সোহেল তালুকদার, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ
ফসলরক্ষা বাঁধের নির্মাণ কাজ শুরু ১৫ ডিসেম্বর থেকে। নীতিমালা অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারি বাঁধের কাজ শেষ করার কথা। কিন্তু দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় এখনো অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) কাজ শুরু করতে পারেনি। এই কারণে কৃষকেরা জমির ফসল উত্তোলন নিয়ে পড়েছেন দুশ্চিন্তায়।
চলতি বছরের প্রথম দিকে পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের কাউয়াজুরী হাওরে ৫টি পিআইসি’র অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৮৪ লক্ষ ৯৩ হাজার টাকা। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে একই কাজের জন্য আরও ১২টি পিআইসি অনুমোদন করানো হয়। গত বুধবার ১২টি পিআইসি’র কমিটি গঠন হয়েছে। ১৭টি পিআইসিতে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা। এই হাওরের বাঁধ নির্মাণে এবার বরাদ্দ বেড়েছে ২ কোটি ৫০ লাখ ৭ হাজার টাকা।
হাওরের একাধিক কৃষক বলছেন, এই হাওরে গত ২ বছর ধরে বাঁধে নামেমাত্র কাজ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। হাওর এলাকা দুর্গম হওয়ায় কেউ যেতে চান না তদারকি করতে। এই হাওরে বেড়িবাঁধ নির্মাণ খাতা-কলমে দেখানো হচ্ছে প্রতি বছর। গত ২ বছর ধরে হাওরে বৈশাখ মাস পর্যন্ত মাটি কাটার মেশিন (এস্কেভেটর) রাখা হয়। যাতে করে মনিটরিং কমিটি বা অন্য কেউ আসলে দুর থেকে দেখতে পান হাওরে কাজ চলছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃপক্ষ বলেছে, এই হাওরে গত ২ বছর ধরে বেড়ি বাঁধের কাজ হচ্ছে। চলতি অর্থ বছরে এই হাওরে ৫টি পিআইসি নিলেও পরে ডিজাইন পরিবর্তন করে ১৭টি করা হয়েছে। কাজের দৈর্ঘ্য আগের মতই রয়েছে, শুধু কাজের উচ্চতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই জন্য বরাদ্দও বেড়েছে।
জানা যায়, ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ৪৯টি প্রকল্পে প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও কাউয়াজুরী হাওরে কোন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। তবে ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে প্রথম, ২০১৯-২০২০ ২য় বারের মতো এখানে ৭টি প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ১ কোটি ৫৮ লক্ষ ৩১ হাজার ২০৪ টাকা। ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে প্রথম দফায় এই হাওরে ৫টি প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয় ৮৪ লক্ষ ৯৩ হাজার টাকা। কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসের ১০-১১ তারিখে নতুন করে আরো ১২টি প্রকল্পসহ মোট ১৭টি প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ৩ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা। কাজের মোট দৈর্ঘ্য ১১ হাজার ৩শ’ মিটার।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, হাওরের কোথাও কোনো পিআইসি’র সাইনবোর্ড নেই। বেড়িবাঁধ নির্মাণে দৃশ্যমান কোনো আলামত নেই। কোনো কোনো বেড়িবাঁধের উপর ড্রেসিং করে বাঁধ নির্মাণ দেখানো হয়েছে। মৌখলা গ্রামের পাশে একটি মাটি কাটার মেশিন (এস্কেভেটর) রাখা আছে। ওই এস্কেভেটর মেশিন দিয়ে সামান্য কাজ করা হয়েছে বেড়িবাঁধের উপর।
এ সময় ছাতল বিল এলাকায় কর্মরত কৃষক সঞ্চয় দেবনাথ জানান, এই হাওরে তাঁর অনেক জমি আছে। প্রতিবছর হাওরে সামান্য পরিমাণে বাঁধের কাজ হয়। পুরাতন বেড়িবাঁধের উপর সামান্য মাটি ফেলা হয়। দায়িত্বশীল কেউ আসতে দেখা যায়নি।
কথা হয় কৃষক শির জামালের সাথে। তিনি জানান, এই হাওরে আমার জমি আছে। ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে সরকার মোটা অংকের বরাদ্দ দেন। কিন্তু কাজ হয় না। প্রতি বছর নামেমাত্র কাজ হয় হাওরের বেড়িবাঁধে।
হাওরের কৃষক অরুন দেবনাথ জানান, ৩-৪ দিন আগে এই বেড়িবাঁধের কাজ শুরু হয়েছে। অন্যান্য বছরের মতো অল্প কাজ করে শেষ হবে বেড়িবাঁধের কাজ। আমরা কথা বললে সমস্যা হয়।
হাওরের কৃষক রাজ্জাক আলম জানান, আমাদের ফসলরক্ষা বাঁধ নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই। সবাই আছে লুটেপুটে খেতে। হাওরের বেড়িবাঁধ দুর্গম এলাকায় থাকায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কেউ দেখতেও আসেন না।
হাওরের কৃষক মঞ্জু মিয়া জানান, প্রায় প্রতি বছর পুরাতন বেড়িবাঁধের মাটি উপরদিকে কেটে আবার ড্রেসিং করে রাখা হয়। তখন দেখা যায় এটাই এই হাওরের নতুন বেড়িবাঁধ। এই বিষয়ে বলারও কেউ নেই, দেখারও কেউ নেই।
মৌখলা গ্রামের একাধিক কৃষক জানান, ২-১ দিন হয়েছে এখানে মেশিন আনা হয়েছে। কিন্তু মেশিন আসার পরেই নষ্ট হয়ে যায়। গ্রামের পশ্চিমে আরও একটি মাটি কাটার মেশিনের একই দশা। সব মিলিয়ে এই হাওরে এখন পর্যন্ত ১শ’ বা দেড়শ’ মিটার কাজও হয় নি বলে জানান তাঁরা।
স্থানীয় কৃষক অমূল্য দাশ ও অতুল দাশ জানান, এই হাওরে বেড়িবাঁধ নির্মাণের শুধু মেশিন দেখানো হয়। গত ২ বছর যেমন নামেমাত্র কাজ করে বরাদ্দের টাকা লুটপাট হয়েছে। এবারও এমনটাই হতে পারে। গেল বছর এই হাওরে বৈশাখ মাসের শেষ সময় পর্যন্ত ৩টি মাটি কাটার মেশিন ফেলে রাখা হয়েছিল। ধান কাটার শেষে মেশিনগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়।
উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, কাউয়াজুরী হাওরে চলতি বছর মোট আবাদী জমির পরিমাণ ১৮ হাজার ৭৫ হেক্টর। হাইব্রিড ও উফসি জাতীয় বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৫ শত মেট্রিক টন।
জানা যায়, হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে কৃষি অফিসের কোনো কর্মকর্তাকে এ কাজে সম্পৃক্ত করা হয় না। কিন্তু বোরো ধান আবাদ থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত মাঠে কাজ করেন কৃষি কর্মকর্তারা। হাওরে কত হেক্টর ফসলি জমি আছে এবং কতটুকু আবাদ করা হয় সবই জানেন তাঁরা। কিন্তু ফসলের তুলনায় অন্তত: তিন গুণ বাঁধ নির্মাণে বরাদ্দ দেয়া হয়।
উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (এসও) মাহবুব আলম জানান, এই হাওরে আরো ১২টি প্রকল্প পাশ হয়েছে। জেলা কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন। পিআইসি গঠন হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে পিআইসি কাজ সম্পন্ন করতে না পারলে ঠিকাদারকে দিয়ে বাস্তবায়ন করা হবে। ১৭টি প্রকল্পে মোট দৈর্ঘ্য ১১ হাজার ৩শ’ মিটার। মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা।
সুনামগঞ্জের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান জানান, ৫টি পিআইসি ভেঙে ১৭টি করা হয়েছে। এই হাওরের বেড়িবাঁধে কোন ক্লোজার নেই। সহজে কাজ উঠনো যাবে। বাঁধে আগের উচ্চতা থেকে এখন একটু বেশি দেওয়া হয়েছে। তাই বরাদ্দও বেড়েছে। এই সময়ের মধ্যে পিআইসিরা কাজ শেষ করতে পারবে।