অ্যাড. প্রসেনজিৎ দে (পিনু)
”পোড়ামুখী, তুই গঙ্গারে এমনই তেল সিন্দুর দিলে চৈত মাসো মা গঙ্গা হাওরো আইলা” এমনই কথোপকথন শুনছিলাম সে দিন গ্রামের বাড়ীর রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে। আমরা সনাতন ধর্মাবলম্বী বাঙালিরা সারা বৎসরব্যাপী উৎসব পূজা পার্বণ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করি সেই বহুকাল পূর্ব হতে। যদিও বলা হয়ে থাকে বার মাসে তের পার্বণ কিন্তু মূলত সেটি তের ছাড়িয়ে তেত্রিশও হতে পারে। উপরে লেখা মা মেয়ের কথোপকথনটিও একটি পার্বণ থেকেই, কন্যা সন্তানকে প্রথম নদীর ঘাটে বা পুকুরঘাটে নামানোর পূর্বে কন্যা সন্তান কে দিয়ে গঙ্গাদেবীকে তৈল সিঁদুর দেওয়ানো হয়ে থাকে। সেটিও কিন্তু বেশ উৎসব নিয়ে করা হয়। আশপাশের বাড়ীর মহিলাগণ মিলিত হয়ে গীত গেয়ে থাকেন মা গঙ্গাদেবীর উদ্দেশ্যে। চাল কলা ইত্যাদি দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়ে থাকে। এই অনুষ্ঠানটি সাধারণত হয়ে থাকে পণতীর্থ বারুনী স্নানের দিন অথবা অন্য সময়ও। নতুন বিবাহিত স্বামী স্ত্রী একসংগে অথবা শাশুড়ী তার নতুন বৌ নিয়ে পণতীর্থ গঙ্গারঘাটে নদীর তীরে বৌকে দিয়ে বালি উঠিয়ে ঢিবি তৈরি করান বংশের নতুন মুখ ছেলে সন্তান লাভের আশায়, সেটিও একটি উৎসব, ব্রাহ্মন দিয়ে মন্ত্র পড়িয়ে চাল কলা দিয়ে ভোগ দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। আমাদের ভাটি অঞ্চল প্রধানত বোরো ফসল
নির্ভর । নতুন বৎসরের প্রথম দিন থেকেই সারা মাসব্যাপী একটা না একটা উৎসব লেগেই থাকে। প্রথম উৎসবটি হল কাঁচি ধরা অর্থাৎ জমির ধান কাটা শুরু করার দিনটিতে দেবতার উদ্দেশ্যে ভোগ নিবেদন করা হয়, পরের উৎসবটি হলো নতুন ধানের ভাত খাওয়ার দিন, ঐদিন মা অন্নপূর্না দেবীর আবাহনের মাধ্যমে মঙ্গল কামনা করা হয়। আগের দিনে উত্তর অঞ্চল থেকে ধান কাটার কামলা (বেপারী) রা আসতেন বড় বড় নৌকায় মিষ্টি আলু, মাটির হাঁড়ি পাতিল ইত্যাদি নিয়ে। ধান কাটার পাশাপাশি এইগুলি বিক্রি করতেন, ধান কাটা শেষ হওয়ার পর অবস্থাপন্ন গৃহস্তগণ ভাগালু বা ধান কাটার কামলাদের ছাগলের খাসি, অথবা মেষের পাঠা উপহার দিতেন। ধান কাটার ভাগালুরা বেশ উৎসব আনন্দের মাধ্যমে ধান মাড়াইয়ের শেষদিনটি ভাল মন্দ খেয়ে পালন করতেন। এইভাবে বৈশাখ মাসটি কেটে যেত ধান কাটা, মাড়া দেওয়া, খড় শুকানো ইত্যাদি কাজে। জ্যৈষ্ঠ মাস আসতো আম কাঁঠাল ইত্যাদি রসালো ফলের স্বাদ নিয়ে। নতুন বৈবাহিক সম্পর্কে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ কন্যার বাড়ী কিংবা ছেলের শ্বশুড়বাড়ী গাছের আম কাঁঠাল পাঠানোকে বলা হয় আমকাঁঠলি উৎসব, জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষদিনটি পালন করা হয় কর্মপূরুষে দেবতার আরাধনার মাধ্যমে অর্থাৎ কর্মাদিত্য সংক্রান্তি হিসাবে। “আষাঢ়ে গাঙ্গে পানি না আসিল গুনমনি ভরা নদীতে নাও বাইল না” কিংবা ‘‘ জ্যৈষ্ঠ না আষাঢ় মাসেরে ও বন্ধু গাঙ্গে নয়া পানি, আমার কি লয়না মনে খেলতাম নাও দৌড়ানি”Ñ আমাদের চারণ কবিদের এইসকল গীত হওয়া গান থেকেই ধারণা করা যায় আষাঢ় মাসে কি ধরনের উৎসব হত। কন্যা, বোনেরা এই সময়ে নাইওর আসতেন। তাইতো গীতি কবিদের লেখায় উঠে এসেছে ‘‘যেদিন হতে নয়া পানি আইল বাড়ীর ঘাটে, অভাগিনির মনে কত শত কথা উঠেরে” কিংবা ‘‘কে যাসরে ভাটির গাঙ বাইয়া, আমার ভাই ধনরে কইও নাইওর নিত আইয়া”। সেই আষাঢ় কোথায় গেল? শ্রাবনের মেঘগুলো এখন আর জমা হয়না আকাশে, অঝোরে নামে না আর ধারা। অভিশাপগ্রস্ত চাঁদ সওদাগরের পুত্রবধু বেহুলা মৃত স্বামীর লাশ নিয়ে ভেলায় চড়ে নদীর উজান বেয়ে দেবসভায় নৃত্যের মাধ্যমে মৃত স্বামীর জীবন ফিরিয়ে আনার কাহিনী পদ্মপূরাণ বাংলার ঘরে ঘরে গীত হওয়ার প্রবণতা দিন দিন কমছে। শ্রাবণের প্রথম দিন থেকেই প্রত্যেক বাড়ীতে মহিলাগণ বিকেল বেলা পদ্মপূরাণ গান করতেন, পদ্মপূরাণ শুরু করার দিনটিও উৎসব হিসাবে পালিত হত। এখনও শ্রাবণী সংক্রান্তির দিনে আমাদের ভাটি অঞ্চলের হিন্দুদের প্রধান উৎসব মনসা পূজা। ভাটি অঞ্চলের প্রত্যেক বাড়ীতে এইদিন মনসা পূজা হয়ে থাকে। ঐদিন নৌকা বাইচসহ বিভিন্ন আনন্দ উৎসবের আয়োজন করা হয়। ভাদ্র মাসে তালের রস দিয়ে পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যেত। আশ্বিন মাসের শেষ দিনটি উলা সংক্রান্তি হিসাবে পালিত হয় অর্থাৎ আমন ধানের ভাল ফলন হওয়ার জন্য মা লক্ষ্মীর পূজা করা। আমরা ছোট বেলায় ক্ষেতের আলে দাঁড়িয়ে নধর ধানের দিকে চালতা পাতা আর ছনের ফুলের দ্বারা আবৃত তীরের ফলার মতো কাঠিগুলি ছুড়ে দিতাম আর বলতাম “আশ্বিন যাইতে কাতি (কার্তিক) আইতে ধানে দিলাম উলা সেই ধান ফইল্লা রইল বাহান্ন ফাইল্লা, সুন্দা মেতি চইলতার পাত, হিজা (ধানের ছড়া) মেলিস আড়াই হাত”। ঐ দিন রাত্রে পিঠা খাওয়া হয়ে থাকে, বড়রা বলতেন “উলা দিয়া খুলা পিঠা”। আরও একটি বিষয় খুবই মজার ছিল। আট প্রকারের সব্জি দিয়ে লাবড়া তৈরী করে খাওয়া হয়, তাও আবার ঐদিন না খেয়ে বাসি করে পর দিন খাওয়া, বলা হয় “আশ্বিনো রান্ধে কাতিত খায়, যে বর মাগে হেই বর পায়”। কার্তিক মাসে শুরু হয়ে যেত বোরো জমি তৈরী করার কাজ। কার্তিক মাসের শেষ দিনে কার্তিক পূজা। মাটি দিয়ে গরু, পাখি, কার্তিক ঠাকুরের মূর্তি ইত্যাদি তৈরি করা হত। কাপড়ে দেওয়ার নীল দিয়ে, চুন দিয়ে, হলুদ দিয়ে রং তৈরি করে মাটির গরু ও পাখির শরীরে রং লাগানো হত। ঐ দিনকে বলা হয় ভুলা সংক্রান্তি। ঘরদোর সব পরিস্কার করা হয়, ঘরে ধূনা দিয়ে মন্ত্র পড়া হয় “ভুলা ছাড়, ভুলি ছাড়/ বার মাইয়া পিছাইয়া ছাড়”। এভাবে প্রত্যেক মাসের শেষদিন টি সংক্রান্তি দিন হিসাবে বাঙালির ঘরে ঘরে পালিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। তবে দিন যত যাচ্ছে এইসব উৎসবের আড়ম্ভর তত কমছে, অনেকগুলি পালা পার্বণ বা উৎসব এখন আর পালিত হয় না। যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের কর্মপরিধি বেড়ে যাওয়ায় আর আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলার চিরায়ত রূপ। ভাটি অঞ্চলের একমাত্র অবলম্বন বোরো ফসল পরপর দুই বৎসর বাঁধ ভেঙ্গে তলিয়ে যাওয়ায় ভাটির মানুষ বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন খুঁজছে। বাধ্য হয়ে আত্মসম্মান আর লজ্জা ভুলে হাত পাততে হবে সরকারী সাহায্যের দিকে। সে সাহায্যও তো সব সময় সবার ঘরে পৌঁছায় না। তবে প্রকৃতির সাথে সর্বদা যুদ্ধে অভ্যস্ত ভাটির বাঙালি ঘুরে দাঁড়াবেই। পালা পার্বণ উদযাপনের সাথে সাথে এ অঞ্চলের বাঙালির প্রকৃতির সাথে নিরন্তর লড়াইও চলে এসেছে যুগ যুগ ধরে। আমরা ভাটির বাঙালিরা কখনোই ফসল হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যাইনি, ভাঙ্গা মনে, অবসন্ন দেহ নিয়ে আবারো উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়েছি অজানা আগামীর দিকে, সাফল্যের আশায়। এবারও তার ব্যত্যয় হবে না। আমার স্বজন, আমার কৃষক, আমরা, এই ভাটির বাঙালিরা ঠিকই খুঁজে নেবো পথের দিশা। আমরা জানি, “আজ নয়, কাল নয় পরশু, বিভাবরি সূর্য উঠবেই, একদিন নাহয় একদিন”।
লেখক: আইনজীবী ও সংস্কৃতিকর্মী।