- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

বাড়ছে নদীর পানি, উৎকণ্ঠায় লাখো কৃষক

বিশেষ প্রতিনিধি
‘বৃহস্পতিবার রাত ১১টার পর আর ঘুমোতে পারি নি। রক্তি নদীতে হঠাৎ করে যেভাবে পানি বেড়েছে তাতে দুশ্চিন্তায় পড়েছে সবাই, এভাবে পানি বাড়লে ২০১৭’এর মতো প্রলয়ংকরী অবস্থা হবে।’ জেলার করচার হাওরপাড়ের বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার রাধানগরের কৃষক আব্দুল কাহিল এভাবেই ভয়ের কথা রবিবার দুপুরে জানাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, উপজেলার বড় হাওর করচা ও আঙ্গারুলি হাওরের ফসল রক্ষা নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তার। কেবল আব্দুল কাহিল নয়। নদীর পানি হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় পুরো হাওরজুড়ে লাখো কৃষকের মাঝে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।
তাহিরপুরের শনির হাওরপাড়ের মারালা গ্রামের কৃষক মিয়া হোসেন বললেন, গ্রামের ও শনির হাওরের পাশ দিয়ে বৌলাই নদী গেছে। বৃষ্টি হয় নি, তবুও শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে নদীর পানি এমনভাবে বেড়েছে, সকলের ভয়ের কারণ হয়েছে। ২০১৭’র পর চৈত্র মাসের এই সময়ে এতো পানি নদীতে আর দেখি নি। শনির হাওরের বেরী বাঁধের বাইরে গোপিনাথের নোয়াগাঁও, নিশ্চিন্তপুরের চরের জমি ডুবে গেছে। লতিবপুরের চর’এর জমিও বৌলাই নদীর পানিতে ছুঁই ছুঁই অবস্থা।
টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের পাটলাই নদীর পাড়ের বাসিন্দা খসরুল আলম বললেন, শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে পানি আসা শুরু হয়, দেখতে দেখতে পাটলাই নদী টইটুম্বুর অবস্থা। নদীতে পানি বাড়ায় ধর্মপাশা উপজেলার গুরমার হাওরের বর্ধিতাংশের ফসল ডুবে যাওয়ার আশংকা তৈরি হয়েছে।
তাহিরপুরের শনির হাওরপাড়ের পাঠাবুকা গ্রামের রিপসান হাবিব তালুকদার বললেন, শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে পাহাড়ি নদী বৌলাই, যাদুকাটা, রক্তি, পাইকরতলা ও পাটলাইয়ে পানি বেড়ে গেছে। তাহিরপুরের বড় হাওর শনি ও মাটিয়ানের পাড়ের কৃষকদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম বললেন, এপ্রিলের দুই তারিখে বা চৈত্র মাসের এই সময়ে এতো পানি সুনামগঞ্জের কৃষকরা গেল চার বছরে দেখেননি। ৩১ মার্চ রাতে ভারতের চেরাপূঞ্জি ও আসামে ১৯১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। সুনামগঞ্জের হাওরে পানির বিপদসীমা ৬.৫ সেন্টিমিটার, শনিবার পানির উচ্চতা ছিল নদীতে ৪.৮০ সেন্টিমিটার। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। তিনি জানান, অতীতের রেকর্ড অনুযায়ী দুই এপ্রিলে ২০১৮ সালে নদীর পানির উচ্চতা ছিল ১.২২ সেন্টিমিটার, ২০১৯ সালে ০.৮৫ সেন্টিমিটার, ২০২০ সালে ০.৬৩ সেন্টিমিটার, ২০২১ সালে ২.০৩ সেন্টিমিটার। এবার ৭২৭ টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি জেলার বৃহৎ ৪২ টি হাওরে ১২১ কোটি টাকার ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ করেছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ—পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বললেন, নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত দেখে শুক্রবার রাতে আমিও ঘুমোতে পারিনি। টাঙ্গুয়ার হাওরের নজরখালি বাঁধ ভেঙে কৃষকদের ক্ষতি হয়েছে। তবে পানির চাপ কমায় বড় দুটি হাওর শনি ও মাটিয়ান নিয়ে দুশ্চিন্তা কিছুটা কমেছে। নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আরও অনেক হাওরেই বিপদ হতে পারে বলে মন্তব্য করলেন তিনি। তিনি জানান, এবার সুনামগঞ্জে দুই লাখ ২২ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ করে ১৩ লাখ ৫২ হাজার ২২০ মে.টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ আবু সাঈদ জানালেন, রোববারও সুনামগঞ্জে এবং উজানে (মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতে) বৃষ্টি আছে। সোমবার থেকে পরবর্তী ৫ দিন বৃষ্টি কম থাকবে। এরপর আবার বৃষ্টি হতে পারে।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, গত দুই তিন দিনে চেরাপুঞ্জি ও আসামে ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে দুশ্চিন্তার কারণ হয়েছে। সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের শনিবার সকালেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, পাউবো, পিআইসির লোকজন ও স্থানীয় জনপ্রনিধিদের নিয়ে পর্যাপ্ত বস্তাসহ বাঁধে বাঁধে অবস্থান নেবার জন্য। তিনি জানান, সপ্তাহ খানেকের মধ্যে হাওরে ধানা কাটা শুরু হবে।
নয় এপ্রিল হাওরে ধান কেটে ধান কাটা উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি।

  • [১]