বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয়সহ সকল ধরনের পণ্যের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে আমদানিকারক-ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ানোর বিষয়টি উল্লেখ করেন। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়ে-কমে। সুতরাং অভ্যন্তরীণ বাজারে আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়াটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আমাদের বাজার মওকা পেলেই সিন্দবাদের দৈত্যের মতো ঘাড়ে চেপে সেই যে দাম বাড়িয়ে দেয়া হয় তাকে আর নামানো যায় না। আগে ছোট ও মাঝারী ব্যবসায়ীরা নিত্যপণ্যের ব্যবসা করত। এই ধরনের ব্যবসায়ীর সংখ্যা ছিলো বেশি। সংখ্যা বেশি থাকার কারণে সিন্ডিকেটবাজির সুযোগ কম ছিলো। এখন নিত্যপণ্যের আমদানিকারক হাতে গোণা কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ ও প্রতিষ্ঠান। এরা সহজেই একমত হয়ে দাম বাড়ানোর কারসাজি করতে পারে। সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এই বৃহৎ ব্যবসায়ীদের প্রভাব অনেক বেশি। মন্ত্রণালয়ে তাদের সাথে যেসব সভা হয় সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের অসহায় অবস্থায় দেখা যায়। ফলে সাধারণ ভোক্তা সমাজ এই অতি মুনাফাখোর বড় ব্যবসায়ীদের কারণে চোখে শর্ষে ফুল দেখতে শুরু করেছেন।
সোমবার দৈনিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক বছরে গমের দাম কমেছে শতকরা পয়ত্রিশ শতাংশ। আশ্চর্য বিষয় হলো, দেশের বাজারে আটার দাম তো কমেইনি উল্টো এই সময়ে শতকরা ১২ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। একইভাবে রসুনের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ১৬ শতাংশ কমলেও দেশে বেড়েছে ৯৩ শতাংশ। সোয়াবিন তেলের দাম কমেছে ৪৪ শতাংশ কিন্তু মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা দেশে কমিয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ থেকে ২ শতাংশ। অনেক পণ্যের ক্ষেত্রেই এরকম অবস্থা বিদ্যমান। কিছু কিছু সময়ে যখন নির্দিষ্ট কোনো পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায় তখন কৌশল করে আগে থেকেই ওই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়। এত নৈরাজ্যকর বাজার ব্যবস্থা আর কোথাও রয়েছে কিনা আমাদের জানা নেই। বাজারের নিত্যপণ্যের দামের উপর সবসময় সরকারি নিয়ন্ত্রণ রাখতে হয়। দেশে এই ধরনের একটি কাঠামো রয়েছে। কিন্তু তা কার্যকর হয়ে উঠতে পারে না। অতিরিক্ত দাম বাড়ানোর জন্য কোনো বড় ব্যবসায়ীকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। মাঝে মধ্যে লোক দেখানো যে অভিযান পরিচালিত হয় তা মূলত খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে। এই খুচরা বিক্রেতাদের দাম বাড়ানোর সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। আমদানিকারক বা আড়ৎদার পর্যায়ে সঠিক নিয়ন্ত্রণ, তদারকি ও নজরদারি না রাখলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কখনও সম্ভব নয়।
সামনে কোরবানির ঈদ আসছে। এসময় পেঁয়াজ, রসুন, মশলা, ভোজ্যতেল প্রভৃতির চাহিদা বেড়ে যায়। এই বর্ধিত চাহিদার সময়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব জরুরি। সংবাদপত্র অনুযায়ী জানা গেল সরকার প্রতি লিটার সোয়াবিন তেলে ১০ টাকা দাম কমিয়েছেন। কমানোর এই হার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সাথে তুলনা করলে আশাহত হতে হয়। দেশিয় বাজারে চিনির দাম আরেক দফা বাড়ানোর জন্য সরকারের নিকট আবেদন করে রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। সমকালের ওই প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম ৩৮ শতাংশ বাড়ানোর তথ্য দিয়ে বলা হয় এ কারণে দেশিয় বাজারে চিনির দাম বাড়ানো হয়েছে ৫৮ শতাংশ। আমদানি করতে হয় না এমন পণ্যের দামও বেড়ে যায়। কৃষক পর্যায়ে যে দামে কেনা হয় ভোক্তার নিকট পৌঁছাতে সেই পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তাই একদিকে উৎপাদক কৃষক সমাজ ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার আহাজারি করছেন অন্যদিকে ভোক্তারা মাত্রাতিরিক্ত দামে জিনিস কেনার অত্যাচারে জর্জরিত।
বাজারের বিশেষ করে নিত্যপণ্যের বাজারের লাগাম টেনে ধরা বিশেষ জরুরি। মুনাফা অর্জনের একটা সীমা থাকা দরকার। এই সীমা নির্ধারণের দায়িত্ব সরকারের। সরকার এই জায়গায় ব্যর্থ হলে জনরোষের পুরোটাই সরকারের গায়ে লাগবে, তখন ব্যবসায়ীরা আড়ালে নিরাপদে বসে মুচকি হাসবে আর পরবর্তী শোষণমূলক কর্মকৌশল ঠিক করতে মাথা খাটাবে।