বিশেষ প্রতিনিধি
১০ বছর আগের পুরাতন বাঁধ কাম সড়ক (ছায়ার হাওর উপ—প্রকল্পের শারফিন স্কুল ও আনন্দপুরের মাঝখানের অংশ) একসময় সড়ক ও জনপথ কতৃর্পক্ষ নির্মাণ করেছিল। আগাম বন্যার স্বাভাবিক পানিতে এই সড়ক ডুবায় না। দেখলাম ওখানে ২০ লাখ টাকার মাটির কাজের সাইনবোর্ড লাগানো। আমার মনে হয়েছে, বাঁধ ব্যবসার জন্য এটি করা হয়েছে। না হয় পাশের মাদারিয়া বাঁধের প্রকল্পের সঙ্গে দুই লাখ টাকার মাটি বাড়িয়ে দিলেই এই অংশের সংস্কার করা যেত।
কথাগুলো বলছিলেন, হাওর বাঁচাও আন্দোলনের শাল্লা উপজেলা শাখার সভাপতি সহকারী অধ্যাপক তরুণ কান্তি দাস। তরুণ কান্তি দাস জানালেন, বন্যায় বাঁধের ক্ষতি হয়েছে এটি সত্য, যেমন কাশিপুরের পাশের বাঁধ অন্য বছর ভাঙেনি, গত বন্যায় সেটি ভেঙেছে। এখানে কাজ করতে হবে। কিন্তু বাঁধের কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা যেভাবে বলছেন, এবার দ্বিগুণ প্রকল্পের প্রয়োজন, সেটা ঠিক নয়। দ্বিগুণ প্রকল্প তৈরি হলে বাঁধের ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে। এমনিতেই বাঁধে লুটপাট হয়, এভাবে প্রকল্প তৈরি হলে লুটপাটের ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে। সরকারের বড় অংকের টাকা লোপাট হবে।’
খেঁাজ নিয়ে জানা গেল, শাল্লায় গেল বছর বাঁধের প্রকল্প ছিল ১৩৮ টি। একেকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইস) সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দের হয়ে থাকে। এবছর ইতিমধ্যে শাল্লায় ১২৭ টি প্রকল্পের প্রাথমিক অনুমোদন হয়েছে। উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী জানিয়েছেন, ১৯৫ টি বাঁধের কাজের প্রকল্প এবার তাকে প্রস্তুত করতে হবে। অর্থাৎ এই উপজেলায় প্রকল্প বাড়বে ৬৮ টি। ব্যায় বাড়বে ১৫ থেকে ১৭ কোটি টাকা। এটি আদৌ যুক্তসঙ্গত কী—না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠেছে।
শাল্লার প্রবীণ এক রাজনীতিক বললেন, আমি সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। নাম ব্যবহার করা ঠিক হবে না। হাওরের ফসল রক্ষার নামে এখন বাঁধের ব্যবসাই মুখ্য হয়ে ওঠেছে। স্থানীয় সংশ্লিষ্টরা এই ব্যবসার ভাগ পাচ্ছেন। তিনি বললেন, গত বছর ১৩৮ প্রকল্পের ১০০ প্রকল্পে ১০ শতাংশ বরাদ্দে কাজ হয়েছে, ৩০ প্রকল্পে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বরাদ্দে এবং বাকী আট প্রকল্পে ৪০—৫০ শতাংশ বরাদ্দে কাজ হয়েছে। বাকী টাকা লুটপাট হয়েছে। এবার প্রকল্প বাড়ানো হচ্ছে বাঁধ ব্যবসা ও লুটপাটের জন্য।
এই রাজনীতিবিদ বললেন, দিরাই—শাল্লা সড়কের সুখলাইন গ্রামের পাশের সড়কের উপর ছায়ার হাওরের ২৪ নম্বর পিআইসিতে এবার ১৭ লাখ ৩০ হাজার ৪৫৮ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। এখানে কাজ করতে চার লাখ টাকার বেশি খরচ হবে না।
শাল্লা উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী আব্দুল কাইয়ুম বললেন, গত জুনের ভয়াবহ বন্যায় বেশিরভাগ বাঁধ ধসে গেছে। পানি প্রবাহ বেশি থাকায় বাঁধের উপরের মাটি সরে গেছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় বাঁধের উপরের অংশ ক্ষয় হয়েছে বেশি। তাছাড়া মাটির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে প্রকল্প বাড়ছে।
প্রকল্প বাড়ার এই চিত্র কেবল শাল্লায় নয়। বেশিরভাগ উপজলায় এবার প্রকল্প বাড়ছে। অজুহাত হিসাবে বন্যার কথা বলা হলেও হাওরপাড়ের কৃষকরা বলেছেন, বাঁধতো প্রতিবছরেই পানিতে ডুবে। এবার ঢলে বাঁধের ক্ষতি হয়েছে সত্য। কিন্ত সবগুলোর নয়। দায়িত্বশীলরা সকল বাঁধেই নতুন প্রকল্প করছেন।
বিভিন্ন উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, জামালগঞ্জে গেল বছর প্রকল্প ছিল ৪০ টি, এবার হচ্ছে ৬৪ টি, ২৪ টি প্রকল্প বাড়বে। তাহিরপুরে গেল বছর প্রকল্প ছিল ৬৮ টি, এবার ৪২ টি বাড়িয়ে ১১০ টি, ছাতকে ছয়টি বাড়িয়ে ৩০ টি, শান্তিগঞ্জে ৪৫ টি বাড়িয়ে ১০১ টি, সুনামগঞ্জ সদরে গেল বছর ছিল ২৬ টি, এবার দ্বিগুণের চেয়ে বেশি বাড়ছে। এবছর ৭১ টি প্রকল্প প্রস্তুত হচ্ছে। গত বছর এই উপজেলায় ব্যয় হয়েছিল পাঁচ কোটি টাকা। এবার হবে ১৪ কোটি টাকা।
জগন্নাথপুরে গত বছর ছিল ২৮ টি প্রকল্প, এবার ৪৬ টি প্রস্তুত করা হচ্ছে। দিরাইয়ে গত বছর ১০৪ টি ছিল, এবার ৬৩ টি বাড়িয়ে ১৬৭ প্রকল্প প্রস্তুত হয়েছে। বিশ^ম্ভরপুরেও দ্বিগুণ প্রকল্প হচ্ছে। গত বছর ছিল ৩৫ টি, এবার ৬৫ প্রকল্প প্রস্তুত হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, এবার সুনামগঞ্জের ৪৮টি হাওরে বাঁধের কাজ হবে। ইতিমধ্যে ৯০৪টি প্রকল্প প্রস্তুত হয়েছে। এর মধ্যে জেলা কমিটিতে ১৯৩ টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কাজ শুরু হয়েছে ৪০ টিতে। এবার বন্যায় বাঁধ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গত বছরের চেয়ে ২১৭ টি প্রকল্প ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) বাড়বে। বন্যায় বিগত বছরে ক্ষতি বেশি হয়েছে। বাঁধের উচ্চতাও কমে গেছে। এছাড়া বাঁধের পাশের ডুবাও এবার ভরাট হচ্ছে। এজন্য প্রকল্প ও প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। তিনি জানান, এবার ৬২৫ কিলোমিটার বেড়ি বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে প্রাক্কলন ধরা হয়েছে ১৭০ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত বরাদ্দ পাওয়া গেছে ১০০ কোটি টাকা। গত পাঁচ বছরের কাজের মধ্যে ২০১৭ সালে প্রকল্প ছিল সবচেয়ে বেশি, ৯৬৫ টি। ওই বছর জেলার সব কয়টি হাওরের ফসল ডুবেছিল।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ—পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম জানালেন, এবার সুনামগঞ্জে দুই লাখ ২২ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে।