বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
একদিকে পানিতে ফোলাফাঁপা নদী, আরেকদিকে একফসলী হাওর, মাঝখানে সরকারি বরাদ্দে বাঁধা ফসল রক্ষা বাঁধ। এ তিনের মাঝখানেই যেন বন্দী কৃষকের জীবন। কখনও প্রচণ্ড খরায় কয়লা দেহ, কখনও বানের পানিতে ডোবা যন্ত্রণা, সবকিছু মিলেই তো হাওরে কৃষকের সংগ্রামমুখর পথচলা। এ যাত্রাপথে তাদের সম্বল একফসলা জমি। এতে সুখ, শান্তি ও স্বপ্নের পুরোটাই মিশে আছে কৃষকের। যদি এর ব্যত্যয় ঘটে তাহলে তাদের জীবনটাই যে অসারে পরিণত হয়। দুঃখ-কষ্টে ছেয়ে যায় পরিবার, পুরো সংসার। তাই হাওরই জীবন, হাওরই মরণ কৃষকের।
এ বছর পাহাড়ী ঢলে স্বপ্নের সলিল সমাধি হতে হতে বেঁচে যায় জামালগঞ্জের কৃষক। সময়মতো ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ পুরোপুরি শেষ করতে না পারার যন্ত্রণা পেয়ে বসেছিল হাওর পারের মানুষকে। সর্বশেষ অবহেলিত এ মানুষগুলোই বাঁধ রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গেছে। সোনালী হাওর অক্ষত রাখতে সমর্থ হয় তারা। স্থানীয় কৃষকের যৌথ প্রচেষ্টা রাক্ষুসে নদীর চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে রুখে দেয় বাঁধের পানি প্রবাহমান বিশাল সুরঙ্গপথ। যদিও এতে প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পাউবো সংশ্লিষ্টদের ভূমিকাও স্মরণযোগ্য, তবু বাঁধ রক্ষায় কৃষকের ভূমিকাই যে মুখ্য, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
জানা যায়, জামালগঞ্জের বেহেলী ইউনিয়নের মহালিয়া হাওর বাঁধের সুরঙ্গপথে পানি ঢুকতে ঢুকতে একসময় যখন বিশাল আকার ধারণ করে তখন একরকম বাঁধ রক্ষার হালই হয়তো ছেড়ে দেন স্থানীয় প্রশাসনসহ অনেকে। কিন্তু হাল ছাড়তে নারাজ হাওর পারের সংগ্রামী কৃষকেরা। তাদের একজন দেবাশীষ তালুকদার। বেহেলী ইউনিয়নের সদ্য নির্বাচনে বিজয়ী দুই নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য তিনি। মহালিয়া হাওর পারের মদনাকান্দি গ্রামের এই বাসিন্দা পার্শ্ববর্তী হিজলা ও নওয়াপাড়া গ্রামের কৃষক সুশীল সরকার, চন্দন বর্মন, রূপন সরকার, রতন বর্মন, হেমন্ত সরকারের সাথে বাঁধে নামেন কাজ করতে। সামর্থের সর্বশক্তি ব্যয় করে অনিশ্চিত হাওরকে রক্ষা করার কাজে ভূমিকা রাখেন সকলে।
খেঁাজ নিয়ে আরও জানা যায়, মহালিয়া হাওরে ৪টি হাওর রক্ষা বাঁধ রয়েছে। এর মাঝে ৫ ও ৬ নম্বর পিআইসির কাজের দায়িত্বে আছেন দেবাশীষ তালুকদার। তার দুইটি বাঁধের সংযোগে একটি বিশাল ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজার ছিল। সরকারি বরাদ্দে হাম্মকখালির এ ক্লোজারটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বাঁধতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। নদীতে দুই দফা পানি বাড়লেও এ বাঁধে এখন পর্যন্ত কোন ঝুঁকি নেই। তবু তিনি বসে থাকেননি। হাওর রক্ষার স্বার্থে সকলের সাথে একই হাওরের (হিজলা গ্রামের পূর্বে) ৮ নম্বর পিআইসির কাজে নেমে পড়েন হাওর পারের এই সংগ্রামী কৃষক। শেষতক দিনরাত বাঁধে পড়ে থেকে সফল হন দেবাশীষসহ সঙ্গীয় কৃষকেরা। এর ফলে রক্ষা পেয়েছে মহালিয়া হাওরের জামালগঞ্জ অংশের ২৫০ হেক্টর সহ অন্তত ৬৫০ হেক্টর বোরো ফসল। এ হাওরে জামালগঞ্জ, মধ্যনগর ও তাহিরপুর এই তিন উপজেলার হাজারও কৃষকের জমি আছে বলে জানা গেছে।
গতকাল মহালিয়া হাওর সরজমিনে পরিদর্শনে গেলে কথা হয় ধান কেটে বাঁধেই ঝাঁক দেওয়ার কাজে ব্যস্ত মদনাকান্দি গ্রামের কৃষক প্রভাত সরকার ও জীবনকৃষ্ণ তালুকদারের সাথে। তারা বাঁধের কাজে কৃষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ স্বীকার করে বলেন, ‘আমরার সব জমিই এই মহাইল্যা হাওরে। হিজলা বাঁধের অবস্থা যে পর্যায়ে গিয়েছিল যদি ভাইঙ্গা যাইতো তাহলে সব শেষ হইয়া আমরা পঙ্গু হইয়া যাইতাম। এই বাঁধ আমরা কৃষকেরাই রক্ষা করছি। রাইতে—দিনে খুব পরিশ্রম করতে হইছে। আমরার সাথে দেবাশীষ বাবুও রাইতে—দিনে কাজ করছেন বাঁধে।’
এ ব্যাপারে দেবাশীষ তালুকদার বলেন, আমি একজন কৃষক। এ বছর প্রায় সাড়ে ৫ হাল জমি করেছি। কৃষক হিসেবে হাওরের বাঁধ রক্ষায় যেমন দায়বদ্ধতা আছে তেমনি একজন ইউপি সদস্য হিসেবেও কৃষকের পাশে দাঁড়ানো আমার দায়িত্ব। সেই জায়গা থেকে বাঁধ রক্ষায় কাজ করেছি। তবে কৃষকের পাশাপাশি ইউএনও, ডিসি স্যার ও পাউবো কর্মকর্তারাও আমাদেরকে সাপোর্ট দিয়েছেন। বাঁধের অবস্থা বেগতিক দেখে একসময় সম্ভবত আমাদের ইউএনও স্যার আশা ছেড়েই দিয়েছেন যে এ বাঁধ আর টিকানো সম্ভব নয়। তারপরও তিনি আমাদেরকে সাহস দিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন। সর্বশেষ ভোর রাতে ইউএনও স্যার চলে গেলে আমরা ওইদিন সকালে সাধ্যমতো কাজ করে সফল হয়েছি। পরে মন্ত্রী মহোদয় এ বাঁধে এসেছেন। তিনি ডিসি স্যারের মুখে আমাদের কথা শোনে ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন। পরে এই টাকা ইউএনও স্যারের নির্দেশে বাঁধে কাজ করা কৃষকের মাঝে বন্টন করে দিয়েছি।
পানি বাড়ার শুরু থেকে হাওর রক্ষা বাঁধে ব্যস্ত থাকা বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান সুব্রত সামন্ত সরকার বলেন, আসলে মহালিয়া নিয়ে আমরা খুবই চিন্তিত ছিলাম। আমরা বাঁশ—বস্তা যা প্রয়োজন সব সাপোর্টই দিয়েছি। কিন্তু এ বাঁধটি রক্ষায় স্থানীয় কৃষকেরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। বিশেষ করে পিআইসির যে চন্দন, রতন ও হিজলা নওয়াপাড়া গ্রামের নিরঞ্জন বাবু, সুশীল সরকার এবং আমার পরিষদের মেম্বার দেবাশীষ বাবু দিনরাত যে কাজ করেছে তাতে আমরা কৃতজ্ঞই বলতে পারি। এছাড়া আমাদের ইউএনও মহোদয়ও বাঁধে বাঁধে যথেষ্ট ভূমিকা রেখে চলেছেন। এখন কৃষক সোনালী ফলন ঘরে তুলে যখন তৃপ্তির হাসি হাসবে তখন মনটা আনন্দে ভরে উঠবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব বলেন, হিজলা বাঁধ রক্ষায় স্থানীয় কৃষকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এ হাওরে যাদের জমি আছে তারা সবাই আন্তরিক ছিল। বিশেষ করে ওই (৮ নম্বর) পিআইসি সভাপতি চন্দন ও রতনসহ এখানকার কৃষকেরা দিনরাত কাজ করেছেন। এখানকার ইউপি সদস্য হিসেবে দেবাশীষ বাবুও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছেন। সবার আন্তরিক সহযোগিতায়ই বাঁধটি রক্ষা পেয়েছে।