- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

বর্ষ সমাপনের বিদায়ী ভাবনা

বিশ্বজিত রায়
দূর দিগন্তের পশ্চিম পাড়ে বিদায়ের আবাহন। রক্তিম চারপাশে বিদায়ী বিহ্বলতা। দৃষ্টিসীমার শেষাংশে মিলিত হওয়া গা গেরামের কালো আবেশ নিরব ইশারায় দিয়ে যাচ্ছে সমাপ্তি আসরে মিশে যাওয়ার তাগিদ। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে বকজাতীয় পাখিগুলো হন্যে হয়ে ছুটছে পশ্চিমাকাশের অস্তমিত তীরে। নিভৃত পল্লীর পথধারে গজিয়ে ওঠা তমালতরুর পত্র আড়ালে বসা টুনটুনির টুনটুন সুর ও ক্ষেতকিনারের খুঁটিতে একাকীত্ব ফিঙের দেহভঙ্গিতে বিরাজ করছে বর্ষ সমাপনের ইতি ইঙ্গিত। ২০১৭ খ্রিষ্টীয় বর্ষকে বিদায় জানাতে কৃষ্ণচূড়া লালে সজ্জিত রুটি সদৃশ্য বস্তুটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে মহাকালের অতলান্তে।  
দিবারাত্রির পার্থক্য গড়ে দেওয়া এই রক্তিম রবি আরেকটি বছরকে ঠেলে দিচ্ছে দিনপঞ্জির উল্টো অংশে। পুরোনো বছরের বারোটি মাসের ভার বয়ে চলা ক্লান্ত সতেরো প্রস্তুত চিরবিদায়ে। সময়ের সুবিশাল মাপকাঠির সেকে-, মিনিট, ঘন্টা, দিন, পক্ষ, মাস, বছর, যুগ, শতাব্দী ও কাল-মহাকালের হিসেবী খেলায় সর্বদা মশগুল ব্যোম ভাস্কর সম্পূর্ণ নিয়মানুবর্তিতা বজায় রেখে পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছর দুই হাজার আঠারো সালকে আগামী এক বছর মেয়াদে গ্রেগরিয়ান দিনপঞ্জির সত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার সর্বশেষ মুহূর্তে অসীম আকাশের পশ্চিম কোণে অবস্থান করছে। তার অবসানের মধ্য দিয়েই দেয়ালে সাটানো বর্তমান দিনপঞ্জির পরিসমাপ্তি ঘটবে। বিদায়ের শেষ মুহূর্তে তাই ডুবো ডুবো সূর্যে শোনা যাচ্ছে বিদায়ী আওয়াজ।
হ্যাঁ, বিদায়ী বছরের ব্যস্ততাকে বিদায় জানিয়ে এবার আসি নতুন বর্ষপঞ্জিতে সদ্য পা ফেলা ২০১৮ আরম্ভ কথায়। প্রথম সকালের এই মনোরম মুহূর্তে মোর মনে কাজ করছে একটু ব্যতিক্রমী ভাবনা। দিনের অন্য ভোরের চেয়ে বর্ষ বরণের সকালী আবহে ভিন্নতা খোঁজার চেষ্টা করছি। প্রতিদিনের মতো আজও সূর্য উঠেছে উদয় কোণে। পূবাকাশে পাকনা মেলা রবিরঙে যেন চমচমে ঝাঁজ। তার তেজোদ্দীপ্ত তরঙ্গমালা বছর শুরুর শীতার্ত সকালে ছড়িয়েছে তুষ্টি দামামা। শিশিরসিক্ত দূর্বা দলের সজীবতা ও বিহঙ্গ বাজনায় নর্তিত প্রকৃতির পরিচ্ছন্ন ভাবাবেগ ২০১৮ সালের শুরু সকালটায় দিয়েছে ভরিয়ে।
বছরের প্রথম সূর্যোদয়ে বিশ্বময় আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে। সেই বর্ষ বরণের পুলকিত হিল্লোল বঙ্গগাঁয়ের পল্লীপথ ও মাঠ ময়দানের নিসর্গ চিত্তে দোলা দিয়ে যাচ্ছে। তাই সূর্য সোনালী প্রকৃতি প্রভাতে যেন কুয়াশা উত্তরীয় চেপে বসেছে, চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে শীত সকালের শবনমতা, ঘাসের গায়ে রৌদ্র চকচকে মুক্তো হাসি, উত্তরের হিম হাওয়ায় জীর্ণতা ঝেড়ে ফেলার তাগিদ, চড়–ই চেচানিতে সুন্দরের সুর বেজে উঠেছে এবং পুষ্পবাগে প্রুস্ফটিত হলদে গাদায় প্রণতিমাখা উদ্বেলিত উদারতা জানিয়ে দিচ্ছে খ্রিষ্টীয় বছরের শুরুটা কতখানি মনোমুগ্ধকর মহোৎসবে পূর্ণ। বছর বরণের এই অনুকূল পরিবেশ বর্ষব্যাপী অব্যাহত থাকার আশা পোষণ করছে বাঙালি জাতি। চলমান বছরটি যেন কোনো অশুভ, অলক্ষুণে দুর্যোগ ও অনভিপ্রেত অপকর্মে আক্রান্ত না হয়। শুভ, সুন্দর, শান্তি, প্রাপ্তি ও সফলতার দিকে এগিয়ে যাক বাংলাদেশ। সমগ্র জাতির জন্য মঙ্গল বয়ে আনুক নতুন বছর ২০১৮। এই কামনায় বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হচ্ছে একবিংশ শতাব্দির আঠারোতম বর্ণিল মুহূর্তটি।
২০১৭ এখন অতীত অঙ্গনের বাসিন্দা। পুরো বছরের সফলতা বিফলতা কুড়িয়ে অনন্ত অতলে ডুব দিয়েছে সদ্য অতীত হওয়া বছরটি। বছরজুড়ে নানা ঘটন-অঘটন, ঘাত-প্রতিঘাত, ব্যাথা-ব্যাকুলতা, হারানো-বেদনা, অর্জন-বিসর্জন ও দুঃখ-ব্যাধি-জড়ায় মুড়ানো অসংখ্য অনুষঙ্গ ২০১৭ সালকে স্মরণযোগ্য অবস্থানে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। ইচ্ছে করলেও এসব স্মৃতি-বিস্মৃতি একেবারে মুছে ফেলা যাবে না। আমরা যতই বলি পুরোনো গ্লানি দু’হাতে সরিয়ে সামনে এগিয়ে যাব, কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব নয়। অতীত নিয়েই বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ। বিগত বছরের ভালো-মন্দ মাঝেই যুক্ত রয়েছে আগামীর প্রত্যাশা। যেমন অতীতের ভালো কাজগুলো আমাদেরকে আরো ভালো করার শক্তি জুগাবে আর অশুভ অতীতেরা দিয়ে যাবে সাবধানী হওয়ার তাগিদ। তাহলে পুরোনো পুস্তিকায় যা লিপিবদ্ধ হয়েছে তা গ্লানিকর বলে ঢিল ছুড়লে আটকে যেতে পারে হাত। তবে দুঃখ-পরিতাপের কিছু গ্লানি আছে যেগুলো স্মরণে রাখলে চলার পথ আরো পিচ্ছিল হবে। এমন আংশিক বিষয় বাদ দিলে ঘটনাবহুল ২০১৭ ইতিহাসের সজীব ওয়ালে স্থান করে নিয়েছে খোদাই করা উজ্জ্বল আঙ্গিকে।
২০১৭ সালের শুরুটা ছিল ইসি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া দিয়ে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ২০১৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৩১টি রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপ শেষে ছয় সদস্যের সার্চ কমিটির মাধ্যমে   ১৬ বিশিষ্ট নাগরিকের মতামত গ্রহণপূর্বক সুপারিশকৃত ১০ জনের নাম থেকে খান মো. নুরুল হুদাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করে পাঁচ সদস্যের ইসি গঠন করেন। বছরের ফেব্রুয়ারি মাসটি বেদনার সবচেয়ে ভারি বোঝা নিয়ে হাজির হয়েছিল আমাদের মাঝে। এ মাসের ৫ তারিখে আমরা হারিয়েছিলাম রাজনীতির বরপুত্র ভাটির প্রাণপুরুষ সংবিধান প্রণেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে। প্রয়াত সুরঞ্জিত ছাড়াও সমাজ আলোকিত বেশ কয়েকজন দেশসেরা মানুষকে আমরা হারিয়েছি বিগত বছরে। এদের মধ্যে রয়েছেন নায়করাজ রাজ্জাক, কিংবদন্তী শিল্পী আবদুল জব্বার ও বারী সিদ্দীকি, স্বপ্নবাজ মেয়র আনিসুল হক, চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দীন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংসদ মন্ত্রী ছায়েদুল হক প্রমুখ। হারানোর বিষাদময়তা বাদ দিলে প্রকৃতিগত বৈরিতা বজ্রপাত, বন্যা, পাহাড় ধস, হাওরডুবি, ঘূর্ণিঝড় মানুষকে বেশি কাঁদিয়েছে। অকাল বন্যায় হাওর তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা এ দেশে নতুন কিছু নয়। কিন্তু গেল বছর অসময়ের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার দুঃখস্মৃতি মানুষ সহজে ভুলতে পারবে না। এপ্রিল মাসে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলের কারণে হাওড়ের ৭ জেলার মানুষ ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে। এতে ৭৫ ভাগ ফসল তলিয়ে যায়। এ ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে হাওড়পারের মানুষ। গত বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের তালিকায় নতুন যুক্ত হওয়া বজ্রপাতে ১৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া বছরের মাঝামাঝি সময়ে পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড় ধসে ১৬০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানিসহ ৩০ মে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে ৮ জনের মৃত্যু হয় এবং লন্ডভন্ড হয়ে যায় উপকূলীয় জনপদ।
জীর্ণ যন্ত্রণা আর শীর্ণ শিবিরে না গিয়ে এবার আসি নতুন বছরের বর্তমান ভাবনায়। এ বছরটা কেমন কাটবে, কিভাবে এগুবে বাংলাদেশ, সফলতায় ভরে উঠবে না বিফলতা ধোয়ায় ঢেকে যাবে বঙ্গ আকাশ কিংবা হারানো বেদনার দুঃখভারাক্রান্ত অদৃশ্য বস্তু কি গ্রাস করবে আমাদের। ভালো মন্দ মিশ্রণে এমন অসংখ্য ভাবনা ভীড় করছে হৃদয় আঙ্গিনায়। ধারণা করা হচ্ছে নতুন বছরটা নির্বাচনী উত্তাপে ব্যস্তময় হয়ে পড়বে। বেশ কয়েকটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন যেমন ২০১৮-তে অনুষ্ঠিত হবে তেমনি সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতিমূলক কৌতূহলী তৎপরতা রাজনীতির মাঠকে আরো উত্তপ্ত করে তুলবে বৈকি। এছাড়া প্রকৃতি ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগের দানবীয় তান্ডব দেশ ও মানুষকে মারাত্বক বেকায়দায় ফেলতে পারে। কারণ খেয়ালী প্রকৃতির বৈরি আচরণ রুখে দেওয়া একেবারে অসম্ভব। অন্যদিকে মানুষ কর্তৃক সৃষ্ট আচমকা অপকর্মের ভয়াবহ রেশ দেশ ও জাতির জন্য মারাত্বক ক্ষতির কারণ হতে পারে। যেকোনো ধরনের অঘটন চলতি বছর যে কলংকিত কাপড়ের কালো ডোরে বাধা পড়বে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? আবার অশুভ অপকর্মের বিপরীতে অর্জন-অগ্রগতি, স্বচ্ছ-সফলতা ও প্রাপ্তি পূর্ণতায় ভরে উঠার সম্ভাবনাময়ী ভরসাও হাতছানি দিয়ে ডাকছে বাংলাদেশকে। তবে আমরা আশাবাদী মানুষ হিসেবে চাইবো ভালোয় ভালোয় শেষ হোক ২০১৮ খ্রিষ্টীয় বছরটি।
বিশ্বজিত রায় কলামিস্ট

  • [১]