এমএ রাজ্জাক, তাহিরপুর
তাহিরপুর সীমান্তবর্তী লাউড়েরগড় এলাকায় শাহ আরেফিন (র) মোকামের দানের টাকা কোথায় যায়, কে খরচ করেন, কোথায় খরচ করা হয় তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রতি বছর এসময়ে শাহ আরেফিন (র.) মোকামে বসে ওরশ ও মেলা। এ ওরশ ও মেলাতে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তবৃন্দ মানত নিয়ে আসা গরু, ছাগলসহ লাখ লাখ টাকা মোকামের দানবাক্সে জমা হয়। এই দানকৃত টাকা কোথায় যায় তা কেউ বলতে পারেন না।
এদিকে একই অভিযোগ পণাতীর্থের অদ্বৈত্ব মহাপ্রভুর মন্দিরে অর্ঘ্য হিসাবে দেওয়া ভক্তবৃন্দের প্রণামীর টাকা ও বারুনী মেলায় বিভিন্ন খাতে আদায়কৃত টাকা নিয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ শাহ আরেপিন মোকামের মতই বারুণী মেলার আদায়কৃত টাকার খরচের হিসাব জানেন না কেউ। প্রতি বছর কত টাকা উত্তোলিত হয়, কত টাকা খরচ তা কাউকে জানানো হয়নি।
এ ব্যাপারে কথা বলতে পণাতীর্থ, গঙ্গা¯œান ও বারুনী মেলা উৎযাপন পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কানন বন্ধু রায়ের সাথে কথা বলতে চাইলে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকার স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর শাহ আরফিনের মোকামের মেলাকে ঘিরে চলে লুটপাটের মহোৎসব। প্রায় দেড় যুগ ধরে পরিচালনা কমিটির দায়িত্বশীলরা উত্তোলিত টাকা লুটপাট করে যা”েছন। জড়িতরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কথা কেউ মুখ খোলার সাহস করেন না। প্রতি বছরই ১০-১২ লাখ টাকা উঠলেও হলে এসব কিভাবে কোথায় খরচ করা হয় তার কোন হিসাব দেন না সংশ্লিষ্টরা।
তবে শাহ আরেফিনের মাজার পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব আলম ছাব্বির সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, ‘প্রতি বছর ৬-৭ লাখ উঠে। এসব টাকা শাহ আরেপিন মোকাম, এতিমখানা ও মাদ্রাসার উন্নয়নে খরচ করা হয়। এসব টাকা মাজার আস্তানার উন্নয়নের জন্য খরচ করা হয়। পরিচালনা কমিটির সকলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক টাকা খরচ করা হয় এবং তা লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়। টাকা লুটপাট করা হয় এমন অভিযোগ সম্পূর্র্ণ মিথ্যা। কারণ সকল টাকা গণনা করা হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার ওসি বা তাদের প্রতিনিধিসহ পরিচালনা কমিটির সকলের উপস্থিতিতে।
জানা যায়, শাহ আরেফিন (র) মোকামে প্রতি বছর এসময়ে বাৎসরিক ওরস ও মেলায় ছোট-বড় কয়েক শ’ দোকান বসে। ওরশ চলে ৩ থেকে ৫ দিন। ওরস চলাকালীন সময়ে দোকানগুলো থেকে প্রতি হাত পরিমাপের জায়গা থেকে ৩ থেকে ৫শ টাকা হারে নেয়া হয়। এছাড়া প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থী ও ভক্তগণ মোকামে টাকা-পয়সা, ছাগল, গরু মানত হিসেবে দান করেন।
স্থানীয়রা জানান, শাহ আরেফিন (র.) আস্তানার নামে টাকা উত্তোলন করেন মোকাম পরিচালনা কমিটি। এ কমিটির কাগজে কলমে সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার হলেও টাকা-পয়সা খরচ করেন পরিচালনা কমিটির দায়িত্বশীলসহ একটি প্রভাবশালী চক্র।
শাহ আরেফিন মোকাম পরিচালনা কমিটির কোষাধ্যক্ষ নুরুল আমিন জানান, মোকাম কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। আর বিষয়গুলো ভাল জানেন জালাল উদ্দিন ও আলম ছাব্বির। আমি কমিটির কোষাধ্যক্ষ কিন্তু হযরত শাহ আরেফিন মোকামের নামে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক বাদাঘাট শাখা একাউন্ট নং ১৫৮৪ নম্বরে তিন বছর ধরে কোন টাকা জমা হয় না। প্রতি বছর ওরস ও দৈনিক আয়ের টাকা কোথায় যায় জানতে চাইলে তিনি বলেন এটা জালাল উদ্দিন ও আলম ছাব্বির ভাল জানেন।
বাদাঘাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রাখাব উদ্দিন বলেন,‘আমি যখন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলাম তখন যে টাকা উত্তোলিত হত বিভিন্ন খরচ শেষে বাকী টাকা ব্যাংক একাউন্টে জমা রাখা হত। কিন্ত এখন বস্তাভর্তি টাকা উঠলেও মোকামের ব্যাংক একাউন্টে এক টাকাও নাই। মাজার কমিটি টাকা কি করেছেন তারাই ভাল বলতে পারবেন। তিনি আরো বলেন, ‘ওরসের সময় দোকানগুলো থেকে উঠানো টাকাসহ দান-অনুদানের বস্তাভর্তি করে টাকা তোলা হয়। ওরস শেষে বস্তাবন্দি টাকা কোথায় যায় কেউ জানে না।’
শাহ আরেফিনের মোকাম পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব আলম ছাব্বির বলেন,‘ বস্তাবন্দি টাকা লুটপাট করা হয় এটা মিথ্যা কথা। দান বাক্স থেকে ৩-৪ লাখ, মোমবাতি বিক্রি করে ৩০-৪০ হাজার, হাঁস মুরগি থেকে ২৫-৩০ হাজার, মেলাসহ সব মিলিয়ে ৬-৭ লাখ টাকা পাওয়া যায়। সকলের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যেই এসব টাকা গণনা করা হয়। এসব টাকা দিয়ে একটি এতিমখানা ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সব ব্যয় মেটানো হয়। গত বারের উত্তোলিত টাকা দিয়ে স্বে”ছাসেবকদের থাকার জন্য একটি ঘর ও হাঁস মুরগি রাখার একটি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। যারা টাকা লুটপাটের অভিযোগ করেন তারা না জেনে শুনেই এসব অভিযোগ করে।’
শাহ আরেফিনের মোকাম পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইকবাল হোসেন বলেন,‘শাহ আরেপিন মোকামের টাকা পয়সা তারাই খরচ করেন। কিভাবে কোথায় খরচ করা হয় তারাই জানেন। এবার সভা করে পরিচালনা কমিটির লোকজনকে দুই দিন আগেই মেলার দোকানপাটের সংখ্যা, সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব দেয়ার জন্য বলা হয়েছিল । কিন্তু দুই দিন পেরিয়ে গেলেও তারা দোকান পাটের কোন হিসাব দিতে পারেনি। তাদের কর্মকা-ে স্ব”ছতা পাওয়া যা”েছ না। আমি চেষ্টা করছি সবকিছুতে একটা নিয়ম-শৃংখলা ও স্ব”ছতা বজায় রাখতে।’