চল বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিকভাব পাহাড়ের নিকটবর্তী হওয়ায় উজান থেকে নেমে আসা বৃষ্টির পানি এই হাওরাঞ্চলের উপর দিয়ে খাল, নদী, নালা হয়ে সাগরে পতিত হয়। জলবায়ুর বৈশ্বিক পরিবর্তন, পানি নামার নদী-নালা-খাল ভরাট হয়ে পানি প্রবাহের পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়া, হাওরে অপরিকল্পিত বাঁধ ও সড়ক নির্মাণ করে পানির প্রাকৃতিক প্রবাহকে বাধা দান, অতিবৃষ্টি প্রভৃতি কারণে হাওরাঞ্চল অতিশয় বন্যা ঝুঁকিপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। এবার এমন বন্যার ভয়াল রূপ দেখা গেছে। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ জেলায় এর ধ্বংসক্ষমতা ছিলো আগের অন্তত এক শ’ বছরের মধ্যে সবচাইতে বেশি। এবারের ভয়াল বন্যা ছাড়াও প্রতিবছরই ছোট ও মাঝারী আকারের বন্যা হয় হাওর এলাকায়। হাওরের প্রধান ফসল বোরো। এপ্রিল মাস বোরো ধান কাটার সময়। আর এ সময় আগাম আকষ্মিক বন্যায় কয়েক বছর পরপরই সোনাফলা মাঠভর্তি বোর ধান তলিয়ে যায়। অস্থায়ী বাঁধ আকষ্মিক ঢল মোকাবিলায় অকার্যকর বলে প্রমাণিত হচ্ছে। অবশ্য এর পিছনে দুর্নীতি একটি বড় কারণ।
৮ জেলায় বিস্তৃত বিশাল হাওরাঞ্চলের বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধানকল্পে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) নামের একটি সংগঠন পরিকল্পিত আন্দোলন কর্মসূচী গ্রহণ করতে যাচ্ছে বলে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়। বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের আকাক্সক্ষা হাওরাঞ্চলের প্রতিটি মানুষের মনের কথা। তাই যখন কেউ এ কথা বলেন তখন মানুষের বুকে আশার সঞ্চার ঘটে। হাওরের জীবন ও অর্থনীতি রক্ষার এমন উদ্যোগ যদি পরিকল্পনামাফিক অগ্রসর করা যায় তাহলে দীর্ঘমেয়াদে অকাল ও প্রলয়ংকরী বন্যায় ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। তবে এরূপ একটি আকাক্সক্ষা কেবল আবেগ দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এজন্য দরকার ব্যাপকভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ, বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ, সমাধানের উপায় খোঁজা প্রভৃতি। রাস্তায় মানববন্ধন করে, কর্তৃপক্ষকে স্মারকলিপি দিয়ে, সভা-সমাবেশ করে জনমত গঠন করা যেতে পারে। তবে এর পাশাপাশি বন্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাজির করতে হবে। জনগণকে বুঝাতে হবে এই প্রক্রিয়া। সরকার ও নীতিনির্ধারকদের উপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। জনমতের তীব্রতার কারণে সরকার উপযুক্ত সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নে বাধ্য হবে।
এনডিএফ যে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, একটি রাজনৈতিক দল হলেও, আঞ্চলিক আকাক্সক্ষার ব্যাপকতার কারণে এই উদ্যোগটি বহুলভাবে সমর্থিত হবে বলে আশা করা যায়। সংগঠনটিকে গণমানুষের এই আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে অবিচল আস্থার সাথে কাজ করে যেতে হবে। জনপ্রিয় দাবিকে ব্যবহার করে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা করলে আখেরে জনগণ মুখ ফিরিয়ে নিবে। এই কঠিন সত্য সংগঠনটিকে বুঝতে হবে। প্রকৃতিকে বারবার নানাভাবে উত্যক্ত করা হলে, প্রকৃতির স্বাভাবিক স্বভাব-চরিত্রকে আমূল পালটে দেয়ার চেষ্টা হলে প্রকৃতি একসময় বিধ্বংসী হয়ে উঠে। সারা পৃথিবী ব্যাপীই আজ জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিচ্ছে। মূলত এর পিছনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই মূল কারণ। তাই মানুষ ও প্রকৃতি বিধ্বংসী রাজনীতি ও অর্থনীতি পরিবর্তন করে গণমুখী ও প্রকৃতিবান্ধব রাজনীতি-অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার কাজও বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হওয়ার পূর্বশর্ত।