- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

বাল্যবিয়ে থেকে মুক্তির জন্য সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন

বুধবার শহরতলির জলিলপুরে এক কিশোরীকে বিয়ে দেয়ার অপরাধে চরি ব্যক্তিকে ভ্রাম্যমান আদালত কর্তৃক কারাদ- দেয়ার ঠিক এক দিন পর শুক্রবার খোদ পৌরশহরের ওয়েজখালিতে অনুরূপ আরেকটি বাল্য বিয়ের ঘটনা ঠেকাতে একই ভ্রাম্যমান আদালতকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। ওয়েজখালিতেও ভ্রাম্যমাণ আদালত তিন ব্যক্তিকে কারাদ- প্রদান করেছেন। জেলা শহরের নাকের ডগায় একদিনের ব্যবধানে দুই দুইটি বাল্য বিয়ের চেষ্টা আমাদেরকে আতঙ্কিত করে সত্য কিন্তু এটি আশ্চর্যজনক নয়। অহরহই গ্রামাঞ্চলের শিক্ষায় অনগ্রসর পরিবারগুলোতে ব্যাপকমাত্রায় বাল্যবিয়ে হচ্ছে। বিশাল গ্রাম-বাংলার এসব বাল্যবিয়ের একেবারেই সামান্য একটি অংশ গণমাধ্যম কিংবা প্রতিকারকারী প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের গোচরীভূত হয়। এখন সেইসব বাল্যবিয়েই কেবল প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে যেগুলো কোন না কোন উপায়ে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের নজরে আসছে। সমাজের নিজস্ব শক্তিবলে কোথাও বাল্যবিয়ে বন্ধ হওয়ার খবর আমাদের জানা নেই। এর কারণ বহুবিধ। দারিদ্রতা, শিক্ষায় অনগ্রসরতা, ধর্মীয় গোড়ামি, কুসংস্কার, অপ-বিশ্বাস, কন্যা সন্তানের প্রতি সমাজের বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গিÑ এসবই বাল্য বিয়ের অন্যতম অনুঘটক। প্রশাসনের উদ্যোগে ঘটা করে বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়নকে বাল্যবিয়ে মুক্ত করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত ওইসব উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন থেকে যখন বাল্য বিয়ের খবর আসে তখন এইসব ঘোষণার অন্তসারশূন্যতা প্রমাণ করে। আসলে আমরা সমাজে বিরাজিত বিভিন্ন সমস্যাকে খ্ি-ত দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে অভ্যস্ত। সমাধানের পথও খুঁজি বিচ্ছিন্নভাবেই্। ফলে সমাধানের যে লক্ষ্যমাত্রা আমরা নির্ধারণ করি সেখানে বারবার হুছট খেতে হয়। আমরা শ্লোগান তুলেছিলাম ‘দুই সন্তানের বেশি নয়, তবে একটিই উত্তম’। গ্রামে গ্রামে গিয়ে দেখুন, বহু পরিবার খুঁজে পাবেন যাদের সন্তান সন্ততি সংখ্যা চার বা ততোধিক। একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জায়গাটি যেখানে ভারসাম্যপূর্ণ থাকার কথা সেখানে সফলতা অর্জিত না হওয়ার কারণেই অন্যান্য উপসর্গগুলোর দ্রুত বিস্তার ঘটছে। বাল্যবিয়ে যার অনতম। সকল শিশুর স্কুলে যাওয়া ও ঝরে পড়া রোধ করার যে জাতীয় কর্মসূচী নির্ধারিত রয়েছে আমাদের সেখানেও শতভাগ সফলতা নেই। পরিসংখ্যানের ভেলকিবাজীতে অগ্রগতির যে চিত্র তোলে ধরা হয় বাস্তবতা এর চাইতে অনেক বেশি করুণ। দারিদ্রতা নিরসন তথা সম্পদ বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র আশানুরূপ সফলতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। মূলত সবগুলো সমস্যাকে সমন্বিত আকারে একটি ছাতার নিচে এনে যদি সমাধানের পথ খুঁজা হয় তাহলে আমাদের বিশ্বাস সফলতা অবশ্যাম্ভাবী। তবে এজন্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চরিত্র নির্ধারণের জায়গাটি পরিষ্কার করতে হবে।
রাষ্ট্র গঠন করা হয় মূলত ওই ভূখ-ের মানুষের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করণার্থে। কিন্তু শোষণমূলক অর্থনীতি থেকে উদ্ভূত রাজনৈতিক দর্শন আজ সকল মানুষের পরিবর্তে কিছু মানুষের স্বার্থ রক্ষার জায়গাটিকে বেশি করে ধারণ করে। এর ফলে মানুষে মানুষে ব্যাপক বৈষম্য তৈরি করে। আমরা মনে করি আজ দেশে যে দারিদ্রতা, অশিক্ষা, রোগ-ব্যাধি, সামাজিক অনাচার ও ব্যাধিসমূহ তৈরি হয়েছে তার মূলে কাজ করছে ওই বৈষম্য। এর ফলে অধিকারবঞ্চিত মানবগোষ্ঠীর মধ্যে হতাশা, হতাশা থেকে ক্ষোভ, অতঃপর নানামুখী প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। এইভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থা ক্রমশ নিজের চেহারাকে আরও কাঠিন্যতার মোড়কে বন্দি করে ফেলছে।
জলিলপুর বা ওয়েজখালি অথবা বাংলাদেশের যেসব স্থানেই বাল্যবিয়ে সম্পাদিত হচ্ছে, এসব আইনবিরুদ্ধ কাজে যারা সহায়তা করছেন, যারাই ভুয়া জন্মসনদ দিয়ে বয়স বাড়ানোয় সহযোগিতা করছেন, তারা সকলেই একঅর্থে আমাদের রাষ্ট্রটিকে দুর্বল করার অশুভ তৎপরতার সঙ্গী। এদের শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হবে।  

  • [১]