ডা. মোরশেদ আলম
এক কথায় তাঁর হাতে সুনামগঞ্জ পত্রিকা জগতে অসংখ্য সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া তাঁর হাতে স্থানীয় অসংখ্য লেখক, কবি ও সাংবাদিক তৈরি হয়েছিল এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এদের সকলেই আজ কোনো না কোনো ভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই ক্ষণজন্মা মানুষটির মধ্যে কোন অহংকার ছিল না। না বংশ গৌরবের না বিত্ত বৈভবের। তিনি নিজেকে সমাজে উপস্থাপন করেছেন জৌলুসহীন ভাবে। তাঁর নামের আগে পরে তিনি তালুকদার চৌধুরী এসব পদবী ব্যবহার করেননি। করতে পছন্দও করতেন না। জ্ঞানের প্রতি ছিল অকুণ্ঠ পিপাসা। দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, সমাজসংস্কার, রাজনীতি, সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্পকলা, গান, নাটক, কবিতা, সাহিত্য, গবেষণা, মানবসেবা এসবই ছিল তাঁর চারিত্রিক প্রধান বৈশিষ্ট। সমাজ ও মানুষের কল্যাণ সাধনের চেতনায় তাঁর হৃদয়খানি পরিপূর্ণ ছিল। যখন যেখানে যেমনভাবে প্রয়োজন পড়েছে তিনি নিজেকে তেমনিভাবে সেখানে নিয়োগ করেছেন। অন্তরে বাহিরে তিনি ছিলেন একজন সাদা মনের মানুষ। কারো বিরুদ্ধেই তার মনে কোন অভিযোগ ছিল না।
এই সুন্দর ও সাদা মনের মানুষটি সুনামগঞ্জ পৌরসভার অন্তর্গত আরপিননগর গ্রামের চৌধুরী বাড়ীতে পিতা আব্দুস সামাদ চৌধুরী এবং মাতা জহরুননেছা চৌধুরাণীর গর্ভে ১৯২৭ সালের ২৩ মে তারিখে (সার্টিফিকেট অনুসারে) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবারটি ছিল মুসলিম সংস্কৃতিসেবী একটি সম্ভ্রান্ত পরিবার। তিন ভাই বোন। ভাইদের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। হাওরের বিশালতা, পাহাড়ের দৃঢ়তা, সুরমার ছলছল বয়ে চলা জলধ্বনি, চাঁদের ¯িœগ্ধ আলো, প্রকৃতির নির্মল বাতাসে কিছুটা সময় বাদে শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কাটিয়েছেন জল-জোছনার এই প্রিয় শহরে। শেষ বিশ্রামও নিয়েছেন সুরমা নদীর পাড়ে অবস্থিত আরপিননগর জামে মসজিদ প্রাঙ্গণের কবরস্থানে।
ছাত্রজীবন
এই গুণী মানুষটি শৈশব থেকেই পড়াশুনায় ভালো ছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি বিভিন্ন পরীক্ষায় মেধার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রাখেন। তিনি আরপিননগরস্থ কে.বি মিয়া মক্তবে প্রাথমিক স্তরে লেখাপড়া করেন। ১৯৪০ সালে মাত্র সাড়ে এগরো বছর বয়সে তিনি কে.বি মিয়া মক্তব থেকে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং সমগ্র আসামে ১ম স্থান অধিকার করে সুনামগঞ্জ জেলার গৌরব ও সুনাম বৃদ্ধি করেন। বরাবর তিনি একজন অতি মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ১৯৪৮ সালে তিনি সরকারী জুবিলী হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাশ করেন। ১৯৫১ সালে তিনি সুনামগঞ্জ কলেজ থেকে আই.এ পাশ করে সিলেট এম.সি কলেজে বি.এ ক্লাসে ভর্তি হন। রাজনীতির কারণে তিনি এম.সি কলেজ থেকে বহিস্কৃত হন। ১৯৪৫ সালে সিলেট মদন মোহন কলেজ থেকে বি.এ পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণকালে দেশে ১৯২ (ক) ধারা জারী হলে তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে নেয়া হয়। পরে ১৯৫৫ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বি.এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং ডিস্টিংশন সহ বি.এ পরীক্ষা পাশ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ক্লাসে ভর্তি হন। কিন্তু ঐ সময়ে দেশে দুর্ভিক্ষ চলছিল। সুনামগঞ্জ মহকুমা রিলিফ কমিটি গঠন করে ষোলঘর নদীর পাড়স্থ ম্যানেজার অফিসে লংগরখানা চালু করে দুস্থ মানুষের খাদ্য বিতরণের কাজ চলছিল। তিনিও এসে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এর সম্পাদক ছিলেন কমরেড বরুণ রায়। পরবর্তীতে বরুণ রায় গ্রেফতার হলে তিনি সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করে নিষ্ঠার সাথে দুস্থ মানুষের সেবায় দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক কর্মকান্ড
পাকিস্তান সৃষ্টির পর ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার আড়ালে পাকিস্তানি শোষক গোষ্ঠীর জাতিগত নিপীড়নের প্রথম অপচেষ্টা স্পষ্ট হয়ে উঠে বাংলা ভাষার টুটি টিপে ধরার মধ্য দিয়ে। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে সারা বাংলার মানুষ এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সমগ্র বাঙালি জাতির সাথে সাথে এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সুনামগঞ্জের সংগ্রামী জনগণও প্রচ- বিক্ষোভে গর্জে উঠে। এ জেলার রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরাও ভাষা আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। জনাব আব্দুল হাই ছিলেন প্রগতিশীল ধারার রাজনীতির অনুসারী। ৫১সালে শেষ দিকে অসাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠন হিসাবে ‘সিলেট জেলা ছাত্র ইউনিয়ন’ সর্ব প্রথম আত্মপ্রকাশ করে। জনাব আ্দুল হাই ছাত্র ইউনিয়নের অন্যতম সংগঠক ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন।
বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনে পুরোভাগে থেকে তিনি সিলেট সুনামগঞ্জে নেতৃত্ব দেন। এই আন্দোলনে আরেকটি নাম মানিক জোড়ের মত গেঁথে আছে। তিনি হলেন ছাতক উপজেলাধীন ভাতগাঁও নিবাসী জনাব আব্দুল হক। ৫১ সালে জনাব হক সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজৈ ভর্তি হন। ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দের মধ্যে তিনিও ছিলেন অন্যতম। ভাষা আন্দোলনে আব্দুল হাই সাহেবের পাশাপাশি জনাব আব্দুল হক সাহেবেরও সক্রিয় বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। আব্দুল হক ও আব্দুল হাই যেন ভাষা আন্দোলনের জোড়া নাম। তাদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ফলে ভাষা আন্দোলনে সুনামগঞ্জ ব্যাপকভাবে সাড়া জাগায়। তাদের এই নেতৃত্বের কথা আজো সবাই মনে করেন। পুরাতন কলেজ প্রাঙ্গণে তখন ভাষা আন্দোলনের পক্ষে প্রতিবাদ সভা, বিক্ষোভ সমাবেশ, মিছিল, মিটিং সবই অনুষ্ঠিত হতো। জনাব আব্দুল হাই সাহেব ছিলেন অত্যন্ত সুবক্তা। মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মত তাঁদের বক্তব্য শুনতো। এমনও জানা যায় দীর্ঘ সময় বক্তৃতা করলেও মানুষ বিরক্ত হতো না কিংবা সভাস্থল ত্যাগ করতো না। সে সময় মাইকের প্রচলন ছিল না। টিনের তৈরী করা চোঙ্গা মাইক হাতে নিয়ে মুখে লাগিয়ে জোরে জোরে বক্তৃতা করতে হতো। পাকিস্তানি শাসক শ্রেণী যখন ভাষা আন্দেলন দমানোর জন্য কঠিন নিস্পেষণ শুরু করলো তখন এক পর্যায়ে জনাব আব্দুল হাই সাহেবকেও গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করে। ২১ শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের শহীদদের নিয়ে জনাব আব্দুল হক ‘ঢাকারই কারবালা’ নামে একটি কবিতা লিখে ছিলেন। যা আজো মানুষ স্মরণ করে।
১৯৫৪ সালে শেরে বাংলা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি এবং মৌলানা ভাসানী যুক্তফ্রন্ট গঠন করলে প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে জনাব আব্দুল হাই যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও একনিষ্ঠ। যুক্তফ্রন্টের পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকার ফলে সুনামগঞ্জের যুক্তফ্রন্ট প্রার্থীরা বিজয়ী হন। পরবর্তীতে প্রথম জাতীয় পরিষদ ভেঙ্গে দেয়ার পর দ্বিতীয় পরিষদ গঠনের পূর্বে ১৯৫৬ সালে দেশে ১৯২ (ক) ধারা জারী করা হলে প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ হিসাবে অন্যান্যের সাথে জনাব আব্দুল হাইকেও গ্রেফতার করে কারাগারে নেয়া হয়। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর প্রগতিশীল ধারার রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে সক্রিয় অংশগ্রহণ বজায় রাখেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৫৩ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে তিনি আওয়ামী মুসলিম রীগ থেকে মুসলিম কথাটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ গঠন করে দলকে সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত করেন। পরবর্তীতে ৫৬-৫৭ সালে সুনামগঞ্জে আওয়ামী লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন জনাব আব্দুল হাই সাহেব এবং সভাপতি হন দেওয়ান আনোয়ার রাজা চৌধুরী। বঙ্গবন্ধুর সংগে দেওয়ান আনোয়ার রাজা সাহেবের একটি ছবিও তাঁদের বাড়ীতে সংরক্ষিত আছে মর্মে জানা যায়। বিভিন্ন বৈরী কারণে ও দেশের রাজনীতির প্রতিকূল পরিবেশের কারণে আওয়ামী লীগের প্রথম কমিটি তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে জানা যায় ও এক সময় পরিবর্তন হয়ে নতুন কমিটি গঠিত হয়। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করে দেশে প্রথম মার্শাল’ল জারী করলে প্রগতিশীল ধারার বহু রাজনীতিবিদকে গ্রেফতার করে জেলে নেয়া হয় এবং অনেককেই নির্যাতনও করা হয়। এ জেলার উদীয়মান প্রগতিশীল রাজনীতিকদের মধ্যে জনাব আলফাত উদ্দিন আহমদ গ্রেফতার হন এবং তাঁকে নির্যাতন করা হয়। এসময় আব্দুল হাইকেও গ্রেফতার করা হয়। আরো যাঁরা গ্রেফতার হয়েছিলেন তাঁরা হলেন বাবু প্রসুন কান্তি বরুন রায়, হোসেন বক্ত, যামিনী শ্যাম, চন্দ্র বিনোদ দাশ, আব্দুজ জহুর, মাহমুদ আলী, হাজেরা মাহমুদ, মিন্টু দাস প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।
সাংবাদিকতা
(১) ‘দেশের দাবী’ : ১৯৫৬ সালের ১৪ আগস্ট তাঁর সম্পাদনায় সুনামগঞ্জ থেকে সাপ্তাহিক ‘দেশের দাবী’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি স্বল্প সময়ের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৫৮ সালের ২৬ শে জুলাই পর্যন্ত পত্রিকাটি সগৌরবে টিকে ছিল। দেশে সামরিক শাসন জারী হয়ে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।
(২) ‘সুরমা’: ১৯৬২ সালে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় সুনামগঞ্জ থেকে সাপ্তাহিক ‘সুরমা’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তিনি এর সম্পাদনা পরিষদে যোগদান করেন। তাঁর সফল সম্পাদনায় পত্রিকাটি প্রথমে সাপ্তাহিক ও পরে পাক্ষিক হিসাব ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিল।
(৩) ‘জনমত ও বুলেটিন’: স্বাধীনতা যুদ্ধে শুরুর লগ্নে তাঁর সম্পাদনায় সুনামগঞ্জ থেকে ‘জনমত’ নামে স্বাধীনতার স্বপক্ষে জনমত গঠনের উদ্দেশ্যে ২৪ মার্চ ১৯৭১ তারিখে একটি বুলেটিন প্রকাশিত হয়। এ বুলেটিনের সাথে আরো যারা জড়িত ছিলেন তারা হলেন, গোলাম রব্বানী, আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন, মুতাসিম আলী ও নুরজ্জামান শাহী।
(৪) অর্ধ সাপ্তাহিক ‘দেশের কথা’ ও সাপ্তাহিক ‘সূর্যের দেশ’:
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ থেকে জনাব আব্দুল হাই এর সম্পাদনায় প্রথমে প্রথমে অর্ধ সাপ্তাহিক ‘দেশের কথা ও পরে সাপ্তাহিক ‘সূর্যের দেশ’ নামে দুটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়।
এক কথায় তাঁর হাতে সুনামগঞ্জ পত্রিকা জগতে অসংখ্য সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া তাঁর হাতে স্থানীয় অসংখ্য লেখক, কবি ও সাংবাদিক তৈরি হয়েছিল এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এদের সকলেই আজ কোনো না কোনো ভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন।
শিক্ষকতা জীবন
১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর আইয়ুব খান দেশে মার্শাল ল জারী হওয়ার পর তার সম্পাদিত সাপ্তাহিক দেশের দাবি পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায। পরে তিনি জয়কলস উজানীগাঁও রশিদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দায়িত্ব পালনকালে তিনি আর্থিকভাবে বিদ্যালয়টির প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। সেটি পাকিস্তানের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অন্তর্ভূক্ত হয়। পরবর্তিতে ১৯৬২ সন থেকে তিনি কাজী মকবুল পুরকায়স্থ (এইচএমপি) হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৪ সনে বিদ্যালয়টি পূর্ণাঙ্গ হাইস্কুল হিসাবে সরকারী স্বীকৃতি লাভ করে। এই স্কুলের স্বীকৃতি প্রাপ্তির বিষয়ে একটি মজার ঘটনা রয়েছে। চ্ট্গ্রাম বিভাগীয় ইন্সপেক্টর অব স্কুলস এসেছিলেন স্কুল পরিদর্শনে। এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক তখন জনাব আব্দুল হাই। তিনি তখন শিল্পকলা একাডেমীরও সম্পাদক এবং সুরমা পত্রিকারও সম্পাদক। স্কুল ইন্সপেক্টর সাহেবের সাথে সেখানে বসেই উভয়ের মধ্যে আলোচনা হয়। বাংলা ভাষা সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি, রাজনীতি কোন বিষয়ই আলোচনার বাইরে ছিল না। আলাপ শেষে প্রধান শিক্ষক বললেন চলুন স্যার স্কুলটি দেখে আসবেন। উত্তরে ইন্সপেক্টর সাহেব বললেন আব্দুল হাই যে স্কুলের প্রধান শিক্ষক সে স্কুল দেখার প্রয়োজন আছে কি? জনাব আব্দুল হাই সাহেবের দীর্ঘকালীন প্রচেষ্টার স্কুলটি ব্যাপক উন্নতি লাভ করে। ১৯৭৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি এইচএমপি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন। ৭/২/১৯৭৩ তারিখ থেকে তাঁরই ঘনিষ্ট সহকর্মী ও ভাবশিষ্য বাবু ধূর্জটি কুমার বসু (রাখাল স্যার) প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সাংস্কৃতিক কর্মকা-
বায়ান্নের পর থেকে সুনামগঞ্জে রবীন্দ্র-নজরুল চর্চা জোরদার হতে থাকে। ৫৬-৫৭ সাল থেকেই জনাব আব্দুল হাই সাহেবের উদ্যোগে ও নেতৃত্বে সুনামগঞ্জে হাছনমেলা আয়োজন করা হয়। পরবর্তীতে হাছন উৎসব হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। তাঁর নেতৃত্বেই জুবিলী স্কুলের মাঠে হাছন মেলা, হাছন উৎসব এবং সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে এখানে দেশের গুণীজন সমাবেশ ঘটানো হয়। যার মাধ্যমে সুনামগঞ্জের হাছনরাজা ও সুনামগঞ্জের সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহ্য তুলে ধরার ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। মহকুমা প্রশাসকের অধীনে কমিটির মাধ্যমে হাছনমেলা, হাছন উৎসব, সাহিত্য-সংস্কৃতি উৎসব, গান, কবিতা, নাটক, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্য ও সাংস্কৃতিক মেলার আয়োজন করা হতো। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই তিনি এসব অনুষ্ঠানের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতেন। সভাপতিত্ব করতের দেওয়ান আনোয়ার রাজা চৌধুরী সাহেব। উক্ত অনুষ্ঠান সমূহে দেশের স্বনামধন্য সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিককর্মী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং প্রখ্যাত কন্ঠশিল্পীরা অংশগ্রহণ করতেন। তাঁদের মধ্যে ঢাকার জনাব আবু জাফর শামসুদ্দিন, উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা সত্যেন সেন, প্রখ্যাত সাহিত্যিক অধ্যাপক শাহেদ আলী, বিখ্যাত কন্ঠশিল্পী আব্দুল আলীম, আব্দুল জব্বার, সিলেটের আরতি ধর, রঞ্জু চৌধুরী, সুনামগঞ্জের উজীর মিয়া, আনসার এডজুটেন্ট জনাব মোশতাক আহমদ চৌধুরী ( তিনি উচ্চাঙ্গ সংগীতও গাইতেন) প্রমুখের অংশগ্রহণের বিষয়ে জানা যায়। এছাড়া স্থানীয় অনেক শিল্পীরা অংশগ্রহণ করতেন।
তিনি সুনামগঞ্জের নাট্য জগতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি নাট্য সংগঠন করতেন। তাঁর নেতৃত্বে একদল নাট্যকর্মী বহু নাটক (অর্ধশতাধিক) মঞ্চস্থ করেন। তিনি নিজে নাটকে অভিনয় করতেন। তিনি একজন বলিষ্ঠ অভিনেতা ছিলেন। তিনি অনেক নাটক পরিচালনাও করেছেন। বহুকাল পর ঠিক কতগুলো নাটকে তিনি অভিনয় করেছিলেন তা জানা সম্ভব হয়নি। তবে জানা যায় ‘নন্দকুমার’ নাটকে নন্দকুমার চরিত্রে, ‘টিপু সুলতান’ নাটকে মীর কাশিমের ভূমিকায় মতান্তরে সেনাপতির ভূমিকায় ‘বিশ বছর আগে’ নাটকে সৌমেনের ভূমিকায়, ‘চন্দ্র’ নাটকে চন্দ্রগুপ্তের ভূমিকায় এবং ‘কর্নার্জুন’ নাটকেও তিনি অভিনয় করেছেন। জানা যায় উক্ত নাকটটি ১৯৬৫ সনে জুবিলী স্কুলের মাঠে মঞ্চস্থ হয়েছিল এবং টিপু সুলতান নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিল রাজগোবিন্দ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। টিপু সুলতান নাটকে চাণক্য পন্ডিতের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তৎকালীন ১ম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট জনাব আবেদ সাহেব। তাঁর সমসাময়িক নাট্যাভিনেতারা হলেন ব্রহ্মানন্দ দাস, ডা.তরণী কান্ত দে, সুনু মিয়া, মনোরঞ্জন কর্মকার, সাদিব উদ্দিন, সুখরঞ্জন রায়, শাহ নূরুল গনি (অক্ষয়নগর) মন্টু বসু, গনেশ বসু প্রমুখ। ১৯৫৬ সালে তিনি শিল্পী সংসদ নামে একটা সংসদ গড়ে তুলেন। শহরের অধিকাংশ প্রগতিশীল ছেলে মেয়েরা ঐ সংগঠনের সদস্য হন। ঐ সংসদের মাধ্যমে গ্রন্থাগার সৃজন, বই সংগ্রহ এবং সাংস্কৃতিক কর্মকা- চালাতে থাকেন। শিল্পী সংসদের দায়িত্বে ছিলেন লাইব্রেরীয়ান অটল কৃষ্ণ দাশ এবং সহযোগী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন রাখাল বসু। ষাটের দশকে সুনামগঞ্জের সাহিত্য সংস্কৃতি ও প্রকাশনার ক্ষেত্র সমৃদ্ধ করার ব্যাপারে জনাব আব্দুল হাই সাহেবের অগ্রণী ভূমিকার কথা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বেই এখানকার লোক সংগীত গ্রন্থ সাহিত্য সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়েছে।
কাব্য সাধনা
জনাব মুহাম্মদ আব্দুল হাই সাহেব ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। ৫৬ সাল বা তারও আগে থেকেই তাঁর সাহিত্য ও কাব্যচর্চা চলতে থাকে। তাঁর প্রকাশিত দুইটি কাব্যগ্রন্থ রয়েছে। এগুলো হলো ‘উত্তাল তরঙ্গে’ ও ‘উতলা বাতাসে’। এছাড়া ‘গনি সংগীত’ ও ভাইবে রাধা রমন বলে’ নামে দুটি গানের সংকলন প্রকাশিত হয়। ‘নকীব’ ছদ্ম নামে তার বহু লেখা রয়েছে। হাসন রাজার গানের উপর তাঁর ব্যাপক পড়াশুনা ও গভীর বিশ্লেষণ ছিল। তিনি ‘হাছন রাজার গান কি ছিল কি হয়েছে কি হওয়া উচিত’ এ প্রসঙ্গে একটি বই লিখেছিলেন। হাছন রাজার দর্শনের অনুরাগী ছিলেন। বলা যায় তিনি হাছন ভক্ত ছিলেন। তাইতো নিজেকে হাছন পছন্দ নামে ভূষিত করেন এবং হাছন পছন্দ ছদ্মনামেও লিখতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য এর উপযুক্ত স্বীকৃতি তিনি পাননি এবং যথাযথ মূল্যায়নও তাঁকে দেয়া হয়নি। তাঁর লেখা বই, কাব্যগ্রন্থ, গানের সংকলন ও অন্যান্য বিষয়ে লিখিত পান্ডুলিপি সমূহ এখন দুস্প্রাপ্য। অনেক গুলোই খোয়া গেছে। তাঁর পারিবারিক নিজের হাতে গড়া ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের অনেক বইও খোয়া গেছে বলে জানা যায়। তবে এগুলোর কিছু কিছু তাঁর বড় মেয়ের জামাতা সিলেট শহরের বাসিন্দা সাংবাদিক আল-আজাদ সাহেবের কাছে আছে বলে জানা যায়। জনাব আব্দুল হাই সাহেব ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত একাধারে শিল্পকলা একাডেমীর সম্পাদক ছিলেন। বস্তুত এ সময়কালেই সুনামগঞ্জের শিল্প সাহিত্যে ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র বহুকাল এগিয়ে গিয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধকালীন অবদান
মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর লগ্নে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ তারিখে তাঁর সম্পাদনায় সুনামগঞ্জ থেকে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে ‘জনমত’ নামে একটি বুলেটিন প্রকাশিত হয়। এ বুলেটিনের সাথে আরো যারা যুক্ত ছিলেন তারা হলেন, সর্বজনাব আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন, গোলাম রব্বানী, মুতাসীম আলী ও নুরুজ্জামান শাহী। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর লগ্নে দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ হয়ে জনাব আব্দুল হাই মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন।
বালাটে শরণার্থী সেবায় অংশগ্রহণ
১৯৭১ সালে পাক হানাদারদের ভয়ে হাজার হাজার মানুষ বাড়ীঘর ছেড়ে, দেশ ছেড়ে ভারতের বালাট শরণার্থী আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাদের এই দুর্দিনে ভারত সরকার খাদ্যসহ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। অসহায় শরণার্থীদের মাতৃভূমি ছেড়ে যাওয়ায় অন্তরের নিদারুণ কষ্ট ও শরণার্থী জীবনের বিড়ম্বনা যে কত করুণ ছিল তা যারা স্বচক্ষে দেখেনি তারা শুনে প্রকৃত অবস্থা অনুমান করতে পারবে না। সবার সাথে জনাব আব্দুল হাই সাহেবও পরিবারসহ বালাটে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তখন বেসামরিক নেতৃত্বের হাতে ছিল আশ্রয় শিবির পরিচালনার ভার। মুক্তিযুদ্ধের জন্য লোক বাছাই করে ট্রেনিংয়ে পাঠানো, শরণার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা ও অসুবিধা নিরসন করা এবং শরণার্থীদের বিভিন্ন প্রকার কল্যাণমূলক কাজের দায়িত্বও পালন করতেন বেসামরিক নেতৃবৃন্দ। এসকল কাজে জনাব আব্দুল হাই সাহেব সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আরো যাঁরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন তাঁরা হলেন সর্বজনাব দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী, আলফাত উদ্দিন আহমদ, হোসেন বখত, আছদ্দর আলী চৌধুরী, আকমল আলী, আব্দুল বারী, খলিলুর রহমান চৌধুরী, আব্দুল আহাদ চৌধুরী, আফাজ উদ্দিন, মতসিন আলী, দেওয়ান কামাল রাজা চৌধুরী, সৈয়দ দেলওয়ার হোসেন, আলী ইউনুছ, ডা. হারিছ উদ্দিন, নজির বক্স, মুক্তার সাহেব প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা শরণার্থীদের সমস্যা নির্ণয় ও নিরসনের লক্ষ্যে ভবিষ্যত পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য বালাটের পিডব্লিউডি অফিসে দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরীর সাহেবের নেতৃত্বে ও সেখানে অবস্থানরত নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ঐ কমিটির শিক্ষা বিষয়ক দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন জনাব আব্দুল হাই এবং সহযোগী ছিলেন ধূর্জটি কুমার বসু (রাখাল স্যার)। তাঁরা আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থিত শরণার্থীদের এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকৃত এলাকায় লোকজনদের শিক্ষা সহ তাদের অন্যান্য সমস্যা নিরসনে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে সংগঠক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ কাজেও তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। যা তাঁদের জীবনের এক গৌরবোজ্জ্বল দিক। তাঁদের এই মহতী অবদান চিরদিন এতদঞ্চলের মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
পৌর নির্বাচনের অংশগ্রহণ
স্বাধীনতার পর প্রায় বৎসরাধিকাল তিনি শিক্ষকতা করেন। ১৯৭৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারিতে এইচএমপি স্কুল ছেড়ে দেন। তখন রাখাল স্যার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৭৩ সালে কামারখালী পুলের পাশে সরওয়ার মিয়ার বাসার সামনে ‘মুর্শেদী প্রেস’ স্থাপন করে ছাপাখানা ব্যবসা পরিচালনা করতে থাকেন। এই সময়টাতে প্রেসের ব্যবস্থা ভালোই চলছিল। ৭৩ সালের পৌরসভা নির্বাচনে তিনি চেয়ারম্যান পদে দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী সাহেবের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও বিপুল ভোটে দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী সাহেব বিজয়ী হন এবং তিনি নির্বাচনে হেরে যান। এরপর থেকেই তাঁর জীবনে এক পরিবর্তন আসতে থাকে। বস্তুবাদী ও ভোগবাদী জীবন থেকে তিনি আস্তে আস্তে দূরে সরে যেতে থাকেন এবং ভাববাদী জগতে প্রবেশ ঘটতে থাকে। তাঁর চুলগুলো লম্বা হতে থাকে। চোখ মুখে শান্ত সৌম্য ভাব প্রকাশ পেতে থাকে। হয়তো তিনি বসে আছেন, চেয়ে আছেন তথাপি তাঁর মন যেন চারপাশের বস্তু জগতে নেই। জড় জগৎ ছাড়িয়ে যেন অজড় জগতে, অদৃশ্য জগতে বিচরণ করে বেড়াচ্ছে। কে জানে হয়তো তিনি তাঁরই শ্বাশ্বত স্বরূপ দেখতে পাচ্ছিলেন যা তাঁর ভেতর থেকে বের হয়ে তাঁরই চোখের সামনে উদ্ভাসিত হচ্ছিল। হয়তো তাঁর চিন্তা ও চেতনায় প্রেস, বৈরাগ্য ও আধ্যাত্মিকতা মিশে তাঁর ভোগবাদী সত্ত্বাকে দূরে বহুদূরে নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন সুফী দার্শনিকের মত নিরাসক্ত এক সত্ত্বা, এক পুরুষ।
সংসার জীবন
তিনি ১৯৫৭ সালের বসন্তকালে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলাধীন জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের অন্তর্গত কামারগাঁও নিবাসী মরহুম ছয়ফুল্লাহ তালুকদার সাহেবের বড় মেয়ে নুরুন্নাহার খানমকে বিয়ে করেন। বিয়ে সম্পর্কে একটি মজার ঘটনা জানা যায়। তা হলো এই যে, আব্দুল হাই সাহেব কিন্তু একজন সুবক্তা ছিলেন। তাঁর বাচনভঙ্গি, শব্দচয়ন, ও প্রকাশভঙ্গি ছিল রুচিশীল, মনমুগ্ধকর এবং আকর্ষণীয়। তাঁর বক্তৃতা মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনতো। তেমনি ঈদ ই মিল্দুন্নবী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নবীর জীবনের উপর তিনি বক্তব্য রাখছিলেন। ঐ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তাঁর হবু শ্বশুর জনাব ছয়ফুল্লাহ তালুকদার সাহেব। আব্দুল হাই সাহেবের বক্তৃতা তাঁর এতো ভালো লেগেছিল যে তিনি মনে মনে ভাবছিলেন যদি এরকম একটা ছেলের হাতে তাঁর বড় মেয়েটিকে পাত্রস্থ করতে পারতেন। যা হোক আল্লাহপাক তাঁর মনোবাসনা পূর্ণ করেছিলেন। পরবর্তীতে জনাব আব্দুল হাই সাহেবের সাথেই তাঁর মেয়ে নুরুন্নাহার খানমের বিয়ে হয়েছিল। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানী। যা হোক উক্ত বিয়েতে সুনামগঞ্জের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেছিলেন। তখনকার সময়ে এমন সহজ সড়ক যোগাযোগ ছিল না। বর্ষাকালে নৌকা এবং হেমন্তে পায়ে হেঁটেই চলাচল করতে হতো। তবে এই বিয়েতে সুনামগঞ্জের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বরযাত্রী গিয়েছিলেন। জানা যায় দেওয়ান আনোয়ার রেজা চৌধুরী, আফাজ উদ্দিন, মন্টু বসু, সহ প্রায় ৫০ জন বরযাত্রী গিয়েছিলেন। ৩ কন্যা ও ১ পুত্র সন্তানের জনক তিনি। তন্মধ্যে বড় মেয়ে এবং পুত্র মৃত্যুবরণ করেছেন। দুই মেয়ের উভয়েই সিলেটে স্বামীর সাথে বসবাস করছেন। এক মেয়ে সিলেট মহিলা কলেজের প্রভাষক এবং অপর মেয়ে গৃহিণী। তিনি তাঁর সন্তানদের খুবই ¯েœহের সাথে সম্বোধন করতেন। প্রায়শই পুরো নাম ধরে সম্বোধন করতেন। আমি নিজে শুনেছি তাঁর বড় মেয়েকে তিনি যখন ডাকতেন ¤েœহময় কন্ঠে ‘দীপানাহার মুর্শেদা কোথায় রে’। এই ¯েœহময় কন্ঠধ্বনিটি আজো আমার কানে লেগে রয়েছে। আসলে তিনি একজন ¯েœহময় পিতা ছিলেন। ¯েœহবশত তিনি তাঁর প্রেসের নাম প্রথমে বড় মেয়ের নামে ‘মুর্শেদা’ আবার পরে ছোট মেয়ের নামে ‘অনুপম প্রেস’ দিয়েছিলেন।
১৯৭৭ সালে পুরাতন বাসস্টেশনে হোটেল গুলবাগে রেস্টুরেন্ট চালু করা হয়। প্রতিদিন একবার হলেও তিনি দুপুরে ১২ টা থেকে ১টার মধ্যে রেস্টেুরেন্টে এসে এককাপ চা খেতেন। একটা নির্দিষ্ট টেবিলে এসে তিনি বসতেন। বেয়ারাকে চায়ের অর্ডার দিতেন। বেয়ারা চা দিত তিনি একটা সিগারেট ধরাতেন। অনেকটা সময় নিয়ে চা খেতেন। কারো সাথে তেমন কোন কথাবার্তা বলতেন না। তাঁকে সবাই সমীহ করতাম কাজেই তিনি আসলে সবাই সরে যেতাম। তিনি চেয়ারে বসে দরজা দিয়ে বাহিরের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। উদাস দৃষ্টিতে বাহিরের পানে চেয়ে থাকতেন মনে হতো তিনি সব কিছু দেখছেন। কিন্তু আমার মনে হয় তিনি বস্তু জগত বা বাহ্য জগতের কিছুই দেখছেন না। তাঁর ভেতরের সত্ত্বা যেন অদৃশ্য জগতের কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। এমনি নিয়মিত আসা যাওয়ার মাঝে তাঁর এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য একটি দিন নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছিল। ১৯৮৩ সালের ২৫ শে এপ্রিল নিত্যদিনের মত দুপুর ১২টার দিকে উক্ত রেস্টুরেন্টে এসে নির্দিষ্ট চেয়ারটিতে বাইরের দিকে মুখ করে বসলেন। বেয়ারাকে চায়ের অর্ডার দিলেন, চুরুট ধরালেন। এই সময়টাতে রেস্টুরেন্টে তেমন ভীড় থাকে না। ১টার পর থেকে দুপুরের খাবারের জন্য খদ্দেরের ভীড় বাড়তে থাকে। তাই রেস্টুরেন্ট প্রায় ফাঁকাই বলা যায়। ক্যাশ টেবিলের পাশের চেয়ারটিতে বসা ছিলেন হোটেলের মালিক মঈনুল ইসলাম এবং অন্য আরেকটি চেয়ারে বসেছিলেন জুবিলী স্কুলের শিক্ষক উজানীগাঁও এর বাসিন্দা জনাব আব্দুর রউফ স্যার। আজ যেন আব্দুল হাই সাহেবের উদাসী ভাবটা একটু চঞ্চলতা পেয়েছে চোখ দুটো যেন এক অজানা খুশিতে চিক চিক করছে। যেন কোন আশা পূর্ণ হয়েছে এমন আনন্দে উদ্ভাসিত। কিন্তু হায় কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখতে দেখতে উনার শরীর ঝুল খেয়ে গেল। দ্রুত ধরে উনাকে উত্তর শিয়র করে শোয়ানো হলো। এমন সময় রাস্তায় দেখা গেল বিহারী ডাক্তার সাহেব যাচ্ছেন। তাঁকে ডেকে এনে দেখানো হলো। তিনি পরীক্ষা করে বললেন, তিনি আর ইহ জগতে নেই। ৫৬ বৎসর বয়সে তিনি পরলোক গমন করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহী রাজিউন। পেছনে পড়ে রইলো প্রিয়তমা স্ত্রী, আদরের সন্তান, কাছের ও দূরের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, বাড়ীঘর, সমাজ, চেনা পরিবেশ সবকিছু। শুধু রেখে গেলেন দীর্ঘ দিনের আলোকিত এক বর্ণাঢ্য কর্মজীবন। যা তাঁকে বারবার আমাদের মাঝে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে। তাঁর আলোকিত জীবনকে স্মরণ করে আগামীর প্রজন্মরা অনুপ্রাণিত হবে।
লেখক: চিকিৎসক ও কবি
তথ্যসূত্র
১.জনাব আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন রচিত ‘সুনামগঞ্জ জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য গ্রন্থ’
২.আলী ইউনূছ সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জ’ গ্রন্থ
৩.মৌখিক ভাষ্য
বাবু ধূর্জটি কুমার বসু (রাখাল স্যার)
আনোয়ার চৌধুরী আনুল আমেরিকা প্রবাসী
প্রভাষক অনুপানাহার ওয়ালেদা, সিলেট
জনাব আব্দুল গফুর চৌধুরী, ষোলঘর
জনাব আতাউর রহমান তালুকদার, কামারগাঁও