- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

বাড়ছে পানিবাহিত রোগবালাই

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জে বসতবাড়ি থেকে বন্যার পানি নামার পর পানিবাহিত রোগবালাই মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। কলেরা, ডায়রিয়া, আমাশয়, জ¦রসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন হাজারো মানুষ। জেলার ১১ উপজেলা সদরের হাসপাতালে আসা রোগিদের শতকরা আশি ভাগেই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। জেলা সদর হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরের মধ্যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এমন অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয় নি।
প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে গত ১৬ জুন সুনামগঞ্জের বেশিরভাগ এলাকা বন্যা কবলিত হয়। ডুবে যায় জেলার ৮০ ভাগেরও বেশি এলাকা। গুরুত্বপূর্ণ অফিস, হাসপাতাল ও ব্যক্তি মালিকানাধীন ভবনের তালা ভেঙে জীবন বাঁচিয়েছেন লাখো মানুষ। ভয়াবহ বন্যার তা-বে ঘরে থাকা ধানচাল, গৃহপালিত পশু, জমিতে থাকা সবজি, পুকুরের মাছ সবই ভেসে গেছে। এখনো হাজারো মানুষের ঘরে খাবার নেই, বাইরে কাজ নেই, উঁচু এলাকা থেকে পানি কমলেও নিচু এলাকা এখনো বন্যা কবলিত। গত দুই দিনের বৃষ্টিতে নীচু এলাকায় পানি আরও বেড়েছে।
বন্যার পানি কমার পর জেলাজুড়ে পানিবাহিত রোগবালাই ছড়িয়ে আরেক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র, বসতবাড়ি যেখানেই লোকজন আছেন, সঙ্গে আছে পানিবাহিত রোগ। পানিবাহিত রোগের মধ্যে ডায়রিয়াই বেশি, কোন কোন ডায়রিয়ার রোগীর অবস্থা কলেরার পর্যায়ে পৌঁছেছে। এছাড়া আমাশয়সহ অন্য পানিবাহিত রোগও আছে।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা শহরতলির আপ্তাবনগর গ্রামের খালেদা বেগম বললেন, কয়েকদিন ধরেই তার দুই সন্তানসহ পরিবারের সবাই পেটের পীড়ায় ভুগছেন। সদর হাসপাতালে গিয়ে ওষুধ এনেছেন, কিন্তু তার নিজেরসহ বাচ্চাদের ডায়রিয়া চারদিন হয় কমছে না। তিনি জানালেন, এই আশ্রয়কেন্দ্রে আরও অনেকের ডায়রিয়া রয়েছে।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রফিকুন্নেছা বললেন, এতো ভিড়, মেঝেতে থেকেই তিনদিন হয় ডায়রিয়ার চিকিৎসা নিতে হচ্চে তাদের।

সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে তিল ধারণে ঠাঁই নেই


সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি লেখক ও গবেষক আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন বললেন, বন্যার পানি নেমে গেলেও দুর্ভোগ আছে ঘরে ঘরেই, ভয়াবহন বন্যা শুরুর তিনদিন বিদ্যুৎ ছিল না, বন্যার পানি ফুটিয়ে না ফুটিয়ে খেয়ে অনেকে আক্রান্ত হয়েছেন। পানি নেমে যাবার পর ডুবে যাওয়া টিউবওয়েলের ভেতরে পচা, দুর্গন্ধযুক্ত বিষাক্ত পানি রয়ে গেছে, অনেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার পর পরই ডিপ টিউবওয়েলের পানি পান করছেন। একারণে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। তিনি নিজেও পেটের পীড়ায় দুই-তিন দিন ভুগেছেন।
শহরের শহীদ আবুল হোসেন রোডের বাসিন্দা স্মৃতি শ্যাম পুরকায়স্থ জানালেন, বন্যার পানি নামার পরদিনই তিনি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, দুই দিন পর ডায়রিয়া কলেরায় রূপ নেয়।
জেলার দোয়ারাবাজার হাসপাতালের উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার ডা. হাসান মাহমুদ বললেন, হাসপাতালে আসা রোগীদের আশিভাগই এখন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে আসছেন। এরমধ্যে ডায়রিয়া রোগীই বেশি, দুয়েকজন কলেরা নিয়েও আসছেন।
সুনামগঞ্জের ৩০০ শয্যা হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. আনিসুর রহমান বললেন, বন্যার পানি নামার পরও দুর্ভোগ শেষ হয় নি। বন্যার সময় হাসপাতালের তালা ভেঙে আউটডোর ছাড়াও, কক্ষে ঢুকে আইসিইউ বেড ভেঙেছেন বন্যার্তরা, গরু-ছাগল নিয়ে হাসপাতালে ছিলেন হাজারো মানুষ। মানবিক বিপর্যয়ের সময় এই বিষয়ে কিছুই করার ছিল না, এখন পানিবাহিত রোগীর চাপ সামলানো যাচ্ছে না।
সিভিল সার্জন ডা. মো. আহম্মদ হোসেন বললেন, পানিবাহিত রোগবালাই অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে এখন বেশি এই জেলায়। শুক্রবার দুপুর ১২টায় জেলার ১১ উপজেলা হাসপাতালে কেবল ডায়রিয়া রোগী ভর্তি ছিলেন ৭৪৪ জন। ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন হাসপাতালে আক্রান্ত ১০৭ জন ভর্তি হয়েছেন। তিনি জানান, স্বাস্থ্য বিভাগের ১২০টি টিম ঘরে ঘরে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও ওরস্যালাইন পৌঁছে দিচ্ছে। প্রত্যেকটি হাসপাতালের আউটডোরেও এই বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

  • [১]