- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

বাংলা ভাষাচর্চাকে রাষ্টীয়ভাবে সর্বস্তরে নিশ্চিত করা দরকার

ওবায়দুল মুন্সী
প্রাবন্ধিক জহুরুল হক তাঁর ‘অস্তিত্বে একুশ’ গ্রন্থে লিখেছেন-‘ভাষা এদেশবাসীর খুব আদরের এবং আবেগের বস্তু,তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তার জন্যে কারো কোনো দায়িত্ব নেই,এমনকি পরিশ্রমের প্রয়োজন নেই,একথা ভাবলে চলবে কেন?’ সত্যিই তো! কোনও ব্যবসায় যেমন-অর্থের প্রয়োজন হয়, তারচে বেশি প্রয়োজন হয় ক্রেতার চাহিদানুযায়ী পণ্য সরবরাহ করা। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার যখন উর্দুকে বাঙালি নাগরিকের একমাত্র ভাষা ঘোষণা দেয় ;তখনই বাংলা ভাষার চাহিদা অনুভব করতে পারে। বাংলাভাষী নাগরিক মাতৃভাষার মর্মকে উপলদ্ধি করেই জীবনের বিনিময়ে এই বাংলা ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট হয়েছিল।
ভাষাসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য ও গবেষণা থেকে জানা যায়,বাংলাভাষী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩০ কোটি। এর মধ্যে বাংলাদেশে ১৬ কোটি; ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা মিলিয়ে ১২ কোটি এবং পৃথিবীময় ছড়িয়ে থাকা বাঙালির সংখ্যা কম-বেশি এক থেকে দেড় কোটি। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের ভাষাকে তৎসময়ে বাঁচিয়ে রাখা ছিল খুবই যুক্তিবহ ও ইতিবাচক। বিশ্বজুড়ে এখনও কত ভাষা যে নিজের ভাষী হারিয়ে বিপন্ন হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বাংলাভাষার সমাদর দেশ ছেড়ে বিদেশেও রয়েছে। বিদেশি অনেক নাগরিক বাংলাভাষা চর্চা করছে। ফেসবুকে একটি পেইজে দেখেছি, চায়নার কয়েকটি মেয়ে তাঁদের ইতিহাস ঐতিহ্যকে বাংলায় উপস্থাপন করছে এটা খুবই গর্বের ব্যাপার। তারপরও নিরপেক্ষ চোখে দেখলে মনে হয়-আমাদের ভালোবাসার প্রিয় বাংলা ভাষার মূল স্বকীয়তা কেন জানি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। যার জন্যে মূলত আমরাই দায়ী।
এজন্য, লেখক বলেছেন-‘আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি; তারপর ইংরেজি শেখার পত্তর’ প্রয়োজনে অন্যান্য ভাষা চর্চা করা যেতেই পারে কিন্তু নিজের মাতৃভাষাকে ভুলে গিয়ে নয়। চলতি বিশ্বে দেখা গেছে আন্তর্জাতিকভাবে যোগাযোগব্যবস্থায় ইংরেজি ভাষার স্থান সবার ওপরে। ইংরেজি ভাষার এই আধিপত্য বিস্তার সম্ভব হয়েছে ইংরেজদের ঔপনিবেশিক যাত্রার কারণে। ভারতবর্ষ তথা বাংলাদেশ থেকে ঔপনিবেশিক ধারার মূলোৎপাটন হলেও এর প্রভাব থেকে গেছে আমাদের অফিস-আদালত, শিক্ষা ও দৈনন্দিন কর্মপরিচালনায়। একসময় ফারসি ভাষা ভারতের দাপ্তরিক ভাষা ছিল, সে ভাষা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হলেও দাপ্তরিকভাবে ইংরেজি ভাষার হাত থেকে আমাদের মুক্তি নেই। অথচ পৃথিবীতে এমন অনেক জাতি যেমন: জাপান ও কোরিয়া। তাঁরাও ইংরেজি ভাষার প্রবল প্রতিপত্তিকে উপেক্ষা করে তাঁদের মাতৃভাষায় রাষ্ট্রীয়, দাপ্তরিকসহ সব কাজ সম্পন্ন করছে।
বাংলা ভাষাকে আজ জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক ভাষা করার দাবি উত্থাপিত হয়েছে। এমনকি দেশের সরকারপ্রধানও বাংলায় জাতিসংঘে বক্তৃতা দিচ্ছেন। কিন্তু আমাদের প্রাণের প্রিয় বাংলা ভাষা নিজ মাটিতেই কত যে অবহেলার শিকার, তার নজির ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। আমাদের বিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যপুস্তক খুললে শিশুদের জন্য ভুল বানান আর ভুল বাক্যের ছড়াছড়ি দেখা যায়। গত বছরের অষ্টম শ্রেণির ‘নিজেকে জানো’ বইটি হাতে নিয়ে ভাষা শহিদদের নিয়ে একটি লেখা পাঠ করেছিলাম। সেখানে শুধু চারজন শহিদের নাম দেখেছি। তাহলে ছাত্রছাত্রীরা কী শিখছে? ভাষা শহিদ কি চারজনই ছিলেন? ভাষা শহিদ শফিউর রহমান সহ অন্যান্য নামও তো দেয়া যেত। তখন ভাষা শহিদদের মূল ইতিহাস ছাত্রছাত্রীদের অন্তরে গাঁথা হতো। সেখানে পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সম্মানিত সদস্যবৃন্দ যাঁরা তাঁরাও কি বিষয়টি দেখেননি? এই যদি হয় শিক্ষাব্যবস্থা তবে বাংলা ভাষার কি হাল,হবে তা বোঝাই যাচ্ছে। ভাষাবিদ সৌরভ সিকদার, বাংলা ভাষা নিয়ে লিখেছেন-‘প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে অধিকাংশ শিক্ষকেরই নেই প্রমিত বাংলা উচ্চারণদক্ষতা। ফলে আমাদের নতুন প্রজন্ম বিদ্যাপীঠ থেকে ভুল উচ্চারণ ও ভুল বানানে মাতৃভাষা শিখছে। সবচেয়ে মহাবিপদ হয়ে উঠেছে হিন্দি ভাষার সিরিয়াল এবং হিন্দিতে ডাবিং করা কার্টুন ও অন্য অনুষ্ঠানগুলো।’ আর এফএম রেডিওর যা অবস্থা! আমার বাংলা ভাষী মা-বাবার সোনার ছেলে-মেয়েরা যেভাবে বাংলা ভাষাকে বাংলিশ করে উপস্থাপন করছে তা শুনলে মরে যাওয়ার ইচ্ছে করে। শিশুকাল থেকেই অনেকেই সন্তানদের ভালো ক্যারিয়ার গড়ার আশায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে ভর্তি করিয়ে দেন। যারফলে, শিশুরা বাংলা বর্ণমালা ভালো করে বুঝার আগেই ইংরেজি বর্ণমালাকে জোর করে তাদের মনের ভেতর ভরে দেয়া হয়। বড় হয়ে এঁরা অনেকেই হয়তো ভালো ক্যারিয়ার গড়তে পারে কিন্তু বাঙালি হয়ে ওঠে না অবাঙালি হয়ে ওঠে সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়ে যায়।
একসময় গ্রিক, লাতিন ও সংস্কৃত খুব দাপটের সঙ্গে পৃথিবীতে চর্চা হয়েছে। এ ভাষার সাহিত্যসম্ভার পাঠ করে আজও আমরা আবেগাক্রান্ত হই, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে বাংলা ভাষা এখন সংগ্রহশালা আর গবেষণার ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাষা আন্দোলনের পর থেকে প্রায় ৭২ বছর চলে গেছে কিন্তু বাংলা ভাষার ভিত্তি এখনও রাষ্টীয়ভাবে মজবুত হতে পারেনি।
গণমাধ্যমের থেকে জানতে পেরেছি, কিছুদিন আগেও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সরকার আইন করে রাজ্যের সব বিলবোর্ডে বাংলা লেখা বাধ্যতামূলক করেছে। আশির দশকে বাংলাদেশ সরকারও করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ সেটা ধরে রাখতে পারেনি। প্রতিবেশী দেশ নেপালেও দু’বছর আগে তাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক সরকারি প্রজ্ঞাপনে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম বিদেশি ভাষা পরিত্যাগ করে স্থানীয় ভাষায় রাখার আদেশ জারি করেছিল। দু’মাসের মধ্যে নাম পরিবর্তন না করলে অধিভুক্তি বাতিলসহ শাস্তি প্রদানের কথাও বলেছিল। তারই পরিপেক্ষিতে, সেখানে ‘ইস্টার্ন স্কুল’ যদি হিমালয় বিদ্যালয় হতে পারে, তাহলে বাংলাদেশে প্রায় ৯০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, যেগুলোর মাত্র কয়েকটি বাংলা নাম রয়েছে। বাকি সবই ইংরেজি নামে চলছে। যদি মঞ্জুরি কমিশন বা মন্ত্রণালয় থেকে প্রকৃতভাবে প্রস্তাব করে সরকার চাইলেই সেগুলোর বাংলা নাম রাখা খুবই সহজ ব্যাপার। বাংলাদেশের ক্যালেন্ডারেও ইংরেজি সংখ্যাগুলো বড় করে লিখে আর অতিছোট করে বাংলা সংখ্যা লিখে যা দেখে মনে হয় এই দেশ যেন আবার ইংরেজরা শাসন করে যাচ্ছে।
আজকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নিয়ে আমরা অনেক গর্ববোধ করি, কিন্তু এখনও বাংলা ভাষাচর্চাকে রাষ্টীয়ভাবে সর্বস্তরে নিশ্চিত করতে পারিনি। সত্যিই এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক,সুনামগঞ্জ সাহিত্য সংসদ (সুসাস) গণপাঠাগার।

  • [১]