- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

বালু-পাথর খেকোদের ঠেকানো যাচ্ছে না

বিশেষ প্রতিনিধি
কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না সুনামগঞ্জের পাহাড়ী নদী ধোপাজান ও যাদুকাটার (যাদুকাটা বালু মহাল) পাড় কেটে বালু-পাথর উত্তোলন। জেলা প্রশাসনের কঠোর নির্দেশনার পরও ওই মহালগুলো থেকে কৌশলে রাতের বেলায় বালু খেকোরা পাড় কেটে বালু-পাথর তোলার মহোৎসব চালিয়ে যাচ্ছে। কোন কোন সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজসে, আবার কখনো চোখ এড়িয়ে লাখ লাখ ঘনফুট বালু পাথর তুলে নিয়ে যাচ্ছে এরা। এদের অত্যাচারে নদীর পাড়ের বসতি-জমি নদী গর্ভে চলে যাচ্ছে। গত এক মাসে ভ্রাম্যমাণ আদালত অবৈধ বালু পাথর উত্তোলনকারীদের একাধিবার জরিমানা করেছে। আটক বালু পাথর কোটি টাকায় নিলামে বিক্রি করেছে। তবুও তা-ব থামছে না। বালু-পাথর খেকোরা আরও বেপরোয়া হয়ে তা-ব চালাচ্ছে। তারা প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ করে এমন অবৈধ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোমবার দুপুরে সুনামগঞ্জ শহরের পুলিশ ফাঁড়ি এলাকায় জব্দকৃত বালু পাথর বহনকারী ৭ বাল্কহেডকে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসিফ আল জিনাত ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান এই জরিমানা করেন। গত ১১ মে ধোপাজান চলতি নদীতে অবৈধ বালু ও পাথর বোঝাইকৃত ১৫ টি বাল্কহেডকে ৬ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকা অর্থদ- প্রদান করা হয়।
গত ৮ মে একই নদীতে চারটি নৌযানের মালিকদের ৩, ২৫০০০ (তিন লক্ষ পঁচিশ হাজার) টাকা জরিমানা করা হয়।
গত ৪ মে এই নদীতে এই নদীতে ২৫ টি বালু বোঝাই ইঞ্জিন নৌকা আটক করে ২০ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়। অভিযানকালে বাধা দেয়ায় ডলুরার কালীপুর গ্রামের আব্দুর রহমানের ছেলে করম আলীকে ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদ- দেওয়া হয়। মে মাসের দুই তারিখে যাদুকাটা নদীতে জব্দকৃত বালু পাথর ৯০ লক্ষ টাকায় প্রকাশ্যে নিলামে বিক্রি হয়। পহেলা মে তে তাহিরপুরের যাদুকাটা নদী থেকে বালু উত্তোলন করে রক্তি নদী দিয়ে পরিবহনের সময় বালু ভর্তি একটি স্টিল বডি নৌকা ও একটি কাঠের নৌকা জব্দ করে তাহিরপুর থানা পুলিশ। গত ১৬ এপ্রিল অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে একইভাবে অভিযান পরিচালনা করা হয়। গত ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের দায়ে নৌ-পুলিশ ২৭ জনকে গ্রেপ্তার এবং ৬ লাখ টাকা জরিমানা আদায় ও ২১টি বাল্কহেড জব্দ করে।
গত ২৪ এপ্রিল ছাতকে ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু, পাথর উত্তোলন করার অপরাধে ড্রেজারসহ ২ জনকে আটক করা হয়। উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের হাঁদাটিলা এলাকা থেকে অবৈধ ভাবে বালু, পাথর উত্তোলন করার সময় তাদের আটক করে নৌ-পুলিশ।
বালু-পাথর মহালের পাড়ের বাসিন্দারা জানান, দ্রুততম সময়ে বালু-পাথর তুলে নিয়ে যেতে হবে, এজন্য নদীর মাঝখান থেকে না তুলে পাড় কেটেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বালু-পাথর তুলে নিচ্ছে বালু পাথর খেকোরা।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ধোপাজান নদীতে অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের কাজে যাদের নাম আলোচিত হয়। তারা হচ্ছেন- ডলুরার সিরাজ মিয়া, নূর হোসেন, মকবুল হোসেন, দেলোয়ার মিয়া, মনির হোসেন, আক্তার মিয়া, মথুরকান্দির আবু তাহের, কাপনা গ্রামের কাদির মিয়া, ডলুরার সিরাজ মিয়া, রশিদ মিয়া, মনু মিয়া, কাসেম, শাহাবুদ্দিন ও কাপনার সাদ্দাম হোসেন।
নদীর দুই তীর কেটে বালু পাথর উত্তোলনের কারণে ভাঙনে বিলীন হচ্ছে জেলার তাহিরপুরের যাদুকাটার পাড়ের অর্ধশত গ্রাম ও হাজার হাজার একর ফসলী জমি। এক শ্রেণির অসাধু বালুখেকো চক্র নদীর তলদেশ থেকে বালু-পাথর উত্তোলন না করে প্রতিদিনই যাদুকাটা নদীর উভয় তীরের পাড় কেটে বালু তুলছে। এ কারণে ঘাগটিয়া, বড়টেক, গড়কাটি, রাজারগাঁও, লাউড়েরগড়, বিন্নাকুলি, মাহারাম, মানিগাঁও, ঘাগড়া, পাঠানপাড়া, কুনাটছড়া, পিরিজিপুরসহ অর্ধশতাধিক গ্রাম ভাঙনে বিলীন হতে চলেছে। জেলার ধোপাজান ও ছাতক দোয়ারার বালু পাথর মহালগুলোর পাড়ের গ্রামগুলোরও একই অবস্থা।
যাদুকাটার পাড়ের মানিগাঁওয়ের শ্রমিক জাহাঙ্গীর আলম বললেন, বেশিরভাগ শ্রমিক প্রশাসনের নির্দেশ মেনে নদীতে পাড় কাটতে যাচ্ছে না। তবে রাতে মানিগাঁওয়ের শাহ্ আলম, মোদেরগাঁওয়ের রয়েল মিয়া, পৈলনপুরের ইকবাল হোসেন, গাগরার কিরণ বাবু ও সাজ্জাদ মিয়া প্রতিদিনই পাড় কেটে লাখ লাখ টাকার বালু তুলে বিক্রি করছে।
পাড় কেটে বালু তোলার জন্য প্রশাসন ও পুলিশকে ম্যানেজ করার জন্য কিছু কর্মচারী ও পুলিশের কিছু লোক মধ্যস্ততা করে তাকে বলে যাদুকাটা ও ধোপাজানের পাড়ের একাধিক শ্রমিক এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।
ধোপাজান নদীর পাড়ের মুসলিমপুরের বাসিন্দা রাজনীতিবিদ মোবারক হোসেন বললেন, নদীর পাড়ের দরিদ্র বারকী শ্রমিকদের আইনী প্রক্রিয়ায় নদীর মাঝখান থেকে হাতে তুলে বালু পাথর বিক্রির সুযোগ দেবার বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করতে হবে। লাখো শ্রমিকের অন্য কোন পেশা নেই, এটি বিবেচনায় রাখা জরুরি। একইভাবে নদীর পাড় কেটে পরিবেশ ধ্বংশকারীদের আইনের আনতে হবে। নদীতে ৭-৮ স্থানে চাঁদাবাজী হয়, সেটিও ঠেকাতে হবে।
বালু পাথর ব্যবসায়ী সাজ্জাদুর রহমান পলিন বলেন, স্তুপ করা পুরাতন বালু বিক্রয়ে বাধা দেওয়া হবে না ইতিপূর্বে বলা হয়েছিল। এখন তাতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। সুরমা নদীর পাড়ের ইব্রাহিমপুর গ্রামের পেছনে ২ বছরের আগের স্তুপ করা বালু লোড দেবার সময় আমার বাল্কহেড আটক করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আমরা আইনের ন্যায়সঙ্গত প্রয়োগ চাই।
সম্প্রতি, সাংবাকিদের এক প্রশ্নের জবাবে সিলেট অঞ্চল নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার শম্পা ইয়াসমীন বলেন, আমাদের কাছে খবর আছে, কিছু অসাধু সাংবাদিক টাকার বিনিময়ে অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনকারীদের সহযোগিতা করেন প্রতিনিয়ত। তারা অবশ্য আমাদের নৌ-পুলিশের নাম করে এই কাজটি করেন। বদনাম হয় শুধু নৌ-পুলিশের। এতে আমরা আন্তরিকভাবে দু:খিত। আসলে নৌ-পুলিশ অবৈধ ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দিনেও রাতে ড্রেজার মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের খবর পেয়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা পৌঁছবার পূর্বেই অবৈধ বালু পাথর উত্তোলনকারীরা পালিয়ে যায়। হয়তো কোনো একটি চক্র আছে, আমাদের অভিযানের খবরটি আগে জানিয়ে দেয়।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, অবৈধ বালু পাথর উত্তোলনে এখন থেকে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট হবে। যারা অবৈধভাবে বালু পাথর উত্তোলন ও বহন করছে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে। অবৈধ বালু পাথর খেকোদের সর্বোচ্চ আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

  • [১]