শুধু অর্থ খরচের চিন্তা থেকে প্রকল্প না নিয়ে, বরং অপচয় রোধ করে সঠিক প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্প্রতি নিজ কার্যালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (২০১৬-১৭) স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, প্রকল্প প্রণয়নটা শুধু অর্থ ব্যয়ের চিন্তা থেকে যেন না হয়। সেখান থেকে কতটুকু দেশের উন্নতি হবে আর এর সুফল মানুষ কতটুকু পাবে সে হিসাবটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। সে সঙ্গে দেখতে হবে যেন আমাদের এই কষ্টার্জিত অর্থের অপব্যবহার না হয়। উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী এর আগেও একধিকবার ব্যয় সাশ্রয় ও অপচয় রোধ করার আহ্বান জানিয়েছেন, যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদের দেশে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপচয়-দুর্নীতি ও ব্যয়বাহুল্যের কোনো সুযোগ থাকা মোটেই সমীচীন নয়। অথচ দুর্ভাগ্যবশত আমরা বিপরীত চিত্র দেখেই অভ্যস্ত। এ দেশে খুবই প্রচলিত একটা কথা- সরকারি মাল, দরিয়া মে ঢাল। এটা এমনি এমনি তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই এ ধরনের প্রবচণের সৃষ্টি। এর নমুনা দেখতে আমাদের খুব পেছনে যেতে হয় না। সমকালেও ‘সরকারি মাল দরিয়ায় ঢালার’ বহু দৃষ্টান্ত খুঁজে পেতে বেগ পেতে হবে না। আর বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই প্রধানমন্ত্রীকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দিতে হয়েছে। খুবই সত্যি যে, উন্নয়ন প্রকল্পে যথাযথভাবে অর্থের ব্যবহার না হওয়া ও অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে আমাদের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের চিত্র মোটেও সুখকর নয়। দেখা যায়, বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনা না করে অর্থ খরচ ও এর মাধ্যমে প্রাপ্তি যোগের কথা মাথায় রেখে বহু উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। তারপর আছে গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম-দুর্নীতি। কিছুদিন আগেই এডিপি বরাদ্দের ঘোষণা প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছেন, প্রকল্প পরিচালকদের (পিডি) উদাসীনতার কারণে সময় মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় না। ফলে ব্যয় বৃদ্ধির নামে সরকারের অর্থের অপচয় হয়। চলমান প্রকল্পে নতুন কম্পনেন্ট যোগ করে বারবার ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতা রয়েছে। এ ছাড়া সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের মান নিয়েও রয়েছে বহু প্রশ্ন। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি শুধু নয় দুর্নীতিরও দৃষ্টান্ত রয়েছে। চুয়াডাঙ্গায় একটি সরকারি ভবনে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহারের ঘটনা কিছুদিন আগে আলোড়ন তুলেছে। উন্নয়ন প্রকল্প ছাড়াও সরকারি ব্যয় বাহুল্য ও অপচয়ের আরো কিছু বিষয় সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষভাবে সংবাদের শিরোনাম হয়েছে। এর মাঝে উল্লেখ করা যায়, দেশের সড়কের অবস্থা বিবেচনায় না নিয়ে বিআরটিসির দুর্বল আর্টিকুলেটেড বাস ক্রয় এবং তা রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলার কথা। তারপর ডেমু ট্রেন কেনার প্রসঙ্গ। সরকারি ক্রয়ে উপযোগিতা যাচাই এবং মান নিশ্চিতকরণে দুর্বলতা; সরকারি সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে অব্যবস্থাপনা এবং এসবের পরিণামে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের এসব দৃষ্টান্ত আমাদের মতো গরিব দেশের জন্য উদ্বেগের বৈকি।
দেশের অগ্রগতি এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে রাষ্ট্র তথা সরকারের পরিকল্পনাটাই আসল। সরকারের উন্নয়ন-পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে জনগণের মুখে হাসি ফোটে, আর ব্যত্যয় ঘটলে জনগণের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। ফলে ক্ষোভ-বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। আর আমাদের মতো দরিদ্র দেশে উপযুক্ত উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ দেশের সাধারণ মানুষের শ্রমে-ঘামে অর্জিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার হোক এটাই সবার চাওয়া। আমরা আশা করব রাজনৈতিক বা ব্যক্তি-বিশেষের স্বার্থ বিবেচনা নয়, জনগণের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প গৃহীত হবে। যথাসময়ে মানসম্মতভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টরা সচেষ্ট থাকবেন। এ ব্যাপারে তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। সর্বক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহার ও অপচয় রোধ অপরিহার্য। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পালনে সরকারের নীতি নির্ধারক মহল, জনপ্রতিনিধিরা ও প্রশাসনযন্ত্রের সংশ্লিষ্ট সবাই আন্তরিক হবেন- এটাই প্রত্যাশিত।