বাঁধে ধস নামার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ২ উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারি প্রকৌশলীকে প্রশ্ন করা হলে উভয়েই বলেন, এরকম হবে আগে বুঝা যায়নি। কী অদ্ভুত জবাব। এই প্রকৌশলীরাই বাঁধের জায়গা নির্ধারণ, প্রাক্কলন ও ডিজাইন তৈরি করেছেন। তারা কারিগরী জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তা। অথচ নদীতে পানি সামান্য পরিমাণে বাড়লে পানির চাপে বাঁধে ধস নামতে পারে এমন পূর্বানুমান করতে পারেননি তারা। ফলে প্রায় ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বাঁধ দুটি হুমকির সামনে পড়ে গেছে, অন্যদিকে বাঁধ ধসে যাওয়ায় ফসল হানির শংকায় সংশ্লিষ্ট কৃষকরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সময় পার করছেন। বর্ণিত বাঁধ ২টি হলোÑজগন্নাথপুর উপজেলার কলইকাটা বাঁধ ও জামালগঞ্জ উপজেলার গনিয়ারভাঙা বাঁধ। গত কয়েকদিন ধরে হালকা বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এতে নদীর পানি সামান্য বেড়েছে। এর চাপ এসে পড়েছে বাঁধ দুইটিতে। বাঁধের নীচের মাটি সরে যাওয়া শুরু হয়েছে। বাঁধে ধস দেখা দিয়েছে। কলইকাটার আগের বাঁধের অদূরে এখন জরুরিভাবে বিকল্প আরেকটি বাঁধ নির্মাণ শুরু করা হয়েছে। এতে ব্যয় হবে অতিরিক্ত ১০—১২ লাখ টাকা। গনিয়ারভাঙা বাঁধের জরুরি কাজ শুরু করা হয়েছে। জেলার বিভিন্ন বাঁধে প্রয়োজনাতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়ার অভিযোগ আছে। কোন কোন বাঁধে সামান্য মাটি ফেলে বড় অংকের বরাদ্দ উঠিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা চালু আছে। এরকম অবস্থায় ত্রুটিপূর্ণ নকশা ও প্রাক্কলন তৈরির কারণে বাঁধ ধসে যাওয়ার আরেকটি গুরুতর অভিযোগ সামনে আসল। এখনও মূলত পানির সেইরকম বেগ শুরু হয়নি। এখন নদীতে যে পানি বেড়েছে তা মৃদু মাত্রার। এই মৃদুমাত্রার পানির চাপই সহ্য করতে পারছে না আমাদের বিজ্ঞ প্রকৌশলীদের নকশায় নির্মিত বাঁধগুলো। তাহলে তাঁদের কারিগরী জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তোলা অবান্তর কিছু হবে না। এই হচ্ছে বাঁধ নির্মাণের প্রকৃত অবস্থা। কোথাও কোন জবাবদিহিতা নেই। বাঁধ ভাঙলে আরও টাকা খরচ করতেও কোন অসুবিধা নেই। ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইন বা স্থান নির্বাচনের জন্য কাউকে কোন ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখী হতে হয় না। কী আশ্চর্য নির্লিপ্ততা।
জামালগঞ্জ ও জগন্নাথপুরের ২টি বাঁধ ধসে পড়ার খবর থেকে কৃষক ও জনসাধারণের দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরেকটু বাড়লে বাকি বাঁধগুলো পানির তোড়ের বিরুদ্ধে কেমন ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারে সে নিয়ে। ২০১৭ সনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে কোন বাঁধই মূলত প্রতিরোধ গড়ে তোলতে পারেনি। এরপর ঠিকাদারী প্রথার অবসান হয়। আসে পিআইসি ব্যবস্থা। পিআইসি ব্যবস্থা চালুর পর গত ৪ বছর কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় বাঁধগুলোকে কোন পরীক্ষার সামনে পড়তে হয়নি। কিন্তু কৃষক ও নাগরিক সমাজের নানা অভিযোগ ছিলই। মূলত অকাল বন্যা ও পাহাড়ী ঢলের প্রকোপ থেকে বোরো ফসল রক্ষার জন্যই সরকার বাঁধ নির্মাণের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেন। যেমন এবারও ৭২৭টি পিআইসির মাধ্যমে ১২১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কার্যত এসব বাঁধ কিছু অসৎ ব্যক্তির অর্থ উপার্জনের খাত হয়ে উঠেছে বলে আমরা গণমাধ্যমের সংবাদ বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারি। পিআইসি প্রথার প্রথম বছরে কিছু ভাল কাজ হয়েছিল। এরপর পিআইসি প্রথাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবদুষ্টতা, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে পিআইসি গঠনের অভিযোগ সর্বত্রই উত্থাপিত হয়েছে। দুর্বল বাঁধ এমন দুর্নীতিপ্রবণতারই ফসল।
আমাদের দুর্ভাগ্য হলোÑ এখানে কোন ব্যবস্থাকেই শেষ পর্যন্ত স্বচ্ছ রাখতে দেয়া হয় না। প্রতিটি ব্যবস্থাকেই দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফেলা হয়। আর এর ভুক্তভোগী হন সাধারণ মানুষ। বাঁধের দুর্বলতার কারণে ফষল হানি হলে দুর্ভোগে পড়বেন কৃষকরা। তাঁদের কষ্টার্জিত সোনালী ফসল চোখের সামনে পানিতে ডুবে যাবে। বাঁধের কাজ যারা করেছে তাদের গাফিলতিকে কখনও কোন জবাবদিহিতার আওতায় আনা যাবে না। যেমন আনা সম্ভব হবে না জগন্নাথপুর ও জামালগঞ্জের ২ উপসহকারী প্রকৌশলীকে যারা অনায়াসে বলে ফেলতে পারেন, বাঁধে ধস নামার বিষয়টি তারা আগে বুঝতে পারেননি।