- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

বাড়ির কাছে আরশি নগর-ছেঁউরিয়ায় লালন সান্নিধ্যে

কুমার সৌরভ
‘তিন পাগলে হৈল মেলা নদে এসে/ তোরা কেউ যাস না ও পাগলের কাছে।’ লালন সাঁইর এই গানটি মনে দাগ কেটেছিল দীর্ঘদিন আগে। সম্প্রতি এই গানের একটি ভাববাদী ব্যাখ্যা পেয়েছিলাম বন্ধুবর ডা. মোরশেদ আলমের কাছ থেকে। তিনি বলছিলেন, লালন এই গানে তিন পাগল বলতে আমাদের দেহাশ্রিত তিন অবস্থার কথা বুঝিয়েছেন। সেগুলো হলোÑ দেহ, আত্মা ও মন। এই তিনটি অবস্থার সমন্বয়েই ব্যক্তি চৈতন্যময় হয়ে উঠে। তিনি এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত তাত্ত্বিক আলোচনা উপস্থিত করেছিলেন যার অনেক কিছু এখন আর মনে নেই। তবে বেশ পরে এই গানের বাণীর নতুন ব্যাখ্যা পেলাম ইমন জুবায়েরের ‘লালন এর তিনজন গুরু’ শিরোনামধারী লেখায়। লালনের এই গানের শেষ চরণগুলো অর্থাৎÑ ‘পাগলের নামটি এমন/ বলিতে ফকির লালন ভয় তরাসে/চৈতে নিতে অদ্বৈয় পাগল নাম ধরেছে’ এর বিশ্লেষণ করে জুবায়ের বলছেন, এই তিন পাগল হলেনÑচৈতে- শ্রীচৈতন্যদেব, নিতে- শ্রী নিত্যানন্দ এবং অদ্বৈয়- অদ্বৈত আচার্য। মধ্যযুগের হিন্দু পুনর্জাগরণের এই তিন মহাপুরুষের মানবিকতাবাদী উদার আদর্শ লালন ফকিরকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলো। লালন সর্ব ধর্ম-বর্ণের উর্দ্ধে যে মহান মানবতাবাদী আদর্শের কথা বলতেন, সেখানে ওই তিন মহাপুরুষকে তিনি নিজের আত্মার নিকটবর্তী লোক হিসেবে ভাবতেন। এই গান নিয়ে পর্যালোচনা বা বিশ্লেষণ করা আমার উদ্দেশ্য নয়। লালন ফকিরের মাজারের উদ্দেশ্যে আমাদের তিন বন্ধুর রওয়ানা হওয়ার সময় গানের চরণটি মনে এসে গিয়েছিল। আমার মনে এই প্রশ্নের উদ্রেক হলোÑ আমরা তিন জনও কি একই ঘরানার পাগলÑ যারা কুষ্টিয়ায় এসে একসাথে মিলেছে? কে জানি বলেছিলÑ ভবঘুরে আর পাগলের  মাঝে পার্থক্য সামান্য। ভবঘুরে আর পাগলরা   নাকি বিনা কারণে এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ায়। পরিব্রাজকদের অনেকে বিদ্রুপ করে ভবঘুরে বলে থাকেন। ওই বিদ্রুপকারীরা পাগল ও ভবঘুরেদের এক চোখে দেখেন। এমন কোন মহাজন যদি আজ আমাদের এখানে দেখে ফেলেন, নির্ঘাৎ তাহলে আমাদের কপালে পাগল তকমা লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এমন চিন্তা মনে হতেই হাসি পেল। আমি সশব্দে হেসে উঠলাম। দিলীপবাবু ও আনোয়ারভাই চমকে উঠলেন। বিনা কারণে হাসির মাজেজা জানতে চাইলেন। আমি বললাম- রহস্যঘেরা এর কারণ, বলা যাবে না কিছুতেই। তারাও কেন জানি রসজ্ঞ হলেন আজ। বললেন- মনের খবর বলতে পারেন নারায়ণ, আমাদের বুঝে কাজ নেই। এখন নামতে হবে এসে গেছি ছেঁউরিয়াÑ দিলীপবাবুর কথায় সামনে চেয়ে দেখি লালন শাহ মাজার ও একাডেমি কমপ্লেক্সের বিশাল প্রবেশতোরণের সামনে এসে গেছি আমরা। তিন পাগল হাসি মুখ নিয়েই নেমে পড়ল ইজিবাইক থেকে।
চারটি খাম্বার উপর দাঁড়িয়ে আছে সুসজ্জিত এই তোরণটি। প্রবেশতোরণ পেরিয়েই বিশাল লন। বৃক্ষশোভিত।   প্রবেশদ্বার থেকে লালনের মাজার পর্যন্ত দীর্ঘ লনের উভয় পাশ গাছের কেয়ারি করা। লন পেরিয়ে বাম দিকে লালন সাই’র মূল মাজার, মাজারের সামনে তার সমকালীন ও পরবর্তী সময়ের ভক্ত-মুরীদদের আরও ৩২টি মাজার। লনের ঠিক সামনে বিশাল আকারের একটি পাকা ছাদবিশিষ্ট খোলা ঘর। এখানে কতক বাউল শুয়ে-বসে বিশ্রামে আছেন। এখানে বিভিন্ন উৎসবাদি হয়ে থাকে। তাছাড়া ঘরছাড়া বাউলদের সাময়িক আশ্রয়স্থলও বটে এটি। মাজার প্রাঙ্গণের পিছনের অংশে চার তলা বিশিষ্ট লালন একাডেমিক ভবন। একাডেমিক ভবনের নীচতলায় লালন মিউজিয়াম। এইসব মিলে লালন সাঁইর মাজার কমপ্লেক্সটি এখন বাউল-ফকিরসহ বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অন্যতম পীঠস্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর দোল পূর্নিমা তিথিতে পাঁচ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়। দোল পূর্নিমায় লালন শাহর আবির্ভাব উৎসব আর ১ কার্তিক পালিত হয় তাঁর তিরোধান তিথি। অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশী পর্যটক ও লালন ভক্ত-অনুরাগীরা মিলিত হন। তখন লালন একাডেমি চত্বরে তিল ধারণের জায়গা থাকে না বলে বললেন আনোয়ার ভাই। পুরো মাজার কমপ্লেক্স ও একাডেমিক ভবনটি ১৪ একর জায়গাজুরে বিস্তৃত বলে জানা যায়।   
ছেঁউরিয়া গ্রামটি কালিগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। নদীটি এখন মরা। এখন যে জায়গায় মাজার কমপ্লেক্স অবস্থিত তার পাশ দিয়েই বয়ে গেছে এই নদী। এখন আর এটিকে নদী বলে চিনবার কোন অবকাশ নেই। খালের মতো ছোট এই নদীর পানি ময়লায় পরিপূর্ণ।  কথিত যে, লালন শাহ তরুণ বয়সে গুটি বসন্তে আক্রান্ত হলে তাঁকে জলে ভাসিয়ে দেয়া হয়। জলে ভেসে ভেসে এই কালিগঙ্গা নদীর তীরে এসে ঠেকেন তিনি।  মলম শাহ  ও তাঁর স্ত্রী মতিজান তাঁকে নদী থেকে তুলে সুস্থ করে তুলেন। সুস্থ হয়ে লালন মলম শাহর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এটি একটি মত। এই মতের সাথে দ্বিমতেরও অভাব নেই। তবে মতিজান বিবি যে লালনের পালক মা এর প্রমাণ মিলে লালনের মাজারের পাশেই মতিজানের বাঁধানো কবর দেখলে।  সবকিছু মিলিয়ে লালন শাহ আসলে কে ছিলেন, সে নিয়ে এখনও কোন ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেন নি লালন গবেষকরা। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে লালন শাহ ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকু- উপজেলার হারিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। অনেকে অভিমত দিয়েছেন লালন শাহ’র জন্ম কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের ভাড়ারা গ্রামে। অন্য আরেকটি মত থেকে জানা যায়, তিনি যশোর জেলার ফুলবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বাংলাপিডিয়াতে লালনশাহের জন্ম ১৭৭২ ও মৃত্যু ১৮৯০ খ্রিস্টিয় সন উল্লেখ করা হয়েছে। হিতকরী পত্রিকার তথ্যমতে ১৮৯০ সনের ১৭ অক্টোবর শুক্রবার প্রাতে এই মহাত্মার জীবনাবসান ঘটে ১১৬ বছর বয়সে। হিতকরী পত্রিকাকে অভ্রান্ত ধরলে লালনের জন্মসাল ১৭৭৪ খ্রিস্টিয় সন ধরাই বিধেয়। লালন শাহের জন্মকালীন ধর্মীয় পরিচয় নিয়েও নিঃসংশয় হওয়া যায় নি। হিতকরী পত্রিকায় তাঁর মৃত্যুর দুই সপ্তাহ পরে প্রকাশিত এক সম্পাদকীয় স্তম্ভে তাঁকে হিন্দু কায়স্থ পরিবারের সন্তান রূপে অভিহিত করা হয়। পাক্ষিক হিতকরী পত্রিকার ৩১ অক্টোবর ১৮৯০ তারিখের সংখ্যার এক নিবন্ধে লালনের ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে বলা হচ্ছেÑ‘লালন নিজে কোন সাম্প্রদায়িক ধর্মাবলম্বী ছিলেন না; অথচ সকল ধর্ম্মের লোকই তাঁহাকে আপন বলিয়া জানিত। মুসলমানদিগের সহিত তাঁহার আচার-ব্যবহার থাকায় অনেকে তাঁহাকে মুসলমান মনে করিত; বৈষ্ণবধর্ম্মের মত পোষণ করিতে দেখিয়া হিন্দুরা ইঁহাকে বৈষ্ণব ঠাউরাইত। জাতিবেধ মানিতেন না, নিরাকার পরমেশ্বরে বিশ্বাস দেখিয়া ব্রাহ্মদিগের মনে ইঁহাকে ব্রাহ্মধর্ম্মাবলম্বী বলিয়া ভ্রম হওয়া আশ্চর্য নহে, কিন্তু আঁহাকে ব্রাহ্ম বলিবার উপায় নাই; ইনি বড় গুরুবাদ পোষণ করিতেন।’  লালন শাহ নিজে কিন্তু এমন ধন্দে ছিলেন না নিজের পরিচয় নিয়ে। তিনি এক গানে বলেছেন, ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/ লালন বলে জাতের কি রূপ/ দেখলাম না এই নজরে/… জগৎজুড়ে জাতের কথা/ লোকে গল্প করে যথাতথা/লালন বলে জাতের ফাতা/ ডুবাইছি সাধবাজারে’। অন্য এক গানে তিনি বলেছেন, ‘আসবার কালে কি জাত ছিলে/এসে তুমি কি জাত নিলে/ কি জাত হবা যাবার কালে/এ কথা ভেবে বল না/জাত গেল জাত গেল বলে/একি আজব কারখানা/ব্রাহ্মন চ-াল চামার মুচী/এক জলেতে সবাই শুচি/দেখে শুনে হয় না রুচি/যম তো কাকেও ছাড়বে না’। এইসব গানের মধ্য দিয়ে লালন শাহ নিজের জাত চিনিয়ে দিয়েছেন আমাদের। তিনি মানবসমাজকে এক ও অখ- সত্ত্বারূপে বিবেচনা করতেন। মানুষকেই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন নিজ দর্শন চর্চায়। তিনি মানুষের মাহাত্ম্য বন্দনা করতে যেয়ে বলে উঠলেন, ‘অনন্তরূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই/শুনি মানবের উত্তম কিছু নাই/দেব-দেবতাগণ করে আরাধন/জন্ম নিতে মানবে।।/ কত ভাগ্যের ফলে না জানি/ মন রে পেয়েছো এই মানবতরণী/বেয়ে যাও ত্বরায় সুধারায়/যেন ভারা না ডোবে।।’। মূলত লালন সাহিত্য-সাগর সেঁচলে যে অমৃতবিন্দু বেরিয়ে আসবে সেটি হলো, আমাদের মধ্যযুগের প্রাচীন কবি চ-িদাসের (১৩৭০-১৪৩০ খ্রি.) ভাষায়-‘শুনহ মানুষ ভাই সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’। ভাবছি আজ থেকে ৫ শ’ বছর আগেও আমাদের মহাজনগণ যে মানুষের জয়ধ্বনি গেয়েছেন, আজ আমরা সেখান থেকে কতোটা বিচ্যুত হয়ে পড়েছি। আজ আর কেউ মানুষ নন যেন, কেউ হিন্দু কেউ মুসলমান, কেউ ব্রাহ্মণ, কেউ চাড়াল। অথচ আমরা এই মানুষ সকলেই এক ও অভিন্ন পন্থায় পৃথিবীতে প্রাণময় হয়েছি। জন্মের পর নিজ নিজ অর্থনৈতিক সামাজিক অবস্থানের কারণে আমরা লাভ করি খ-িত পরিচয়ের উত্তরাধিকার। শুধুমাত্র অর্থনৈতিক অধস্তন অবস্থানের কারণে কিছু মানুষের অন্যায় আচরণের শিকার হই আমরা। লালন সেখান থেকে সকল মানুষকে এক কাতারে মিলাতে চেয়েছিলেন। এমন মহাত্মার আখড়ায় এসে আজ কেবলই সেই মানুসের জয়গানে মুখরিত হতে মনে ইচ্ছে জাগে। নজরুলের মতো চিৎকার করে বলতে চাই-গাহি সাম্যের গান/ মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান/ নেই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি/ সব দেশে সব কালে ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি’ । লালন সান্নিধ্যে আসলে মানুষ হওয়ার এই দুর্মর বাসনার প্রাবাল্য যদি প্রাণে না জাগে তাহলে কিসের লালনপ্রীতি? আমরা কথাবার্তায় এমন মানবিক হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছি বটে কিন্তু মনের অন্তকরণে কি এই আদর্শের ঠাই দিতে পেরেছি, এমন প্রশ্ন কুড়ে কুড়ে খায় নিয়ত। এমন চিন্তা-ভাবনার মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলেছে আমাদের ছেঁউড়িয়ায় লালন দর্শন।

  • [১]